১৭ অক্টোবর ২০১৯

এবার পুলিশের মারধরের শিকার আবরারের ছোট ভাই ফাইয়াজ

‘আমাকেও মেরে ফেলুন : বাবা-মা কষ্ট একবারে পাবে’
পুলিশের মারধরে আহত আবরারের ভাই ফাইয়াজ ও এক নারী -

বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদের ছোট ভাই ফাইয়াজকে মারধর করার অভিযোগ পাওয়া গেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। গতকাল বুয়েট ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম আবরারদের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়াতে গেলে এলাকাবাসীর সাথে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। এ সময় আবরারের ছোট ভাইসহ তিনজন পুলিশের মারধরে আহত হন। ছাত্রলীগের মারধরে নিহত হয় বুয়েট ছাত্র আবরার। এ ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ছাত্রলীগের নেতাদের প্রতি ধিক্কারের পালা শেষ না হতেই পুলিশও তার ছোট ভাইয়ের বিরুদ্ধে অনুরূপ কাজ করল। এ ঘটনায় এলাকাবাসী হতবাক ও প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেন। ক্ষুব্ধ ফাইয়াজও ভাই হত্যার প্রতিবাদে ফেসবুক স্ট্যাটাসে আবেগঘন ভাষায় বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ভাইয়ের হত্যার বিচার না করলে আমাকেও মেরে ফেলুন। যাতে মা-বাবা দুইবারে কষ্ট না পায়।
এলাকাবাসী নয়া দিগন্তকে জানান, বুয়েট ভিসি শুধু আবরারের কবর জিয়ারত করতে পেরেছেন। তিনি আবরারের বাড়িতে ঢুকতে পারেননি। বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী তাকে বাধা দেন। পুলিশের সাথে এলাকাবাসীর সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় আবরারের ছোট ভাই ফাইয়াজ, তার ফুপাতো ভাইয়ের স্ত্রী ও আরো একজন নারী আহত হন বলেও তিনি জানান।
বুয়েট ভিসিকে এখন কেন আসছেন এত দেরি করে?’ নিহত ফাহাদের ভাই ফাইয়াজ এমন প্রশ্ন করার সময় পুলিশ তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়।
আবরারের ছোট ভাই ফাইয়াজ অভিযোগ করে বলেন, আমার গায়ে হাত দিয়েছে। বুকে গুঁতা মেরেছে। কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান নিজে আমাকে মেরেছেন। আমার এক ভাইকে পিটিয়ে মেরেছে এবার পুলিশ কি আমাকে মারবে?
এ ব্যাপারে তাৎক্ষণিকভাবে কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমানের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
গ্রামবাসীর তোপে পিছু হটলেন বুয়েট ভিসি : ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মারধরের শিকার হয়ে নিহত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে বুধবার গ্রামবাসীর তোপের মুখে পড়েছেন ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতার কঠোর অবস্থান ও প্রতিরোধে পিছু হটতে বাধ্য হন তিনি। আবরারের পরিবারকে সমবেদনা এবং তার কবর জিয়ারত করার জন্য গতকাল সকালে ভিসি ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ার উদ্দেশে রওনা হন। তার আসার কথা কুষ্টিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে আবরারের আত্মীয়স্বজন, সহপাঠী ও গ্রামবাসী আগে থেকে বাড়ির সামনে অবস্থান নেন।
বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ভিসি আবরারের গ্রামের বাড়ি কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গায় পৌঁছান। এ সময় তার সাথে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন ও পুলিশ সুপার এস এম তানভীন আরাফাত ছিলেন। সেখানে তিনি আবরারের বাবা বরকতুল্লাহর সাথে দেখা করেন এবং আবরারের কবর জিয়ারত করেন।
কবরত জিয়ারত শেষে নিহত আবরারের মাকে সমবেদনা জানাতে তার বাড়িতে যাওয়ার সময় উত্তেজিত গ্রামবাসী ভিসিকে ঘিরে রেখে হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে সেøাগান দিতে থাকেন।
এ সময় অবস্থা বেগতিক দেখে বুয়েট ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম পিছু হটতে বাধ্য হন। পরে জেলা প্রশাসকের গাড়িতে করে তিনি ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
গ্রামবাসীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আবরারকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হলেও ভিসি সে সময় ঘটনাস্থলে যাননি, এমনকি তার নামাজে জানাজাতেও অংশ নেননি। আবরারের পরিবারের প্রতি সমবেদনাও জানাননি।
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন বলেন, ভিসি এখন কুষ্টিয়া সার্কিট হাউজে অবস্থান করছেন। এখান থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন।
