১৬ অক্টোবর ২০১৯

হার্ডলাইনে শেখ হাসিনা আতঙ্কে বিতর্কিতরা

-

দলের ইমেজ রক্ষায় কঠোর অবস্থানে রয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নানা বিতর্কের মুখে ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতাকে অপসারণের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন তিনি। ক্যাডার, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজদের জঙ্গি ও মাদকের মতো নির্মূল করার ঘোষণায় দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বিতর্কিত নেতাকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বিতর্কিত মন্ত্রী-এমপিসহ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর দল ও সরকারের ইমেজ রক্ষায় বেশ তৎপর রয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলের বিভিন্ন ফোরামে নেতাকর্মীদের সেই মনোভাব ব্যক্ত করেছেন তিনি। সব ধরনের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাজ করতে নেতাকর্মীদের একাধিকবার আহ্বান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এমন আহ্বানের পরও সরকারের মন্ত্রী ও এমপি থেকে শুরু করে দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠছে। সর্বশেষ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজ থেকে ৮৬ কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠে। বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে সমালোচনার পর দুই নেতাকে অপসারণ করে দুইজনকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেন শেখ হাসিনা। এ ঘটনায় বিতর্কিত নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
দল ও সরকারের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দল ও সরকারের কর্তাব্যক্তিদের ব্যাপারে নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলের বিভিন্ন সূত্র এবং একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে নিয়মিত মনিটরিং করছেন তিনি। বিশেষ করে মন্ত্রিসভার সব সদস্য, এমপি, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এবং সহযোগী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ব্যাপারে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করছেন সরকার প্রধান শেখ হাসিনা। তাদের অনেকের আমলনামা শেখ হাসিনা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন। এ ব্যাপারে বিতর্কিতদের একাধিকবার সতর্ক করেছেন তিনি।
সর্বশেষ শনিবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভার সূচনা বক্তব্যে আওয়ামী লীগের প্রতি জনগণের আস্থা বেড়েছে দাবি করে শেখ হাসিনা বলেন, এই আস্থা ও বিশ্বাস ধরে রাখতে দলের সবপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সচেতন থাকতে হবে। জনগণের আস্থায় যেন ফাটল না ধরে সে জন্য নেতাকর্মীদের সজাগ থাকতে হবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতিটি কর্মীকে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করতে হবে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনেরও আহ্বান জানান তিনি।
উন্মুক্ত বক্তব্যের পর রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ছাত্রলীগের প্রসঙ্গ উঠল দুই শীর্ষ নেতাকে অপসারণ করে পরবর্তী দুইজনকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেন শেখ হাসিনা। এ সময় দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। ছাত্রলীগের সদ্য অব্যাহতি পাওয়া সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর সাথে তুলনা করে যুবলীগের কিছু নেতার উদ্দেশে ক্ষুব্ধ শেখ হাসিনা বলেন, ‘এরা আরো খারাপ।’
ঘটা করে শেখ হাসিনার জন্মদিন পালন এবং শনিবার যুবলীগের মিলাদ ও দোয়া মাহফিল প্রসঙ্গ উঠলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চাঁদাবাজির টাকা বৈধ করতে মিলাদ-মাহফিল করা হয়েছে। নিজের জন্য এমন মিলাদ মাহফিল তিনি চান না। এরপর যুবলীগ নিয়ে তার কাছে আসা নানা অভিযোগ তুলে ধরেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যখন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে তখন কেউ অস্ত্র নিয়ে বের হয়নি, অস্ত্র উঁচিয়ে প্রতিবাদ করেনি। যখন দলের দুঃসময় ছিল তখন কেউ অস্ত্র নিয়ে দলের পক্ষে অবস্থান নেয়নি। এখন টানা তিন বার সরকারে আছি। অনেকের কাড়ি কাড়ি টাকা পয়সা হয়েছে। কিন্তু আমার সেই দুর্দিনের কর্মীদের অবস্থা একই আছে। যারা অস্ত্রবাজি করেন, যারা ক্যাডার পালেন, তারা সাবধান হয়ে যান, এসব বন্ধ করুন। তা না হলে, যেভাবে জঙ্গি দমন করা হয়েছে, একইভাবে তাদেরকেও দমন করা হবে। সভায় দায়িত্ব পালনে গাফিলতির কারণে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকদেরও সতর্ক করেন শেখ হাসিনা।
আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো জানায়, শনিবার সারা রাত এবং গতকাল রোববার সারা দিন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ ছিল ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতার অপসারণ। পাশাপাশি যুবলীগ নেতাদের উপর ক্ষোভের বিষয়টিও আলোচনায় ছিল তুঙ্গে। বিষয়টিকে বিতর্কিত নেতাকর্মীদের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে মনে করছেন তারা। ফলে ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি করেন এমন অনেক নেতা, মন্ত্রী, এমপি ও সহযোগী সংগঠনের বিতর্কিত নেতারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। শীষ্যদের আপাতত সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন অনেকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘এবার অপরাধ করে আর কেউ পার পাবে না। দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী কারো ব্যক্তিগত অপরাধের দায় নিতে রাজি নন। ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতাকে অপসারণের মাধ্যমে তিনি সেটার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফলে ভবিষ্যতে হয়তো অনেক মন্ত্রী-এমপিকেও জেলে যেতে হতে পারে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ বিদেশে যে সুনাম ও খ্যাতি অর্জন করেছেন, বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে যে সম্মানজনক স্থানে উপনীতি করেছেন তা কোনোভাবেই নস্যাৎ হতে দেবেন না। দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীর খোঁজ-খবর তিনি রাখেন। অপরাধ করে কেউ দল ও সরকারের সুনাম নষ্ট করবেন সেটা হতে পারে না। ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত দিয়ে তিনি সেটা প্রমাণ করেছেন। তাই যারা দলের নামে, পদের নামে অপকর্ম করার চিন্তা করছেন, তাদের সতর্ক হতে হবে। এ ক্ষেত্রে কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।’
দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, অনিয়ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স অবস্থানে রয়েছে সরকার। অন্যায় অনিয়ম যেই করুক ছাড় দেয়া হবে না। অন্যায় যে করবে তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum