২২ আগস্ট ২০১৯

দ্বিগুণ ব্যয়ে মেট্রোরেল লাইন-৫ সুদ পরিশোধেই যাবে ২ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা

-

চলমান প্রকল্প থেকে প্রতি কিলোমিটারে দ্বিগুণ ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে মেট্রোরেল লাইন-৫ প্রকল্প বাস্তবায়নে। আর মেয়াদ বৃদ্ধি পেলে প্রকল্প সমাপ্তিতে এই বাস্তবায়ন খরচ আরো বৃদ্ধির আশঙ্কা করেছে পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি)। একইভাবে প্রকল্পের জন্য নেয়া জাইকার ঋণের সুদ পরিশোধের পরিমাণও বাড়ছে। মেট্রোরেল লাইন-১ ও লাইন-৫ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৩ হাজার ৮৮৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। শিগগিরই প্রকল্প দু’টি অনুমোদনের জন্য একনেকে পাঠানো হবে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, রাজধানী ঢাকা বিশে^র অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর, যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৪৪ হাজার ১ শ’ জন মানুষ বসবাস করে। ঢাকা মহানগরী ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি ট্রিপ তৈরি হয়। আর আগামী ২০২৫ সালে এই ট্রিপের সংখ্যা ৪ কোটি ২০ লাখ এবং ২০৩৫ সালে ৫ কোটি ২০ লাখে উন্নীত হবে। এই বিশাল পরিবহনচাহিদা মেটানোর জন্য সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। ঢাকা শহরে ২০০১ সালে যেখানে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ছিল ২০ হাজার ৬ শ’, সেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে এখন নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা এক লাখ ৯৫ হাজার ৪ শ’। সে তুলনায় রাস্তার সংখ্যা তেমন বাড়েনি। ফলে যানজট দুর্বিষহ আকার ধারণ করেছে। ওই পরিকল্পনার আওতায় ৫টি মাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) ২টি বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি), তিনটি রিংরোড, ৮টি রেডিয়ার সড়ক, ৬টি এক্সপ্রেসওয়ে, ২১টি ট্রান্সপোর্টেশন হাব নির্মাণ করা হবে। তারই অংশ হিসেবে রাজধানী ঢাকার যানজট কমানো এবং যাতায়াতব্যবস্থা আধুনিক করতে মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
তুলনামূলক ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে মেট্রোরেল লাইন-৬ এর কাজ চলমান আছে। মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্পটি (লাইন-৬) ২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদন পায়। উত্তরা থেকে পল্লবী, সোনারগাঁও হোটেল হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক করিডোর পর্যন্ত ২০.১ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল স্থাপনের কাজ চলছে। এতে প্রায় ৭৬ শতাংশ অর্থ অর্থাৎ ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকার জোগান দেবে জাপান সরকার। বাকি ব্যয় সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে মেটানো হবে। তিনটি স্তরে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২০২৪ সালের জুন। এই প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে এক হাজার ৯৩ কোটি ৭৮ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রকল্পের কাজ এখনো ১৪ শতাংশ পিছিয়ে আছে বলে আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আর প্রস্তাবিত ২০ কিলোমিটার মেট্রোরেল লাইন-৫ বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ হাজার ২৬১ কোটি ৫১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এই রুট হলো, হেমায়েতপুর, আমিনবাজার, গাবতলী, মিরপুর-১, মিরপুর-১০, মিরপুর-১৪, কচুক্ষেত, বনানী, গুলশান-২, নতুনবাজার, ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার। এটার নাম দেয়া হয়েছে নর্দান রুট। চলতি বছর জুলাইয়ে এই প্রকল্প অনুমোদন পেলে আগামী ২০২৮ সালের জুনে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই প্রকল্পে ৩০ হাজার ৭৫৬ কোটি ৪৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা ঋণ দিচ্ছে জাইকা। বাকি ১০ হাজার ৫০৫ কোটি ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা সরকারকে দিতে হবে।
প্রস্তাবিত লাইন-৫ নর্দান রুটে প্রতি কিলোমিটারে নির্মাণ ব্যয় হবে ২ হাজার ৬৩ কোটি ৭ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। এই অংশে পরামর্শক খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৭৯৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা। তবে এখানে প্রকল্প ঋণ থেকেই এই ব্যয়ের এক হাজার ৪৩৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা নির্বাহ করতে হবে। বাকিটা সরকারি খাত থেকে। প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণে ব্যয় হবে ৩ হাজার ২৪০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এই অংশে ২৩৬ জন জনবল নিয়োগের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। লাইন-৫ এ নেয়া ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হবে ২ হাজার ৮৬২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। তবে এই অর্থ সরকারি খাত থেকে নির্বাহ করার কথা মেমোরেন্ডাম অব ডিস্কাশনে (এমওডি) বলা হয়েছে।
অন ্যদিকে মেট্রোরেল লাইন-১ এয়ারপোর্ট-খিলক্ষেত-নতুনবাজার-বাড্ডা-মালিবাগ-কমলাপুর এবং ফিউচারপার্ক-বসুন্ধরা-পূর্বাচল পর্যন্ত ৩১ দশমিক ২৪১ কিলোমিটার। এই লাইন নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে ৫১ হাজার ৯০০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এখানে প্রতি কিলোমিটারে নির্মাণ ব্যয় হবে এক হাজার ৬৬১ কোটি ২৯ লাখ ৯ হাজার টাকা। এই অংশ বাস্তবায়নেও জাইকার সাথে চুক্তি হয়েছে। তারা ঋণ দেবে ৩৩ হাজার ৯১৪ কোটি ১১ লাখ টাকা। আর সরকারকে দিতে হবে ১৭ হাজার ৯৮৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা। প্রকল্পটি চলতি বছর অনুমোদিত হলে আগামী ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে সমাপ্ত হবে বলে প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে। এই অংশে প্রকৌশল সেবার জন্য চুক্তি হয় ২০১৭ সালের ২৯ জুনে। এই অংশে ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা। জনবল চাওয়া হয়েছে ২১১জন। আর লাইন-১ এর বিপরীতে নেয়া ঋণের জন্য সুদ দিতে হবে ১ হাজার ৯১৬ কোটি টাকাÑ যা সরকারি খাত থেকেই নির্বাহ করতে হবে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এই তিনটি প্রকল্পে জাইকার প্রকৌশল ঋণের জন্য ০.০১ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে। ১০ বছর গ্রেসপিরিয়ডসহ মোট ৩০ বছরে এই ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হবে। তবে অন্য ঋণের জন্য ০.৯০ শতাংশ হারে বছরে সুদ দিতে হবে। বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঢাকা মাস ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করেছে, প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো, একটি যথাযথ এমআরটি সিস্টেম প্রণয়ন করার মাধ্যমে নগরীর ট্রাফিক জ্যাম কমানোর জন্য গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ঢাকায় এমআরটি লাইন-১ স্থাপনের মাধ্যমে বায়ুদূষণ দূরীকরণ, অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান এবং শহরে পরিবেশের উন্নতি সাধন করা।
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট উইং বলছে, মেট্রোরেলের তিনটি রুটের জন্য প্রতি কিলোমিটারে তিন ধরনের ব্যয় দেখা যাচ্ছে। প্রতিটি রুট প্রকল্পেই ব্যয় ব্যবধান বাড়ছে। সঠিক সমীক্ষার মাধ্যমে এই ব্যয় প্রাক্কলন করা উচিত। আর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প সমাপ্ত করা না গেলে ব্যয় যেমন বাড়বে তেমনি ঋণের বিপরীতে বাড়তি সুদ গুনতে হবে।


আরো সংবাদ




mp3 indir bedava internet