১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ডেঙ্গুতে চিকিৎসক নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু ৫ শতাংশ

-

ডেঙ্গু রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে বাংলাদেশে ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী মৃত্যু হার মোট মৃত্যুর ৫ শতাংশ। সরকারি হিসেবে চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত ৪৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। বেসরকারি হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা শতাধিক।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানিয়েছে, গতকাল রোববার সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ২৯৯ জন। গত শনিবারের চেয়ে গতকাল ১২০ জন বেশি আক্রান্ত হয়ে দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। গতকাল রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগীর সংখ্যা ৬০৭ জন এবং রাজধানীর বাইরের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা ৬৯২ জন। রাজধানীতে সরকারি হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা ৪২৫ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৭৮ জন।
গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা তিন হাজার ২৬৮ জন এবং রাজধানীর বাইরে চিকিৎসা নিচ্ছে দুই হাজার ৬৭২ জন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা: কনক কান্তি বড়–য়া জানিয়েছেন, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ ডেঙ্গু মোকাবেলা করছে দৃঢ়তার সাথে। চিকিৎসক-নার্সরা আন্তরিকভাবে সেবা দিয়ে নিজেরাই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। মৃত্যু হতে পারে জেনেও চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা ডেঙ্গু রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি এ জন্য গর্বিত। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মৃত্যু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মোট মৃত্যুর তুলনায় ২০ থেকে ২৫ গুণ বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইড লাইন অনুসারে ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হার ১ শতাংশেরও কম হতে হবে। বিভিন্ন দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু সংখ্যা দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশে এই হার দশমিক ২ শতাংশেরও কম। তিনি গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ব্লকের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘ডেঙ্গু : বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষিত’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখছিলেন।
গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত পূর্বের ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯৬ জন। মিটফোর্ড হাসপাতালে ৯৪ জন, ঢাকা শিশু হাসপাতালে ১৮, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৪৫, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০, পুলিশ হাসপাতালে ৮, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৫৭, কর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৬০, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ১১ জন, বিজিবি হাসপাতালে ২ জন, কুয়েত মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে ৬ জন, অন্যান্য সরকারি হাসপাতালে ২ জন। রাজধানীর বাইরে ঢাকা বিভাগে ১৭৪, চট্টগ্রাম বিভাগে ৮৪, খুলনা বিভাগে ১৬৬, রাজশাহী বিভাগে ৭৮, রংপুর বিভাগে ২৮, বরিশাল বিভাগে ১২৬, সিলেট বিভাগে ১০ এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ২৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
এছাড়া রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১৬ জন, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে ১৭ জন, বারডেম হাসপাতালে ১ জন, ইবনে সিনা হাসপাতালে ৭ জন, স্কয়ার হাসপাতালে ৫ জন, সেন্ট্রাল হাসপাতালে ১৬, কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে ১৪ জন, গ্রীন লাইফ হাসপাতালে ২ জন, সিরাজুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৭ জন, আদদীন হাসপাতালে ৬ জন, উত্তরা আধুনিক হাসপাতালে ১২ জন, সালাহউদ্দিন হাসপাতালে ৯ জন ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেঙ্গু সেলে চালু হওয়ার পর থেকে ২৫ আগস্ট সকাল ৮টা পর্যন্ত এক হাজার ২১ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। এরমধ্যে ৩ জন মারা গেছেন। ভিসি জানান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, নিটোর, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চিকিৎসক প্রেরণ করা হয়েছে।
এদিকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গতকাল মাদারীপুরের শিবচরে এক গৃহবধূ ও কিশোরগঞ্জে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
শিবচর (মাদারীপুর) সংবাদদাতা জানান, মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ঢাকায় নেয়ার পথে ডেঙ্গু আক্রান্ত সুমি আক্তার (৩০) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে শিবচরে ৪ জনসহ মাদারীপুরে এখন পর্যন্ত ৮ ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
জানা যায়, গত ২০ আগস্ট শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন ডেঙ্গু আক্রান্ত গৃহবধূ সুমি আক্তার। কিন্তু শনিবার তার অবস্থার অবনতি ঘটলে রাতেই তাকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। পদ্মা পাড়ি দিয়ে ঢাকা আনার পথেই তার মৃত্যু হয়। সুমি ১ মেয়ে ও ২ ছেলের জননী। সুমি উপজেলার কাঁঠালবাড়ি ঘাট এলাকার স্পিডবোটচালক আনোয়ার ফকিরের স্ত্রী। শিবচর উপজেলা পরিবার ও পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: মো: আব্দুল মোকাদ্দেস বলেন, শনিবার সুমির শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। এখনো হাসপাতালে ২৪ জন রোগী ভর্তি আছে।
কিশোরগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, কিশোরগঞ্জে ডেঙ্গু জ্বরে ১০ বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রোববার সকাল ৯টার দিকে ২৫০ শয্যার কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে মাহফুজা নামে ওই শিশু মারা যায়। সে কিশোরগঞ্জের পার্শ্ববর্তী ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার জাহাঙ্গীরপুর ইউনিয়নের বড়িল্লা গ্রামের আবুল মনসুরের মেয়ে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় রোববার সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে পরিবারের লোকজন শিশুটিকে কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে এনে ভর্তি করায়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা: ইফতেখার উদ্দিন জানান, শিশুটিকে যখন ভর্তি করা হয় তখন সে খুব দুর্বল ছিল। আমরা ভর্তি করার সাথে সাথে শিশুটিকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে দ্রুত ইসিজি করাই। পরে তাকে সিপি ওয়ার্ডে পাঠাই। সেখানে সকাল ৯টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
সাতক্ষীরা সংবাদদাতা জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় সাতক্ষীরার বিভিন্ন হাসপাতালে আরো ১৩ ডেঙ্গু রোগীর সন্ধান মিলেছে। এ নিয়ে গতকাল পর্যন্ত জেলায় মোট ৩৩২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ৫৫ জন। চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন ২২৭ জন। উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র রেফার করা হয়েছে আরো ৫০ জনকে। আক্রান্তদের সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা: শেখ আবু শাহিন জানান, প্রতিদিন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে হাসপাতালে যারা ভর্তি আছেন তারা এখন আশঙ্কামুক্ত। ডেঙ্গু প্রতিরোধে জেলাব্যাপী নানা জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযান অব্যাহত রয়েছে।

 


আরো সংবাদ