‘নয়তো আমাকে মেরে ফেলুন বাবা-মা কষ্ট একবারে পাবে’ : নির্মম নির্যাতনে নিহত বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদের ভাই আবরার ফাইয়াজ তার ভাইয়ের হত্যার বিচার চেয়ে ফেসবুকে আবেগমাখা স্ট্যাটাস দিয়েছেন। এতে ফাইয়াজ বলেন, আমার ভাইয়ের হত্যার বিচার না করলে আমাকেও এখনই মেরে ফেলুন। যাতে বাবা-মা দুইবারে কষ্ট না পায়। একবারেই কষ্ট পায়।
তার ফেসবুক স্ট্যাটাসটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো...
‘আজকে অতিরিক্ত এসপি (উনি বলেন, উনার নাম মোস্তাফিজুর রহমান) কোথা থেকে সাহস পায় আমার গায়ে হাত দেয়ার? আমার ভাবীকে মারছে? নারীদের গায়ে নিষ্ঠুরভাবে হাত দেয়? এই চাটুকারদের কি বিচার হবে না? তিনি কালকে ২ মিনিটে জানাজা শেষ করতে বলেন কিভাবে? যেই ছাত্রলীগ মারল তারা কেন সর্বত্র? বিচার চাই, আমি বিচার চাই, নয়তো আমাকে মেরে ফেলুন বাবা-মা কষ্ট একবারে পাবে।’
ফাহাদের পরিবারের দাবি : ভিসি আমাদের পরিবারকে অসম্মান করে চলে গেলেন : বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের পরিবারের সাথে দেখা করতে যেয়ে গ্রামবাসীদের তোপের মুখে শেষ পর্যন্ত আবরারের বাড়িতে না ঢুকে সামনের রাস্তা থেকে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের প্রহরায় তিনি দ্রুত চলে যান। আবরারের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজকে মারধর এবং আবরারের মামাতো ভাবী তমাকে আহত করার অভিযোগ উঠেছে।
তমাকে কুমারখালী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ সময় স্থানীয় জনগণ ফাহাদের খুনিদের বিচারের দাবিতে সেøাগান দিতে থাকেন। হাজার হাজার নারী-পুরুষ ভিসি ভুয়া ভুয়া বলে সেøাগান দিতে থাকেন। ভিসির গাড়িবহরে থাকা এসপির গাড়ি ঘুরাতে দেরি হওয়ার সুযোগে আবরার ফাহাদের মামাতো ভাইয়ের স্ত্রী তমা এসপির গাড়ির সামনে বেরিকেড দিয়ে গাড়ি আটকিয়ে দেন। এ সময় মহিলা পুলিশ এসে তাকে নিবৃত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে তমা গাড়ির সামনে রাস্তা শুয়ে পড়েন। এ সময় পুলিশ তাকে ধরে রাস্তার পাশে নিয়ে গেলে পুলিশ সুপার দ্রুত সেখান থেকে চলে যান। পুলিশের সাথে তমার দীর্ঘ সময় ধস্তাধস্তি হলে তমা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে কুমারখালী হাসপাতালে নেয়া হয়।
পরে গ্রামবাসীর প্রতিরোধের মুখে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে চলে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা গ্রামবাসী বিক্ষোভ করেন।
বুুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের পিতা বরকতুল্লাহ অভিযোগ করে বলেন, মাদক ব্যবসায়ী আর সন্ত্রাসীদের ক্রসফায়ারে মারা হয় আর আমার ছেলেকে যারা নির্দয়ভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে তাদের কেন ক্রসফায়ারে দেয়া হচ্ছে না? সরকারের উচিত ছিল এত দিনে ফাহাদের খুনিদের ক্রসফায়ারের আওতায় আনা। গতকাল বিকেলে কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গা গ্রামে বুয়েটের ভিসি ফাহাদের বাড়িতে এসেও দেখা না করে চলে যাওয়ায় ক্ষোভের সাথে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ভিসি মহোদয় সম্মানীয় ব্যক্তি, তিনি আমার বাড়ির দরজায় এসে ঘরে না ঢুকে কেন চলে গেলেন? তিনি কাপুরুষতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি আমার ছেলের লাশ দেখাতো দূরের কথা, ছেলের জানাজা নামাজেও শরিক না হয়ে নানান প্রশ্নের জম্ম দিয়েছেন। ফাহাদের পিতা বলেন, আমরা এলাকার মানুষ শান্তিপ্রিয়, ভিসি মহোদয় বাড়িতে আসবেন শুনে এলাকাবাসী দারুণ খুশি হয়েছিলেন। এলাকাবাসী ভিসির নিকট ফাহাদের খুনিদের শাস্তির দাবি জানাতে বাড়ির সামনে শান্তিপূর্ণ অবস্থান করছিলেন, সেখানে পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছিল, তার পরেও তিনি আমার ও ফাহাদের মায়ের সাথে দেখা না করে চলে গেলেন। এতে আমার পরিবার দারুণভাবে মর্মাহত।
ফাহাদের মা রোকেয়া বেগম জানান, আমি ফাহাদের মা বলছি, ভিসি আমার বাড়ির মেহমান, তার নিরাপত্তার দায়িত্ব আমি নিজেই নিতাম। প্রয়োজনে আমি আল্লাহর নিকট সাহায্য চাইতাম। ভিসিকে অসম্মান করার মতো এ গ্রামে কেউ নেই। ভিসির আচরণ প্রথম থেকেই রহস্যজনক মনে হয়েছে। উনি এত কষ্ট করে এসে আমাদের সাথে দেখা না করে চলে গেলেন আর পুলিশ আমার ছেলেকে আঘাত করল আর বেটার বউয়ের শ্লীলতাহানি করল প্রকাশ্যে, এর বিচারের দাবি জানাই।


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum
portugal golden visa