১৬ অক্টোবর ২০১৯

ব্যাংক একীভূতকরণ বাধ্যতামূলক হচ্ছে

নীতিমালার খসড়া দাখিল; স্তর নির্ধারণ হচ্ছে দুর্বলতা চিহ্নিত করার
-

দুর্বল ব্যাংকের একীভূতকরণ বাধ্যতামূলক হচ্ছে। এ জন্য নীতিমালা তৈরি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইতোমধ্যে নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে দুর্বল ব্যাংকগুলোর চিহ্নিতকরণের স্তর নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই স্তরের মধ্যে যারাই পড়বে তাদের বাধ্যতামূলকভাবে একীভূতকরণের বিধান রাখা হয়েছে। এটি অনুমোদন হলে একে অপরের সাথে মার্জার বা একীভূত হতে বাধ্য হবে দুর্বল ব্যাংকগুলো।
জানা গেছে, ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৭৭ ধারায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মার্জার বা একীভূত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে ওই নীতিমালায় দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। শুধু বলা আছেÑ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোনো ব্যাংক কোম্পানির ব্যবসা সাময়িকভাবে স্থগিত করার প্রয়োজন মনে করলে তার আদেশ প্রদানের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করতে পারে। আর সরকার আদেশ দিলেই কেবল সে ক্ষেত্রে ব্যাংক ব্যবসা স্থগিত করতে পারবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অন্য দিকে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিজেরা প্রয়োজন মনে করলে এক প্রতিষ্ঠান অন্য প্রতিষ্ঠানের সাথে মার্জার বা একীভূত হতে পারবে। এ ক্ষেত্রে দুই প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সভাতেই মার্জারের বিষয়টি অনুমোদিত হতে হবে। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা উঠে এসেছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। বেশ কিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা খুবই দুর্বল; যে কারণে আর্থিক খাতের দুর্নাম হচ্ছে। বিষয়টি সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক অবহিত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেরও এ থেকে উত্তরণে তেমন কিছু করণীয় নেই। বিদ্যমান ব্যাংক কোম্পানি আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে এদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মার্জও করতে পারছে না। এর মধ্যে ফার্মার্স ব্যাংক থেকে নতুন নামে পরিচালিত পদ্মা ব্যাংক ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংককে দুর্বলতা থেকে উদ্ধার করতে বিশেষ প্যাকেজের আওতায় তদারকি করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এ দুর্বলতার কথা বাংলাদেশ ব্যাংক যেমন জানে তেমনি সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলও অবহিত রয়েছে। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে কোনো আইনি কাঠামো না থাকায় দুর্বল কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছায় মার্জার বা একীভূত হচ্ছে না। আবার তাদের দুর্বলতার কারণে গ্রাহকরা টাকা ফেরত না পাওয়ায় পুরো আর্থিক খাতের দুর্নাম হচ্ছে। এ দুর্নাম এড়াতে বা আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা রক্ষায় দুর্বল ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে বাধ্যতামূলকভাবে একে অপরের সাথে মার্জার ও একীভূত হতে পারে, সেজন্য ব্যাংক কোম্পানি আইন হালনাগাদ করার জন্য অর্থমন্ত্রণালয়ের একাধিক বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকগুলোর সিদ্ধান্তের আলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধায়নে এ সংক্রান্ত একটি নীতিমালা তৈরি করার সিদ্ধান্ত হয়।
ব্যাংক মার্জারের বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা বিভাগের মহাব্যবস্থাপক ড. মো: কবির আহমদের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির সদস্য করা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ এবং অফসাইট সুপারভিশন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। ইতোমধ্যে কমিটি মার্জার-সংক্রান্ত একটি গাইড লাইনের খসড়া তৈরি করে এর একটি প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের মহাব্যবস্থাপকের কাছে দাখিল করেছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যমান ব্যাংক কোম্পানি আইনে বাধ্যতামূলকভাবে দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একীভূতকরণের কোনো বিধান নেই। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ইচ্ছে করলেও দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করতে পারছে না। আবার দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বেশি দিন ধরেও রাখা যাবে না। এ কারণে প্রতিবেদনে দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে বাধ্যতামূলকভাবে একীভূতকরণ করা যায় সেজন্য সুপারিশ করা হয়েছে। তবে দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করতে কিছু স্তর নির্ধারণ করা হচ্ছে। যেমন, বেশ কিছু ব্যাংক বছরের পর বছর প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারছে না। পারছে না মূলধন সংরক্ষণ করতে। কিন্তু ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে বছরের পর বছর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোকে প্রভিশন ও মূলধন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ছাড় দেয়া হচ্ছে। কোনো ব্যাংককে তিন বছরের জন্য, আবার কোনো ব্যাংককে দুই বছরের জন্য বাকিতে প্রভিশন সংরক্ষণের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তারা এরপরও বকেয়া প্রভিশন সংরক্ষণ করতে তো পারছে না, উপরন্তু চলতি প্রভিশন ও মূলধন সংরক্ষণও করতে পারছে না। বছরের পর বছর এ সুযোগ দেয়ার ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত্তি নাজুক অবস্থানে চলে এসেছে। এ কারণে দুর্বলতার ওই স্তরের মধ্যে যারাই পড়ে যাবে তাদেরকেই বাধ্যতামূলকভাবে একীভূত হতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগে যে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে এসব বিষয় সন্নিবেশিত করা হচ্ছে। তবে এটির সাথে অর্থমন্ত্রণালয়ের ইতিবাচক মতামত আছে। মূলত সরকারের পরামর্শেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এমন নীতিমালা করা হচ্ছে। নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত করে তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য অর্থমন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় মনে করলে এ বিষয়ে আইন সংশোধন করে চূড়ান্ত বাস্তবায়নের দিকে যাবে।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ব্যাংকিং খাতের এ অবস্থা এখন সময়ের দাবি হয়ে গেছে। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশ্রয়েই হোক আর সরকারের চাপেই হোক অনেক ব্যাংকেরই প্রকৃত অবস্থা গ্রাহক জানতে পারছেন না। এতে গ্রাহক রয়েছেন অন্ধকারে। সাধারণ গ্রাহক জানতে পারছেন না, তাদের কষ্টার্জিত অর্থ বা সঞ্চয় কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাখবেন। এ কারণে অনেকেই ইতোমধ্যে কিছু ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ রেখে ফেরত পাচ্ছেন না। এতে পুরো আর্থিক খাতে বদনাম ছড়িয়ে পড়ছে।
ব্যাংক বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, পুরো আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা নষ্ট বা দুর্নাম করার জন্য একটি দুর্বল ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানই যথেষ্ট। কোনো কারণে একটি ব্যাংক আমানতকারীদের টাকা দিতে না পারলে তা গ্রাহকদের আস্থায় চিড় ধরায় এবং এটি দ্রুত ক্যান্সারের মতো পুরো ব্যাংকিং খাতে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে কোনো প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে তা প্রকাশের আগেই প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিলে গ্রাহক যেমন উপকৃত হবেন তেমনি আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা বজায় থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নীতিমালায় সবলের সাথে দুর্বল ব্যাংকের একীভূত করার বিধান রাখা হবে। এ ক্ষেত্রে দুর্বল ব্যাংককে যেমন নীতিমালার আওতায় ফেলে তাকে একীভূত হতে বাধ্য করা হবে, তেমনি সবল ব্যাংককেও দুর্বল ব্যাংকের সাথে নেয়ার বিধান রাখা হবে। তবে সবকিছু নির্ভর করবে অর্থমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংক একীভূত করার বিধান করা ঠিক হবে না। যে যুক্তিতে কোনো ব্যাংককে একীভূত হতে বাধ্য করা হবে, সেটি যথা উপযুক্ত বা যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত কি না, তার প্রতি অবিচার করা হলো কি না সেটি আগে দেখতে হবে। তা না হলে এ বিধান অনেক ক্ষেত্রে অপপ্রয়োগ হতে পারে। এ কারণে কোনো আইন সংশোধন বা নীতিমালা করার আগে ব্যাংকগুলোর মতামত নেয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

 


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum