২২ আগস্ট ২০১৯

ছেলেধরা সন্দেহে ৪ জনকে গণপিটুনি : গ্রেফতার ৬০

চকরিয়ায় ৩ দিন ধরে শিশু নিখোঁজ
-

সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর, টাঙ্গাইল ও মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় গতকাল ছেলেধরা সন্দেহে এক মহিলাসহ চারজনকে গণপিটুনি দিয়ে মারাত্মক আহত করা হয়েছে। খবর পেয়ে আহত ওইসব লোককে উদ্ধার করে পুলিশ তাদের হেফাজতে নিয়েছে। গণপিটুনির এসব ঘটনায় পুলিশ ৬০ জনকে গ্রেফতার করেছে। এ ছাড়া কক্সবাজারের চকোরিয়ায় তিন দিন ধরে এক শিশু নিখোঁজ থাকায় জেলাজুড়ে ছেলেধরা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) সংবাদদাতা জানান, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ছেলেধরা সন্দেহে হাসিনা বেগম (৬০) নামে মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারীকে গণপিটুনির ঘটনায় ২০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। সোমবার রাতে উপজেলার রিফাইতপুর ইউনিয়নের শিতলাইপাড়া গ্রাম থেকে তাদের আটক করে পুলিশ।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ময়মনসিংহ থেকে দৌলতপুর মাস্টারপাড়া গ্রামের আশিকুর রহমান রনির বাড়িতে তার মানসিক ভারসাম্যহীন শাশুড়ি গত রোজার ঈদের আগে চিকিৎসার জন্য যান। গত সোমবার সকালে বাড়ির লোকজনের অজান্তে হাসিনা বেগম (৬০) নামে ওই নারী বাড়ি থেকে বের হয়ে পাশের শিতলাইপাড়া গ্রামে গেলে গ্রামের লোকজন ছেলেধরা সন্দেহে তাকে গণপিটুনি দেন। খবর পেয়ে দৌলতপুর থানা পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় হাসিনার জামাই আশিকুর রহমান রনি গত সোমবার বাদি হয়ে একটি মামলা করলে পুলিশ রাতে তাদের আটক করে। মঙ্গলবার দুপুরে আটককৃতদের জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়।
দৌলতপুর থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) আজিজুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় মামলার এজহারে ২০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এসব গুজব যারা ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মুন্সীগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় বালুয়াকান্দি ইউনিয়নের বড় রায়পাড়া গ্রামে ছেলেধরা সন্দেহে একজনকে গণপিটুনি দিয়েছে উত্তেজিত জনতা। পরে খবর পেয়ে গজারিয়া থানা পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়, তবে প্রাথমিক তদন্তে নিরপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। সন্দেহভাজন ব্যক্তির নাম হাকিম আলী (৫৫)। তিনি নারায়ণগঞ্জ বদর উপজেলার লাওসার গ্রামের মৃত হোসেন আলীর ছেলে।
জানা যায়, গত সোমবার নিজ বাড়ি বন্দর থেকে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার তেতৈতলা গ্রামে আত্মীয় উকিল উদ্দিনের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন তিনি। গতকাল সকালে গ্রাম ঘুরে দেখার জন্য বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে বড় রায়পাড়া গ্রামে চলে যান তিনি। সেখানে এক দোকান থেকে চকলটে কেনার পর স্থানীয় লোকজন তাকে নানা প্রশ্ন শুরু করেন। একপর্যায়ে গণধোলাই শুরু করে উপস্থিত লোকজন। খবর পেয়ে গজারিয়া থানা পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। প্রাথমিক চিকিৎসা করে প্রাথমিক তদন্তে বিষয়টি গুজব ও লোকটি নিরপরাধ বলে নিশ্চিত হয় পুলিশ। পরে তাকে ছেড়ে দেয়।
সিরাজগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, সিরাজগঞ্জে ছেলেধরা সন্দেহে একজনকে গণপিটুনি দিয়ে মারাত্মক আহত করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে সদর উপজেলার পাইকপাড়া দারুল উলুম কওমি মাদরাসায় এই ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে গণপিটুনির শিকার যুবককে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। আহত আলম পৌর এলাকার গয়লা বটতলা এলাকার আব্দুর রহিমের ছেলে।
সিরাজগঞ্জ সদর থানার এসআই হাসান মাহফুজ জুয়েল জানান, স্থানীয়দের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আলম মাদকাসক্ত ও চোর হিসেবে পরিচিত। এই ঘটনায় মাদরাসার অধ্যক্ষ হাফিজুর রহমান, স্থানীয় আয়নাল হক, মোখলেছ ও আওয়ালকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
চকরিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, কক্সবাজারের চকরিয়ায় ৯ম শ্রেণীতে পড়ুয়া এক স্কুলছাত্র তিন দিন ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। সারা দেশে ছেলে ধরা আতঙ্কের গুজব থাকায় এনিয়ে পরিবারে চলছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। এ ব্যাপারে পরিবারের পক্ষ থেকে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে চকরিয়া প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয়।
