১৬ অক্টোবর ২০১৯
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কঠোর বিধিনিষেধে উদ্বিগ্ন জাতিসঙ্ঘ

ন্যায়বিচারের নামে নিরীহদের ‘অ্যাডহক বিচার’ কাম্য নয়

-

গণহত্যা দিবসের সমাবেশের পর কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ ও নিরাপত্তাবাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসঙ্ঘের বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল জেনেভা থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে জাতিসঙ্ঘের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও জমায়েত হওয়ার অধিকারের ওপর আকস্মিক দমন-পীড়নে আমরা শঙ্কিত। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ওপর বৈষম্যমূলকভাবে বিধিনিষেধ আরোপে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। চলাচল ও টেলিযোগাযোগে নিষেধাজ্ঞায় রোহিঙ্গাদের মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন হতে পারে।
রোহিঙ্গাদের হাতে স্থানীয় এক যুবলীগ নেতা হত্যার পর ধারাবাহিক ক্রসফায়ারসহ উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ২২ বছরের বাংলাদেশী এক যুবককে খুনের জন্য ন্যায়বিচার খোঁজা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে একই সাথে নিরীহরা যাতে সংক্ষিপ্ত বা এডহক বিচারের শিকার না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। এ রূপ বিচার কখনো কাম্য হতে পারে না।
যুবলীগ নেতা খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সব ক’টি হত্যাকাণ্ডের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহŸান জানিয়েছেন জাতিসঙ্ঘের বিশেষজ্ঞরা।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গণহত্যা দিবস উপলক্ষে গত ২৫ আগস্ট প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারে জমায়েত হয়েছিল। প্রত্যাবাসনের জন্য তারা মিয়ানমারের নাগরিকত্বসহ কয়েক দফা দাবি উত্থাপন করেছিল। এর পর থেকে সমাবেশ আয়োজকদের জিজ্ঞাসাবাদসহ দমন-পীড়ন চলছে। শরণার্থী ক্যাম্পে চলাচল ও মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সমাবেশ আয়োজনে সহায়তা দেয়া এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ফিরে না যেতে উদ্বুদ্ধ করার অভিযোগে বেশ কয়েকটি এনজিওর কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
বিবৃতিদাতার হলেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশবিষয়ক বিশেষ রেপোর্টিয়ার ক্লেমেন্ট ভলি, বিচারবহিভর্‚ত হত্যাকাণ্ডবিষয়ক বিশেষ রেপোর্টিয়ার এগনিস ক্যালামার্ড, সংখ্যালঘুবিষয়ক বিশেষ রেপোর্টিয়ার ফার্নান্দ ভারিনিস, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিষয়ক বিশেষ রেপোর্টিয়ার ডেভিড ক্যালি, মানবাধিকার কর্মীবিষয়ক বিশেষ রেপোর্টিয়ার মাইকেল ফ্রর্স্ট এবং অভিবাসীদের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ রেপোর্টিয়ার ফিলিপ মোরালিস।
রোহিঙ্গারা এখনো গণহত্যার হুমকিতে : জাতিসঙ্ঘের ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন’ বা তথ্যানুসন্ধান দল সোমবার তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে বুলডোজারে মিশিয়ে দেয়া রোহিঙ্গা গ্রাম তাদের নিধনের আলামত, রোহিঙ্গাদের এমন অত্যাচারের কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে আবারো মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর শীর্ষ কয়েকজন জেনারেলকে বিচারের আওতায় আনার আহŸান জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখনো রাখাইন রাজ্যে প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গা ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে বাস করছে। তাদের চলাফেরা ওপর এত বেশি কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে যে তার প্রভাব তাদের মৌলিক মানবিক চাহিদার ওপরও পড়েছে। ‘এসব কারণে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী, যাদের বেশির ভাগই বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে তাদের রাখাইনে ফেরা অসম্ভব হয়ে উঠেছে।’
অস্ট্রেলিয়ার মানবাধিকার আইনজীবী এবং জাতিসঙ্ঘ প্যানেলের সদস্য ক্রিস্টোফার সিডটি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘সেখানে থেকে যাওয়া রোহিঙ্গারা এখনো গণহত্যার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।’ ২০১৭ সালের অগাস্টে রাখাইন রাজ্যে কয়েকটি সীমান্ত পুলিশ পোস্টে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীদের’ হামলার পর সন্ত্রাস দমনের নামে সেখানে, বিশেষ করে রোহিঙ্গা মুলসমান অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে সেনাবাহিনী গণহত্যা, ধর্ষণ এবং বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রাণ বাঁচাতে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাড়িঘর ছেড়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
গত বছর সেপ্টেম্বরে জাতিসঙ্ঘ মনোনীত তদন্ত প্যানেল তাদের প্রতিবেদনে ‘জাতিগত নিধনের উদ্দেশ্যে’ মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়েছে বলে জানায়।
প্রতিবেদনটিতে এ জন্য মিয়ানমারের সেনাকর্মকর্তাদের বিচারের মুখোমুখি করা উচিত বলেও পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু মিয়ানমার গত বছরের ওই প্রতিবেদনে উল্লিখিত বেশির ভাগ অভিযোগই অস্বীকার করেছে।
নতুন প্রতিবেদনে মিয়ানমারের উত্তরের দুই প্রদেশ শান ও কোচিনে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযানের নামে সেনাবাহিনী একই ধরনের ‘অত্যাচার ও নিপীড়ন’ করছে বলে জানানো হয়েছে।
বলা হয়েছে, ওই দুই রাজ্যেও মিয়ানমার সেনাবাহিনী নিপীড়নের প্রধান অস্ত্র হিসেবে ধর্ষণ এবং যৌন নিপীড়নকে ব্যবহার করছে।
জাতিসঙ্ঘের প্রতিবেদন প্রকাশের পর বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পক্ষ থেকে টেলিফোনে মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র জ হতাইয়ের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাতে সাড়া মেলেনি।
টেলিফোনে সেনাবাহিনীর দুই মুখপাত্রের কাছে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তারাও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জাতিসঙ্ঘ প্যানেলের সদস্য ক্রিস্টোফার সিডটি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের নিপীড়নের বিষয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গন যেভাবে নিষ্ক্রিয় থেকেছে, তা হতাশজনক, এর অবসান ঘটাতে হবে।’
“যদি জাতিসঙ্ঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবারো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তবে দুঃখজনক এ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।’


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum