১৬ অক্টোবর ২০১৯

শামীম ও ফিরোজ ১০ দিনের রিমান্ডে

শামীমের বিরুদ্ধে তিন মামলা ; ফিরোজের বিরুদ্ধে দুই মামলা ; অস্ত্র মামলায় শামীমের সাত দেহরক্ষীর চার দিনের রিমান্ড
আটক যুবলীগ নেতাদের গতকাল আদালতে হাজিরা শেষে পুলিশের হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে হ নয়া দিগন্ত -

যুবলীগের কেন্দ্রীয় সমবায়বিষয়ক সম্পাদক জি কে শামীম ও কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি ও কৃষক লীগ নেতা শফিকুল আলম ফিরোজকে রিমান্ডে নেয়ার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। এর মধ্যে মাদক, অস্ত্র ও মানিলন্ডারিংয়ের তিন মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে ১৪ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছে পুলিশ। শামীমকে ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। অন্য দিকে অস্ত্র ও ইয়াবাসহ গ্রেফতার রাজধানীর কলাবাগান ক্রীড়াচক্র ক্লাবের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজেরও ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে। পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল শনিবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত এ আদেশ দেন। এর আগে বেলা ২টা ৫৬ মিনিটে সাত দেহরক্ষীসহ শামীমকে গুলশান থানায় হস্তান্তর করা হয়। শামীমের সাত দেহরক্ষী হলেনÑ শহিদুল, কামাল, জাহিদুল, সায়েম, দেলোয়ার, মুরাদ ও আমিনুল। তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক ও মানিলন্ডারিং আইনে পৃথক তিনটি মামলা হয়েছে। মামলায় শামীমের সাত দেহরক্ষীকেও আসামি করা হয়।
পুলিশ গুলশান বিভাগের এডিসি আব্দুল আহাদ জানান, অস্ত্র ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের মামলায় জি কে শামীম ও তার সাত দেহরক্ষীকে আসামি করা হয়েছে। আর মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় কেবল জি কে শামীমকে আসামি করা হয়েছে। অস্ত্র ও মাদক মামলায় সাত দিন করে রিমান্ডের আবেদন করে শামীমকে আদালতে পাঠানো হয়। বিকেলে জি কে শামীমকে আদালতে হাজির করে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তা গুলশান থানার পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম দুই মামলায় ১৪ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। তার আইনজীবী রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করলে আদালত নামঞ্জুর করেন। শুনানি শেষে সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে ঢাকা মহানগর হাকিম বেগম মাহমুদা আক্তার অবৈধ অস্ত্র ও মাদক মামলায় জি কে শামীমের ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর মধ্যে অস্ত্র মামলায় পাঁচ দিন ও মাদক মামলায় পাঁচ দিন। এ ছাড়া সাত দেহরক্ষীকে অস্ত্র মামলায় চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
এ দিকে কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে পৃথক দু’টি মামলা হয়েছে। গতকাল ভোরে র্যাবের পক্ষ থেকে ধানমন্ডি থানায় মামলা দু’টি করা হয়। এরপর দুই মামলায় ১০ দিন করে ২০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। বিকেলে ঢাকা মহানগর হাকিম বেগম মাহমুদা আক্তার শুনানি শেষে অস্ত্র মামলায় পাঁচ দিন এবং মাদক আইনে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তার পক্ষে জামিন চাওয়া হলেও নামঞ্জুর করেন বিচারক।
ধানমন্ডি থানার ওসি আব্দুল লতিফ বিশ্বাস বলেন, গতকাল ভোরে শফিকুলের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এতে তার সহযোগী আটক অপর চারজনকেও আসামি করা হয়েছে। এরপর বিকেলে তাকে রিমান্ডের আবেদন করে আদালতে পাঠানো হয়। মামলার বাকি আসামিরা হলেনÑ ক্লাবের কর্মচারী হাফিজুল ইসলাম, মোহাম্মদ হারুন, আনোয়ার হোসেন ও লিটন মিয়া।
শফিকুল আলম ফিরোজের বিরুদ্ধে রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে রথ্যাব গত শুক্রবার জানতে পারে, আসামি শফিকুল আলম ফিরোজ কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের ভেতরে অবৈধ অস্ত্র রেখে সেখানে মাদক কেনাবেচা করছেন। এই তথ্য পাওয়ার পর বিকেল ৪টার দিকে রথ্যাব সদস্যরা কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের অফিস ঘিরে রাখেন। রথ্যাবের একজন নির্বাহী হাকিমের নেতৃত্বে সন্ধ্যায় সেখানে অভিযান চালানো হয়। কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের অফিসে ৯৯০ পিস ইয়াবা এবং একটি অবৈধ বিদেশী পিস্তল পাওয়া যায়। ঘটনাস্থল থেকে আসামি শফিকুল আলমকে গ্রেফতার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শফিকুল আলম ফিরোজ স্বীকার করেন, ওই অফিসে অবৈধ অস্ত্র রেখে তিনি মাদকদ্রব্য বেচাকেনা করে আসছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজাদ রহমান আদালতকে বলেন, আসামি শফিকুল আলম ফিরোজ কলাবাগান ক্রীড়াচক্রে অবৈধ অস্ত্র রেখে মাদক ব্যবসা করে আসছিলেন। তাকে রিমান্ডে নেয়ার অনুমতি দেয়া হোক। রাষ্ট্রপক্ষের আরেকজন আইনজীবী আদালতকে বলেন, ক্রীড়াচক্রের কাজ যেখানে ভালো খেলোয়াড় তৈরি করা, সেখানে এই আসামি অবৈধভাবে মাদক ব্যবসা করে আসছিলেন। ক্যাসিনো খুলে ক্রীড়াচক্রকে জুয়াচক্রে পরিণত