১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আলোচনায় জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল

দলমতের ঊর্ধ্বে যোগ্য ও অভিজ্ঞদের নিয়ে গঠনের পরামর্শ বিশ্লেষকদের
-

দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তথ্য সমন্বয়ে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠনের চিন্তা করছে সরকার। উন্নত দেশের আদলে গঠিত এ ফোরামটি মন্ত্রিসভার সিনিয়র সদস্য, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তা, পুলিশ-র্যাবের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে পরিচালিত হবে। নিরাপত্তাবিষয়ক যেকোনো সিদ্ধান্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে নেয়াসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে কাজ করবে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, বহির্বিশ্বের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলাসহ জঙ্গিবাদের মতো বিষয় নিয়েও কাজ করবে এটি। সরকারের একাধিক সূত্র এ আভাস দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নবগঠিত জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের অফিস হবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। তবে এটি গঠনের প্রক্রিয়াটি এখনো প্রাথমিক অবস্থায় রয়েছে। ইতোমেধ্যে একাধিক কমিটি এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।
সূত্র আরো জানায়, সম্প্র্রতি আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক একটি সভায় অনির্ধারিত এক আলোচনায় উঠে আসে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠনের বিষয়টি। তখন এর দায়িত্বে কারা আসতে পারেন তা নিয়েও আলোচনা হয় সেখানে। আলোচনায় ডিএমপি কমিশনার ড. মো: আছাদুজ্জামান মিয়ার নাম উঠে আসে।
এর আগে গত ১৩ আগস্ট অবসরে যাওয়ার নির্ধারিত দিন ছিল ডিএমপির ২৭তম কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার। কিন্তু আগস্ট মাসে নিরাপত্তা পরিস্থিতিসহ সার্বিক দিক বিবেচনা করে তাকে এক মাসের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। তার অবসরপরবর্তী সময়ে বিশেষ দায়িত্ব হিসেবে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সচিব করা হতে পারে বলে সূত্রগুলো আভাস দিয়েছে।
সরকারের একাধিক সূত্র জানায়, বিশ্বের অনেক দেশেই বিভিন্ন নামে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মতো প্রতিষ্ঠান আছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ আছে। আঞ্চলিকভাবে শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন সংস্থা জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মতো কাজ করছে। বৈশ্বিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার নিয়ে বিবদমান তিন শক্তি-যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনেও আছে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ। এটি রাষ্ট্র প্রধান বা সরকার প্রধানকে নিরাপত্তা বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকে। এর মাধ্যমে সব ধরনের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিতভাবে পরামর্শ আসে। ফলে সিদ্ধান্তের দায়ও এককভাবে কারো ওপর বর্তায় না। তবে ওই প্রতিষ্ঠান কেবল পরামর্শ দেয়, সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা থাকে রাষ্ট্র প্রধান বা সরকার প্রধানের হাতে।
কিন্তু সঙ্কটকালে জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য আমাদের দেশে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই। বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতি, সন্ত্রাসের ঝুঁকি ও স্থানীয়ভাবে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দেয়ার মতো পরিস্থিতিতে কৌশল ঠিক করা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য বিভিন্ন সময়ে একটি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ গঠন করার পরামর্শ আসছিল বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ভৌগোলিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক কারণে বৈশ্বিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে। ভারত ও চীন বড় শক্তি হিসেবে আঞ্চলিকভাবে নিজেদের প্রভাববলয় তৈরি করতে চায়। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র চায় বাংলাদেশকে নিজের প্রভাববলয়ে রাখতে। বাংলাদেশে এক দিকে আছে ১৬ কোটি মানুষের বাজার; অন্য দিকে আছে কম খরচে পণ্য তৈরির সুবিধা, প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় মজুদ এবং পাশের বিভিন্ন দেশের সাথে পণ্য পরিবহন ও যোগাযোগের ব্যাপক সম্ভাবনা। এসব কারণে বাংলাদেশের দিকে নজর আছে বড় শক্তিগুলোর। ২০২৪ সাল নাগাদ মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার অপেক্ষায়ও আছে বাংলাদেশ। অর্থনীতি যত বড় হবে বাণিজ্য তত বাড়বে। জ্বালানি ও বাজার ধরার প্রয়োজন বাড়বে। সে ক্ষেত্রে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত রেখে বৈশ্বিক রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে হবে বাংলাদেশকে। এ ক্ষেত্রে কৌশল কী হবে সে পরামর্শও আসতে পারে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ থেকে। সে জন্য সময়ের চাহিদা অনুযায়ী জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ গঠন করা দরকার।
এর আগে বাংলাদেশে সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ গঠন করার উদ্যোগ নিয়েছিল। ওই সরকারের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) এম এ মতিন বিবিসিকে বলেছিলেন, এই পরিষদ মূলত জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলো দেখাশোনা করবে। তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টা এই পরিষদের প্রধান হবেন এবং সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানের পাশাপাশি সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিরাও এতে সদস্য হিসেবে থাকবেন। তবে সেটি আর বেশি দূর এগোয়নি।
সম্প্রতি ডিএমপি কমিশনার মো: আছাদুজ্জামান মিয়ার অবসরকে ঘিরে জাতীয় নিরাপত্ত পরিষদ গঠনের বিষয়টি আবারো আলোচনায় আসে। নানা চ্যালেঞ্জ পার করে সবচেয়ে বেশি সময় ডিএমপি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় আছাদুজ্জামান মিয়ার ওপর আস্থা রাখতে চাইছে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল। তারই ধারাবাহিকতায় তাকে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দায়িত্ব দিতে চায় সরকার। এটি গঠন হলে তাকে সচিব পদে বসানো হতে পারে বলেও গুঞ্জন রয়েছে।
বাংলাদেশে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মতো একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠনের প্রয়োজনীয়তা আছে কি না জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেক আগেই জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ গঠনের প্রয়োজন ছিল। আমি অনেক আগ থেকেই এটি গঠনের কথা বলে আসছিলাম। অনেক দেরি হয়ে গেছে। এর আগে একাধিকবার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ গঠনের কথা আলোচনায় এলেও তা আর বেশি দূর এগোয়নি। সে জন্য দেশের সার্বিক নিরাপত্তা, সঙ্কটকালে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে অবিলম্বে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ গঠন করা যেতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ভিক্টিমলজি অ্যান্ড রিস্টোরেটিভ জাস্টিসের অধ্যাপক ড. শেখ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশেই জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল রয়েছে। আমাদের দেশের বিভিন্ন সঙ্কটময় মুহূর্তে এটির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হলেও সেটি গঠন করা হয়নি। সে জন্য সম্পূর্ণ দলমতের ঊর্ধ্বে ওঠে পরিচ্ছন্ন, যোগ্য ও অভিজ্ঞদের নিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠন করা হলে দেশের মানুষ ও রাষ্ট্র উপকৃত হবে। এটি হবে জাতীয় দুর্যোগময় সময়ে সম্মিলিত সিদ্ধান্তের প্রতীক।
তিনি আরো বলেন, দেশের নিরাপত্তা সবচেয়ে অগ্রাধিকারের বিষয়। এর ওপর ভিত্তি করে অন্যান্য নীতি নেয়া হয়। এখনো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মাধ্যমে সব সংস্থা জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ে আলোচনা করে, বিশ্লেষণ করে এবং অনেক সময় তারা বিশ্লেষকদেরও ডেকে তাদের মতামত নেয়। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্ত কাউন্সিলের মতো বিশেষায়িত কমিটি থাকলে আরো ভালো হয়। তবে সেটি হতে হবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সহায়ক হিসেবে। তারা নিরাপত্তার বিষয়গুলো সার্বক্ষণিক নজরে রাখবে, বিশ্লেষণ করবে এবং কৌশল ঠিক করবে। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিবে তারা। সে জন্য দলমতের ঊর্ধ্বে ওঠে সেখানে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের প্রাধান্য দেয়া আবশ্যক। তাহলে মানুষের আস্থা বাড়বে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদউল আলম মজুমদার বলেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল কাদের নিয়ে করা হবে, কী উদ্দেশে করা হবে এবং তাদের দায়িত্ব কী হবে সেটি দেখার বিষয়। একটি গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নিরাপত্তা পরিষদ গঠন করা হয় সেভাবে বাংলাদেশে গঠিত হলে সেটি হয়তো জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রে ভূমিকা রাখবে।’

 


আরো সংবাদ