১৭ নভেম্বর ২০১৯

সিন্ডিকেট প্রস্তাবের জন্যই জনশক্তি নিচ্ছে না মালয়েশিয়া

-

মালয়েশিয়ার গভর্নমেন্টের কাছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার সিন্ডিকেট করার জন্য প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে। এতে তারা বিরক্ত হয়ে আমাদের দেশ থেকে লোক নিচ্ছে না। এটাই মূল কারণ। এখন কারা প্রস্তাব দিচ্ছে সেটা অবশ্যই ইনভেস্টিগেট হওয়া দরকার।
অভিবাসনবিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি ইসরাফিল আলম এমপি সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন টক শো অনুষ্ঠানে কথা বলেন। ৪ নভেম্বর প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের প্রতিনিধি দল মালয়েশিয়ায় যান। ৬ নভেম্বর পুত্রাজায়ায় মালয়েশিয়ার সংসদ ভবনে মন্ত্রীপর্যায়ে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের সভায় যোগ দিয়ে নির্ধারিত সময়ের আগে দেশে ফিরে টক শোতে তার বক্তব্য তুুলে ধরেন তিনি। আলোচনার বিশেষ কিছু অংশ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো।
আলোচকের প্রশ্নের জবাবে ইসরাফিল আলম বলেন, আমি আন্তরিকভাবে অত্যন্ত দুঃখিত। আমি মন্ত্রীর সাথে গিয়েছিলাম। শ্রমবাজার নিয়ে এদেশের মানুষ যেটা চায় আমি ওখানে গিয়ে ভিন্ন কিছু রূপ দেখতে পেয়েছি। আমার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, মালয়েশিয়ায় কোনো সিন্ডিকেট করার প্রয়োজন নাই। সারা বিশ্বে শ্রমিকরা যেভাবে যায়, মালয়েশিয়াতে সেভাবেই যাবে এবং মালয়েশিয়ান গভর্নমেন্ট সিন্ডিকেট চায় না বলেই মাহাথির মোহাম্মদ ক্ষমতাগ্রহণ করার কয়েকদিন পর এই সিন্ডিকেট বাতিল করে দিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের কিছু ব্যবসায়ী, কিছু রাজনীতিক ও কিছু আমলা মালয়েশিয়ার কিছু ব্যবসায়ী এবং আমলাদের সাথে নেক্সাস (যোগসূত্র) করে আবার ১০ এর জায়গায় ৩৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটা সিন্ডিকেট তৈরির চেষ্টা করছে। তার আলামত, তথ্য প্রমাণ অনেক কিছুই আমার কাছে আছে। আমি ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে তিন দিনের সফর একদিনে শেষ করে সব জেনে চলে এসেছি। সিন্ডিকেট মালয়েশিয়াতে হবে- এটা প্রধানমন্ত্রী চান না। যে যেভাবে চেষ্টা করুন না কেনো। যে সিন্ডিকেট আমাদের মাইগ্রেশন খরচ বাড়িয়ে দেয় তিনগুন, যে সিন্ডিকেট আমাদের শ্রমিকদের নিয়ে ওখানে সঠিক কাজ দেয় না, মজুরি দেয় না, তারা বিপদে পড়লে পাশে দাঁড়ায় না, গ্রেফতার হলে জামিন করায় না, মারা গেলে দেশে লাশ পাঠায় না, অসুস্থ হলে চিকিৎসা করে না, শ্রমিকদের ওয়েলফেয়ার, সেফটি সিকিউরিটির কোনো দায়িত্ব পালন করে না। সেই ব্যর্থ নিষ্ঠুর অমানবিক সিন্ডিকেট কেন আমাদের মানতে হবে? তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার পত্রিকাগুলোতে দেখবেন, যারা সিন্ডিকেটশনের সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে এন্টিকরাপশন আবার নতুন করে তদন্ত শুরু করেছে। তাই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর প্রকাশ্যে সুষ্পষ্ট নির্দেশ দেয়া দরকার যে, কোনো রকমের সিন্ডিকেট নয়, সারা বিশ্বে যেভাবে মানুষ যায় মালয়েশিয়াতে সেভাবেই যাবে। তাহলে এক লাখ ৩০ হাজার থেকে এক লাখ ৪০ হাজার টাকার বেশি কোনোভাবেই খরচ হতে পারে না। এটা আমি ইসরাফিল আলম দায়িত্ব নিয়ে বলছি।
টক শোতে অংশ নেয়া একজন সিনিয়র সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ইসরাফিল আলম এমপি শুধু বলেন, আপনি যা জানতে চাচ্ছেন আমি সবকিছু এইভাবে বলতে চাচ্ছি না। আমি মালয়েশিয়া যাওয়ার আগে সম্পূর্ণ প্রস্তাবনা লিখিতভাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে মেইল করেছি এবং আরো যারা আছেন আমি সবার কাছে বলে গিয়েছি, এখানে সিন্ডিকেটের কোনো প্রশ্ন নেই। বিষয়টি খুবই সিম্পল। যারা ক্রিমিনাল হিসেবে পরিচিত, বিভিন্ন কারণে যাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়া হয়েছে, তারা এই জায়গাতে লোক পাঠানোর সুযোগ পাবে না। এটা গভর্নমেন্ট তো করতেই পারে। কিন্তু আমার কথা হলোÑ যখন আপনি কিছু ব্যবসায়ীকে দিয়ে লিমিটেড করে ফেললেন, ওরা ৭-৮টা লেয়ার তৈরি করে ফেলবে। ওই ৭-৮টা লেয়ারের কারণে মাইগ্রেশন খরচ বেড়ে যাবে। আমি তো বললাম এক লাখ ৩০-৪০ হাজার টাকার বেশি যেটা খরচ হবে সেটা দুর্নীতি-ঘুষ হবে। যদি নেপালের মতো ছোট্ট দেশ জিরো মাইগ্রেশন কস্টে লোক নিয়ে আসতে পারে তাহলে আমরা কেনো পারব না? এখানে আমাদের ডিপ্লোম্যাটিক ব্যর্থতা আছে। আলোচকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে সংসদীয় কমিটির সভাপতি বলেন, মালয়েশিয়ার গভর্নমেন্টের কাছে বারবার সিন্ডিকেটের প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। তারা বিরক্ত হয়েই আমাদের লোকগুলো নিচ্ছে না। এটাই হচ্ছে মূল কারণ। এই প্রস্তাব কারা দিচ্ছে এটার ইনভেস্টিগেট হওয়া দরকার। আর আমি কাদের কাছ থেকে তথ্য পেলাম তা ওপেন বলব না। মালয়েশিয়ার দুই তিনজন মন্ত্রীর সাথে আমার কথা হয়েছে। আমার ১৬-১৭ জন সাবেক এমপি রয়েছেন তাদের সাথে কথা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, যারা ওখানে বিপদের মধ্যে আছেন তাদেরকে বিপদমুক্ত করব নাকি নতুন করে মানুষ নিয়ে মানুষগুলোকে বিপদে ফেলার কাজটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করব? তার মতে, বর্তমানে মালয়েশিয়াতে দুই থেকে আড়াই লাখ কর্মী সমস্যার মধ্যে আছেন। তাদের ট্রাভেল ডকুমেন্ট নেই। তারা ইলিগ্যালভাবে স্টে করছেন। সেগুলো লিগ্যালাইজ করার জন্য উদ্যোগ নেই। নতুন করে ব্যবসা পাতানোর জন্য এখন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আমি এই সংসদীয় কমিটিতে আগে ছিলাম। এবারে নেই। তবে আমি গিয়েছিলাম। তখন বাধ্য হয়ে আমি আমার মতো করে কাজ করেছি এবং জানতে পেরেছি বাংলাদেশ থেকে প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে ওখানে সিন্ডিকেট করতে হবে। কিন্তু মালয়েশিয়ান গভর্নমেন্টের কেউই চায় না সিন্ডিকেট হোক। তারা শ্রমিকদের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। তারা জিরো কস্টে বা নামমাত্র খরচে শ্রমিক নিয়ে যেতে চায়। মাঝখানে কিছু লোক আছে যারা গতবারেও ছিল এবারেও আছে। তারাই এই কাজগুলো করছে। আমি বলব এটা তদন্ত করে বের করে দেখা দরকার। আমি আমার অবজারভেশন অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীকে জানাব।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের মার্চ মাসে জি টু জি প্লাস পদ্ধতিতে দেশটিতে কর্মী যাওয়া শুরু হয়। সিন্ডিকেটের অভিযোগ উঠার পর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ান নাগরিক দাতো আমিন নুর এর অনলাইন সিস্টেম বেস্টিনেটের (এসপিপিএ) কার্যক্রম স্থগিত করেন। ঢাকার ১০ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে দেশটিতে কর্মী যাওয়ার পর ২০১৮ সালে ১ সেপ্টেম্বর থেকে কর্মী যাওয়া বন্ধ রয়েছে। ‘নো সিন্ডিকেট’ সেøাগান সামনে রেখে কূটনৈতিক তৎপরতায় দুই দেশের মন্ত্রীপর্যায়ে মোট ৩টি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ৬ নভেম্বর মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই দেশই কম খরচে কর্মী পাঠাতে ঐকমত্য হয়। সবঠিক থাকলে ২৪-২৫ নভেম্বর ঢাকায় ৪র্থ জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে কোন পদ্ধতিতে এবার শ্রমবাজার খুলতে যাচ্ছে তার চূড়ান্ত রূপরেখার ঘোষণা আসতে পারে।


আরো সংবাদ