করেছেন। এ সময় আসামি শফিকুল আলম ফিরোজের আইনজীবী মাসুদ এ চৌধুরী আদালতকে বলেন, সম্পূর্ণ মিথ্যা মামলা দিয়ে তার মক্কেলকে হয়রানি করা হচ্ছে। কলাবাগান ক্রীড়াচক্রে কোনো ক্যাসিনো খোলা হয়নি। তার মক্কেল ২৭ বছর ধরে কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। যে কারণে তাকে হয়রানি করার জন্য এই মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছে। আসামি পক্ষের আইনজীবীরা আদালতের কাছে আরো দাবি করেন, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন শফিকুল আলম। তিনি নিজে মাদকের বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ছিলেন। রথ্যাবের সদস্যরা যখন দুপুরে কলাবাগান ক্রীড়াচক্র ঘিরে রেখেছিলেন, তখন আসামি ৯৯০ পিস ইয়াবা এবং অস্ত্র রেখে সেখানে অবস্থান করবেন এটা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। রথ্যাব সদস্যরা সাম্প্রতিক সময়ে যেসব অভিযান চালিয়েছে সেখানে গণমাধ্যম কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু কলাবাগান ক্রীড়াচক্রে অভিযান চালানোর সময় গণমাধ্যমকর্মীরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত মাদক মামলায় পাঁচ দিন এবং অস্ত্র মামলায় পাঁচ দিন রিমান্ডে নেয়ার অনুমতি দেন।
গত শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে নিকেতনের ৫ নম্বর রোডের ১৩ নম্বর বাসায় জি কে শামীমের জি কে বিল্ডার্সের অফিসে অভিযান শুরু করে র্যাব। সেখান থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা, অস্ত্র, মাদকসহ তাকে গ্রেফতার করে সন্ধ্যায় নিয়ে যাওয়া হয় র্যাব-১ এর কার্যালয়ে। এ সময় গ্রেফতার করা হয় শামীমের সাত দেহরক্ষীকেও।
শামীমের কোম্পানির কর্মচারী দিদারুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, ভোর থেকেই র্যাবের লোকজন এখানে আসেন। অস্ত্রের লাইসেন্স পরীক্ষা করা হয়। দেহরক্ষীদের লাইসেন্স থাকার পরও তাদের এখান থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। নিকেতন এলাকাতে জি কে শামীমের আরেকটি বাসা আছে। ওখান থেকে শামীমকে ডেকে নিয়ে আসা হয় ১৪৪ নম্বর বাসার এই অফিসে। তাকে নিয়ে এখানে অভিযান চালায় র্যাব।
অভিযান শেষে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম সাংবাদিকদের বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সকাল থেকে আমরা শামীমের বাসা ও অফিসে অভিযান শুরু করি। এ সময় শামীম ও তার সাতজন দেহরক্ষীকে আটক করা হয়। অভিযানে শামীমের অফিস থেকে তার একটি অত্যাধুনিক অস্ত্র ও দেহরক্ষীদের সাতটি শটগান এবং এক কোটি ৮০ লাখ টাকা, ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআরের কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়। ১৪০ কোটি টাকার এফডিআর তার মায়ের নামে এবং বাকি ২৫ কোটি টাকার এফডিআর শামীমের নামে রয়েছে। এ ছাড়াও বিদেশী মদের বোতল উদ্ধার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির অভিযোগ রয়েছে। আমরা সেসব তদন্ত করছি। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই তাকে আটক করা হয়েছে। এ সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এফডিআরের টাকাগুলো বিভিন্ন অবৈধ সোর্স থেকে এসেছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। সে সব অভিযোগ আমরা তদন্ত করে দেখব।
র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেছিলেন, জি কে শামীমের অফিসে ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআরের ১৪০ কোটি টাকার এফডিআর তার মায়ের নামে। তবে তার মায়ের নামে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখব। আমাদের কাছে অভিযোগ রয়েছে, কিছু অবৈধ সোর্স থেকে তার এফডিআরের টাকাগুলো এসেছে। শামীমকে আদালতে এফডিআরগুলোর সোর্স বৈধ প্রমাণ করতে হবে। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই র্যাব-২ অভিযান চালায় কলাবাগান ক্রীড়াচক্রে। অভিযানে ক্লাবের অফিস রুম থেকে এক হাজার পিস হলুদ রঙের ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া একটি বিদেশী পিস্তল, তিন রাউন্ড গুলি ও জুয়া খেলার সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। অভিযান শেষে র্যাব-২ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ রাতে ব্রিফিং করে অভিযান বিষয়ে সাংবাদিকদের বিস্তারিত জানান।
এর আগে গত বুধবার ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে গুলশান ২ নম্বরের ৫৯ নম্বর সড়কে যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বাসা এবং ফকিরাপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবে একযোগে অভিযান চালায় র্যাব। এ ছাড়া ওই এলাকার ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, বঙ্গবন্ধু এভিনিউর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্র এবং বনানীর আহমেদ টাওয়ারে গড়ে তোলা একটি ক্যাসিনোতেও অভিযান চালায় র্যাব। অভিযানে ক্লাবগুলো থেকে জুয়ার আড্ডা চালানোর আয়োজন, নগদ দেশী ও বিদেশী টাকা, অস্ত্র ও নেশাজাতীয় বিভিন্ন দ্রব্য জব্দ করা হয়। অভিযানে ইতোমধ্যে একাধিক যুবলীগ নেতা গ্রেফতার হয়েছেন।

 


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum