১৭ অক্টোবর ২০১৯

রেল কোচের বাড়তি দরে রাষ্ট্রের ক্ষতি ৩৫০ কোটি টাকা

কোচ কিনতেও শিক্ষাসফরে ৮৪ লাখ টাকা
-

উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে ক্রয় কার্যক্রমে পণ্যমূল্য প্রস্তাবনার ব্যবধান দিন দিন বেড়েই চলছে। ফলে রাষ্ট্রকে বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে। সমজাতীয় প্রকল্পের চেয়ে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা থেকে সোয়া ২ কোটি টাকা বেশি দরে রেলওয়ের জন্য যাত্রী কোচ কেনার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এই বাড়তি দরে রেলের জন্য যাত্রী কোচ কেনা হলে ৩৫০ কোটি থেকে ৪০০ কোটি টাকা রাষ্ট্রকে লোকসান গুনতে হবে। রেলের ২০০টি ব্রডগেজ প্যাসেঞ্জার ক্যারেজ বা যাত্রী কোচ কেনার জন্য যে প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে এই চিত্র পাওয়া গেছে। আর এই কোচ কেনার জন্য ৮৪ লাখ টাকা খরচ করে শিক্ষাসফরে যাবেন কর্মকর্তারা।
রেল মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে ২০০টি ব্রডগেজ কোচ কিনবে। এই প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৭৮৯ কোটি ৬৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। এখানে ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (ইআইবি) ঋণ হলো এক হাজার ৩৯৫ কোটি ৭৬ লাখ ২৪ হাজার টাকা। আর বাংলাদেশ সরকারকে দিতে হবে ৩৯৩ কোটি ৯১ লাখ ৩১ হাজার টাকা। চলতি বছর অনুমোদন পেলে আগামী ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে এই ২০০টি কোচ সংগ্রহ করা হবে। ইআইবির সাথে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের ১৪ তারিখ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যেখানে তারা মোট ৩২ কোটি ৭১ লাখ ইউরো দেবে। আর নিজস্ব তহবিল থেকে ৫ কোটি ১১ লাখ, ইআইবি ঋণ ১১ কোটি এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণ ১৬ কোটি ৬০ লাখ ইউরো। এখানে ইআইবির ১১ কোটি ইউরো দিয়ে ২০০টি ক্যারেজ ক্রয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে বলে রেলওয়ে জানায়। পিইসির ব্যয় পর্যালোচনায় এবং অন্য প্রকল্পের সাথে তুলনা থেকে দেখা যায়, প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় ব্রডগেজ যাত্রী কোচ প্রতিটি ইউনিটের দর পড়ছে ৬ কোটি ৩৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা। যেখানে সমজাতীয় চলমান ২০০টি মিটারগেজ ও ৫০টি ব্রডগেজ যাত্রী ক্যারেজ ক্রয়ে প্রকল্পপ্রতি ইউনিটের দর ৪ কোটি ৬০ লাখ ৭১ হাজার টাকা। এখানে গড় দর ব্যবধান হলো ১ কোটি ৭৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। ফলে ২০০টি কিনতে হলে সরকারকে সাড়ে ৩ কোটি টাকার বেশি গুনতে হবে। এই দর নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন থেকে আপত্তি জানানো হয়েছে। অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে আপত্তি তোলে ভৌত অবকাঠামো বিভাগ, যা পিইসি সভার কার্যপত্রে উঠে এসেছে।
চীনের বিভিন্ন কোম্পানির ওয়েবসাইটে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, জিয়ানসগু নিউয়ার ট্রেন টেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেড বিভিন্ন মডেল ও স্পেসিফিকেশনের রেল কোচ তৈরি করছে। তাদের কোম্পানির ১২০ কিমি. গতির প্রতিটি কোচের দাম ৮০ হাজার থেকে সাড়ে ৬ লাখ মার্কিন ডলার। ৮৫ টাকা বিনিময়মূল্য ধরলে প্রতিটির সর্বোচ্চ মূল্য পড়বে ৫ কোটি ৫২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এটা ফ্রেম বডির। আর সুজহু ইস্ট রেলওয়ে কোম্পানি লিমিটেডের ৩০ টনের ১০০ কিলোমিটার গতির কোচের দাম ৩ লাখ ডলার রয়েছে। সেখানে এই দাম স্থানীয় মুদ্রায় ২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এই সব দর ট্যাক্স ও ভ্যাট ছাড়া।
পিইসির তথ্য মতে, প্রস্তাবিত দর এলওসি (ভারতীয় ঋণ) আওতায় কোচ কেনা প্রকল্পে দরের সাথে প্রতি বছর তিন শতাংশ মূল্যবৃদ্ধিজনিত ব্যয় ধরে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এটি না করে এডিবির সহায়তাপুষ্ট প্রকল্পকেই প্রস্তাবিত দরের ভিত্তি হিসেবে ধরা যেতে পারে।
সূত্র জানায়, এডিবির ঋণে ৫০টি ব্রডগেজ কোচ কেনার প্রকল্প চলমান আছে। ২০১৭ সালের জুনে কোচগুলো কেনার চুক্তি সই করে রেলওয়ে। ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা প্রতিটি মিটারগেজ কোচের মূল্য ৩ কোটি ৩ লাখ টাকা এবং প্রতিটি ব্রডগেজ কোচের মূল্য ৪ কোটি ২২ লাখ টাকা। আমদানি করা মিটারগেজ কোচের ১৮টি এসি বার্থ বা প্রথম শ্রেণীর এসি সিøপারযুক্ত কোচ থাকবে ১০টি। ৫৫ সিটবিশিষ্ট এসি চেয়ার কোচ থাকবে ৪০টি। ৬০ সিট বিশিষ্ট শোভন চেয়ার কোচ থাকবে ১১২টি। ১৫ সিটবিশিষ্ট খাবার গাড়ি ও গার্ড ব্রেকসহ কোচ থাকবে ২৫টি। পাওয়ার কার ও নামাজ ঘরসহ কোচ থাকবে ১৩টি। দেশে এই প্রকল্পের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো স্টেইনলেস স্টিলের বডি ও বায়ো টয়লেটযুক্ত কোচ আনছে রেল কর্তৃপক্ষ। ভেতরে কোচের আয়তনও বর্তমান ট্রেনের চেয়ে বেশি বলে যাত্রীরা বেশি স্থানে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে সক্ষম হবেন। একই সাথে এসব ট্রেন সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব ও আরামদায়ক তথা যাত্রীবান্ধব হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলওসিতে সীমিত দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে ভারতীয় কোম্পানি ছাড়া অন্য কেউ তাতে অংশ নিতে পারে না। তাই কোচের দাম কিছুটা বেশি পড়বেই। আর ইআইবির ঋণে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হবে। এডিবির মতো এক্ষেত্রেও দর কম হবে। তাই পরিকল্পনা কমিশন থেকে আপত্তি তোলা হয়েছে।
রেলের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে রেলের ৪২৮টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ আছে। এর মধ্যে ১৮৭টির আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে। মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী আগামী ৩০-৩৫ বছরের মধ্যে রেলের সব ট্র্যাক ব্রডগেজে রূপান্তর করা হবে। এ ছাড়া যমুনা নদীর ওপর রেল সেতু নির্মাণ করা হয়েছে এবং পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্প সম্পন্ন হলে সারা দেশে ব্রডগেজ ট্রেনের সংখ্যা বেড়ে যাবে। এজন্য পুরনো কোচগুলো প্রতিস্থাপনসহ আগামী দুই-চার বছরের মধ্যে নতুন ৪০০ কোচ দরকার হবে। তাই নতুন কোচগুলো কেনা জরুরি বলে ডিপিপিতে উল্লেখ করেছে রেলওয়ে।
এ দিকে বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য মিটারগেজ ও ব্রডগেজ প্যাসেঞ্জার ক্যারেজ সংগ্রহ প্রকল্পের বর্তমান প্রকল্প পরিচালক ও রেলের চিফ মেকানিক্যাল অফিসার এফ এম মহিউদ্দিনের কাছে গতকাল প্রকল্পের কোচের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, মিটারগেজ ও ব্রডগেজ কোচ আনা হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া থেকেই এসব কোচ আসছে।
আমদানিকৃত এসব কোচের মূল্য সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে মহিউদ্দিন জানান, গড়ে মিটারগেজ প্যাসেঞ্জার ক্যারেজের দাম ৩ কোটি টাকা এবং ব্রডগেজ প্যাসেঞ্জার ক্যারেজের দাম ৪ কোটি টাকা পড়বে। এসবের স্পেসিফিকেশনের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলো সবই আধুনিক ও অটোমেটিক। সর্বশেষ মডেলগুলোই আনা হচ্ছে। ওজনের ভিন্নতা আছে কোচগুলোর।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো: শামসুজ্জামানের কাছে চলমান প্রকল্পের চেয়ে বেশি দরে কোচ কেনার ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি গতকাল নয়া দিগন্তকে জানান, আগে বা চলমান প্রকল্পে যেসব যাত্রী কোচ কেনা হচ্ছে তার চেয়ে নতুন প্রস্তাবনার কোচগুলো অনেক বেশি আধুনিক ও অটোমেটিক। এখানে অনেক বেশি কম্পোনেন্ট থাকবে। এছাড়া স্পেসিফিকেশনের ভিন্নতাও আছে। তাই দাম বেশি হবেই। তিনি বলেন, এটা ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (ইআইবি) ঋণে কেনা হবে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বিডিংয়ের মাধ্যমে বিডার নির্বাচন করা হবে। উন্মুক্ত টেন্ডার হবে। যে দরদাতা কম দর দেবেন তারটাই গ্রহণ করা হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এখন যেসব কেনা হচ্ছে তা ইন্দোনেশিয়া থেকে আনা হচ্ছে। তারা কম দরদাতা বলে সেখান থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি নয়া দিগন্তকে জানান, এলওসিতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যে দেশের এলওসি সে দেশেরই ঠিকাদারদেরকে কাজ দেয়া হয়। ফলে দর যাচাই করার তেমন কোনো সুযোগ থাকে না। আর ইআইবির ঋণে যেসব ক্রয় কার্যক্রম হয় তাতে উন্মুক্ত দরেই ঠিকাদার নির্বাচন করা হয়। কারণ তাদের অনেক সদস্য আছে। তিনি বলেন, উন্মুক্ত দরের পর সর্বনিম্ন বিডে যে দর আসবে সেটার পরই যাচাই করা দরকার। আর এসব প্রকল্প যাচাই করেই পিইসির অনুমোদন দেয়া দরকার। তাহলে সরকারের অর্থ সাশ্রয় হবে।


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum
portugal golden visa