নিখোঁজ ছাত্রের বাবা মোহাম্মদ ইলিয়াছ উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, তিনি পেশায় একজন কৃষক ও দিনমজুর। তার ছেলে মো: তৌহিদুল ইসলাম তছিন (১৩) পেকুয়া উপজেলার শিলখালী উচ্চবিদ্যালয়ে ৯ম শ্রেণীতে পড়ালেখা করে। প্রতিদিনের ন্যায় নিজবাড়ি চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়া পাড়া থেকে স্কুলে যাওয়ার পথে গত ২০ জুলাই সে নিখোঁজ হয়। নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পরেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। সারা দেশে ছেলে ধরার গুজবে তার অসহায় পিতা-মাতা ও পরিবার বর্গ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে ছেলের সন্ধান চেয়ে তার পিতা পেকুয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি (নম্বর ৬৮০, তাং ২১/৭/১৯ইং করেছেন।
পেকুয়া থানার ওসি (তদন্ত) মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, নিখোঁজ স্কুলছাত্রের সন্ধান পাওয়া কিংবা উদ্ধারের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
কুষ্টিয়া সংবাদদাতা জানান, ছেলেধরা সন্দেহে একদিনে কুষ্টিয়ায় চারজন গণপিটুনির শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে তিনজন মানসিক ভারসাম্যহীন ছিল বলে জানা গেছে। পৃথক ঘটনা হলেও সবাইকে পুলিশ গণপিটুনি দেয়ার সময় উদ্ধার করেছে। গত সোমবার জেলার তিনটি স্থানে এই গণপিটুনির ঘটনা ঘটে।
এসব ঘটনায় কুষ্টিয়া মডেল থানা ও দৌলতপুর থানায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। মামলায় আসামি করা হয়েছে প্রায় ৪৫০ জনকে। এ ঘটনায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ ৩৪ জনকে আটক করেছে। এর মধ্যে দৌলতপুর থানা পুলিশ ২০ জন ও কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশ ১৪ জনকে গ্রেফতার করে।
টাঙ্গাইল সংবাদদাতা জানান, টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ছেলে ধরা সন্দেহে মিনু মিয়া (৩০) নামের এক ভ্যানচালককে গণপিটুনির ঘটনায় সোমবার রাতে ছয়জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
গ্রেফতারকৃতরা হচ্ছেÑ কালিহাতী উপজেলার নাগা গ্রামের মৃত তরিকুল আলম সিদ্দিকির ছেলে মাইনুল হক হিটু (৩৭), সন্তোষ চন্দ্র মালুর ছেলে প্রভাত চন্দ্র মালু (১৯), আনোয়ার হোসেন খানের ছেলে শিশির (৩২) ও ওমর (৩২), মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে মিজানুর রহমান তালুকদার (৪৭) এবং একই উপজেলার পালিমা গ্রামের ফজলু মিয়ার ছেলে আলামিন ইসলাম (১৯)।
এ নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) শফিকুল ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত রোববার ছেলেধরা সন্দেহে কালিহাতী উপজেলার সয়া হাটে ভ্যানচালক মিনু মিয়াকে গনপিটুনি দেয় স্থানীয়রা। কিন্তু তিনি ছেলেধরা ছিলেন না। মূলত তিনি মাছ ধরার জাল কিনতে হাটে গিয়েছিলেন। এ ঘটনায় মিনুর ভাই রাজিব হোসেন বাদি হয়ে গত সোমবার সন্ধ্যায় কালিহাতী থানায় মামলা দায়ের করেন। পুলিশ রাতেই অভিযান চালিয়ে ছয় জনকে গ্রেফতার করে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে তাদের কোর্টে চালান দেয়া হয়।
এ ছাড়া ছেলেধরা হিসেবে কাউকে সন্দেহ হলে আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে পুলিশকে জানানোর জন্য অনুরোধ করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
শ্রীপুরে ছেলেধরা প্রচার করে স্বামীকে গণপিটুনি : বান্ধবীসহ স্ত্রী আটক
গাজীপুর সংবাদদাতা জানান, গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার নয়নপুর বাজারে গতকাল ছেলেধরা অভিযোগে এক যুবককে গণপিটুনি দিয়েছেন এলাকাবাসী। গণপিটুনির শিকার শহীদুল ইসলাম (৩৫) গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার বেড়াইদেরচালা এলাকায় থাকেন। এ সময় দুই নারীকে আটক করে পুলিশে দিয়েছেন জনতা। তারা হলোÑ নয়নপুর এলাকার তানিয়া আক্তার ও তার বান্ধবী প্রিয়া। তাদের উভয়ের বয়স আনুমানিক ২৫ বছর।
স্থানীয়রা জানান, ঘটনার সময় নয়নপুর বাজার এলাকায় ওই দুই নারী শহীদুল ইসলামকে জড়িয়ে ধরে ছেলেধরা বলে চিৎকার শুরু করে। পরে আশপাশের লোকজন এসে শহীদুল ইসলামকে গণপিটুনি দেয়। একপর্যায়ে শহীদুল ইসলাম দৌড়ে পালিয়ে যায়। পরে ওই নারীরা পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় ওই নারীদের পাকড়াও করে পুলিশে খবর দেয়া হয়।
শ্রীপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলাম জানান, পারিবারিক বিরোধে স্ত্রীকে না জানিয়ে শহীদুল ইসলাম নয়নপুর এলাকায় অবস্থান করছে। এমন খবরের ভিত্তিতে স্ত্রী তানিয়া আক্তার বান্ধবী প্রিয়াসহ তার স্বামীর খোঁজ করতে যায়। পরে বেলা ১২টায় নয়নপুর বাজারে তাদের সাক্ষাৎ হলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বাগি¦তণ্ডা হয়। একপর্যায়ে স্ত্রী তানিয়া ও তার বান্ধবী ছেলেধরা বলে চিৎকার শুরু করে। এতে স্থানীয়রা শহীদুল ইসলামকে কিছু উত্তম-মধ্যম দিলে সে পালিয়ে যায়। পরে ওই নারীরা পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় এলাকাবাসী ওই দুই নারীকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন। ওই নারীদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনা হয়েছে। এ ঘটনা ছেলেধরা বিষয়ক কোনো ঘটনা নয়। এটি স্বামী-স্ত্রীর বিবাদের ঘটনা।


আরো সংবাদ




mp3 indir bedava internet