২১ আগস্ট ২০১৯

ভাঙন আতঙ্কে বন্যার্ত মানুষ

ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বিলীন হচ্ছে রাস্তা, বসতভিটা ও ফসলি জমি; গাইবান্ধায় ট্রেন চলাচল এখনো বিঘিœত; বগুড়ায় বন্যার পানিতে ডুবে তিনজনের মৃত্যু
শরীয়তপুর পৌরসভার চরপালংয়ে কীর্তিনাশা নদীতে বিলীন হওয়া ঘরবাড়ি : নয়া দিগন্ত -

দেশের কোনো কোনো স্থানে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও বেশির ভাগ স্থানেই নদীতে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া ব্রহ্মপুত্র, বাঙ্গালিসহ বেশ কিছু নদ-নদীর পানি এখনো বাড়ছে। ফলে এসব নদীর তীরবর্তী এলাকার লোকজন এখন ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে। এসব এলাকার লোকজন ত্রাণের সঙ্কটে থাকার পরও তারা এখন বলছে, ত্রাণ চাই না, বাঁধ চাই। বাঁধ হলেই আমাদের ভিটেমাটি রক্ষা পাবে। আমাদের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাঁধ মেরামত করুন। এ ছাড়া কিছু স্থানে নতুন করে বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছে বন্যাকবলিত লোকজন।
বন্যা উপদ্রুত এলাকাগুলোর বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর বেশির ভাগই পানি ওঠার কারণে হলেও কিছু কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার জন্যও পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। এদিকে বগুড়ায় বন্যার পানিতে ডুবে এক স্কুলছাত্রসহ তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
ময়মনসিংহ অফিস জানায়, পাহাড়ি ঢল ও উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বাড়ার সাথে সাথে জেলায় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। পানি বাড়ার সাথে সাথে ব্রহ্মপুত্র নদের করাল গ্রাসে ময়মনসিংহ জেলার সদর, ঈশ্বরগঞ্জ, গৌরীপুর, ত্রিশাল ও গফরগাঁও উপজেলার ১৩টি পয়েন্ট তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। এসব উপজেলার প্রায় ২৫ কিলোমিটার ভাঙনের কবলে পড়ে বিলীন হচ্ছে। হুমকির মুখে রয়েছে নদের তীরবর্তী হাজারো ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদরাসা ও রেললাইন। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে সদর উপজেলার সেনেরচর-অষ্টাধর বাজার পাকা সড়কের এক কিলোমিটারসহ শতবর্ষের গাছপালা, বাঁশঝাড় এবং কয়েকশ’ হেক্টর জমি নদে চলে গেছে। প্রবল ভাঙনের মুখে শতাধিক পরিবার বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। সরিয়ে নেয়া হয়েছে দুই শতাধিক ঘরবাড়ি। নদে বিলীন হয়েছে পাকাসড়ক, গাছপালা, বাঁশঝাড়সহ কয়েকশ’ হেক্টর জমি। জেলার পাঁচটি উপজেলার শত শত মানুষ এখন গৃহহারা হয়ে পড়েছেন। এ অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে অবিলম্বে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান তারা।
শরীয়তপুর সংবাদদাতা জানান, শরীয়তপুর পৌরসভার এলাকার ৩ নং ওয়ার্ডে চরপালংয়ের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া কীর্তিনাশা নদীতে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। এ ভয়াবহ ভাঙনে গত ১ সপ্তাহে প্রায় ৫০টি ঘরবাড়িসহ বসতভিটা, ফসলি জমি ও ফলদ গাছ হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে বলে জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত ওই এলাকার মানুষ। ভাঙনের আতঙ্কে নদী তীরের মানুষরা নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। অনেকে তাদের বাড়িঘর ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। কীর্তিনাশা নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে বালু কেটে নেয়ার ফলেই এ ভাঙন দেখা দিয়েছে বলে দাবি স্থানীয় লোকজনের।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহ আগে থেকে শরীয়তপুরের কীর্তিনাশা নদীতে প্রবল ¯্রােত শুরু হয়। এ প্রবল ¯্রােতে কমপক্ষে ৫০ জনের ঘরবাড়ি, শত শত গাছপালা, ১০ একর ফসলি জমি, পানের বরজসহ অনেক মূল্যবান সম্পদ বিলীন হয়ে গেছে। তবে এ পর্যন্ত কোনো জনপ্রতিনিধি বা সরকারি কর্মকর্তা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করতে না যাওয়ায় সেখানে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা জরুরিভিত্তিতে ওই এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। ভিটেমাটি নদীভাঙনের মুখে থাকা নাছির কাজী বলেন, সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি, নদী শাসন করে আমাদের ভিটামাটি রক্ষা করা হোক।
লালমনিরহাট সংবাদদাতা জানান, জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। বাঁধ ও সড়কগুলো ভেঙে যাওয়ায় তিস্তা নদীর পানি একটু বাড়লেই নতুন করে লোকালয় প্লাবিত হচ্ছে। এতে মানুষজনের চলাচলের সমস্যাসহ গো-খাদ্যের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। সরকারি হিসাবে জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ২৩ হাজার ৪৩৪টি। এদিকে বন্যার কবল থেকে রক্ষা পেতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তিস্তা নদীতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন জেলার পাঁচ উপজেলার তিস্তা পাড়ের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো। তারা বলছেন, আমাদের ১৫ কেজি চাল আর চিঁড়া-মুড়ির (ত্রাণ) দরকার নাই, শরীরে শক্তি আছে কাজ করে খেতে পারি। ছেলেমেয়েদের নিয়ে রাতে একটু শান্তিতে ঘুমাতে চাই। বাঁচার জন্য তিস্তা নদীর বাঁধ করে দেন। বাঁধ তৈরি করে দিলে জমিজমা সব ফেরত পাবো, আমরা কাজ করে খাবো। একটি বেসরকারি সংস্থার জরিপ মতে, তিস্তা নদীর ভাঙনের কারণে গত ১০ বছরে অন্তত ২ লাখ পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, আমি নিয়মিত বন্যাকবলিত এলাকা ঘুরে দেখেছি। তিস্তা পাড়ের লোকজন ত্রাণ নয়, তারা বাঁধ চায়। তাদের দাবির সাথে আমরাও একমত। আশা করছি, খুব তাড়াতাড়ি কাজ শুরু হবে।
গাইবান্ধা সংবাদদাতা জানান, বন্যার কারণে গাইবান্ধায় সাত উপজেলার ৩৬৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। পাঠদান বন্ধ থাকা এসব বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩০৯টি বিদ্যালয় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া নদীভাঙনে ইতঃমধ্যে তিনটি প্রাথমিক ও একটি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিলীন হয়েছে। বন্ধ থাকা বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৮১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৮৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও চারটি কলেজ রয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অধিকাংশই দুর্গম চরে অবস্থিত।
এ দিকে বাঙ্গালি ও করতোয়া নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় পলাশবাড়ি ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার পৌরসভাসহ কয়েকটি গ্রামে নতুন করে পানি প্রবেশ করছে। এ ছাড়াও ঘাঘট নদীর শহর রক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় খোলাহাটি ইউনিয়নের বেশ কিছু অংশে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় জেলার সাত উপজেলার ৫১টি ইউনিয়নের ৪২৪টি গ্রাম ও ২টি পৌরসভার ৫ লাখ ৮৫ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়েছে। ঘরবাড়ির ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬৯ হাজার ৮৭০টি। এ ছাড়া ১৪ হাজার ২১ হেক্টর আউশ ধান, আমন বীজতলা, রোপিত আমন, পাট ও শাকসবজি বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদিকে গাইবান্ধা থেকে বোনারপাড়া রেলওয়ে জংশন পর্যন্ত বন্যার পানিতে ডুবে গিয়ে রেলপথের বিভিন্ন জায়গায় রেলপথ বিধ্বস্ত হওয়ায় ট্রেন চলাচল এখনো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে লোকাল এবং মেইল ট্রেন গাইবান্ধা থেকে বোনারপাড়া পর্যন্ত ট্রানজিট পদ্ধতিতে চলাচল করছে। অপর দিকে আন্তঃনগর লালমণি এক্সপ্রেস ও রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেন দু’টি পাবর্তীপুর-সান্তাহার হয়ে যাতায়াত করছে।
বগুড়া অফিস, সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা সংবাদদাতা জানান, বগুড়ার বন্যাকবলিত সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলায় পানিতে ডুবে এক স্কুলছাত্রসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। সারিয়াকান্দি উপজেলা সদরের বারুইপাড়ার লিটনের ছেলে সারিয়াকান্দি মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র ওমর ফারুক (১২) নানাবাড়ি বেড়াতে গিয়ে মঙ্গলবার বিকেলে যমুনা নদীতে ডুবে মারা যায়। অপর দিকে সোমবার সোনাতলায় বন্যার পানিতে ডুবে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন, উপজেলার আড়িয়াচকনন্দন গ্রামের মৃত মজিবর সরকারের ছেলে মকবুল হোসেন সরকার (৭০) ও পৌর এলাকার কামারপাড়া গ্রামের রোস্তম আলী প্রামাণিকের ছেলে শিফায়েত হোসেন (৪)।
এদিকে সোনাতলা উপজেলার বাঙ্গালি নদীর পানি বিপজ্জনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা বিভিন্ন এলাকা পানির নিচে ডুবে গেছে। এদিকে বগুড়ার সোনাতলা-গাবতলী সড়কের সোনাকানিয়া বাজারের কাছে ইঁদুরের গর্ত দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় ওই সড়কটি সোমবার হঠাৎ করে দেবে যায়। ওই স্থানে জরুরিভিত্তিতে মেরামত না করা হলে তা ভেঙে বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে পাট ও আউশ ধানের। এ ছাড়া সোনাতলা, সারিয়াকান্দি, গাবতলী, সাঘাটা ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় যাতায়াতকারী ২২টি ইউনিয়নের প্রায় ৩ লাখ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছাবে।

 


আরো সংবাদ




mp3 indir bedava internet