২০ আগস্ট ২০১৯

মেয়েকে দেখতে গিয়ে লাশ হলো বাক প্রতিবন্ধী সিরাজ

-

বাড়ির পাশের একটি মোবাইল ফোনের দোকান মালিকের কাছ থেকে ১০০ টাকা ধার নিয়ে মেয়ের জন্য চুড়ি ও লিপিস্টিক কিনে মেয়েকে দেখতে যান বাকপ্রতিবন্ধী সিরাজ (৩০)। কে জানতো মেয়েকে দেখাই তার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়াবে। সিরাজকে ছেড়ে তার স্ত্রী শামসুন্নাহার অন্য পুরুষের সাথে চলে যাওয়ার পর একমাত্র মেয়ে মিঞ্জুকে (৭) হন্য হয়ে খুঁজতে থাকে সিরাজ। সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি পূর্বপাড়া পাগলা বাড়ি এলাকায় তার মায়ের সাথে থাকে মিঞ্জু এমন খবর পায়। একাধিক বার মেয়েকে দেখেও আসে সিরাজ। শনিবারও মেয়ের জন্য চুড়ি লিপিস্টিক নিয়ে যায় সিরাজ। মেয়ের সাথে কথা বলার একপর্যায়ে তার স্ত্রীর বর্তমান স্বামী আব্দুল মান্নান ওরফে সোহেল তাকে দেখে ফেলে ‘ছেলেধরা’ বলে চিৎকার দিলে এলাকাবাসী গণধোলাই দেয় সিরাজকে। সেখান থেকে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত সিরাজের ভাই মোহাম্মদ আলম নয়া দিগন্তকে এমন তথ্য জানিয়েছেন।
মোহাম্মদ আলম আরো জানান, ১০ বছর আগে তার ভাই সিরাজের সাথে বিয়ে হয় শামসুন্নাহারের। বিয়ের পরে তাদের মিঞ্জু নামে এক কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। পরে ২০১৫ সালে সিরাজ শামসুন্নাহারকে নিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জের সাইলো এলাকার মোহন চান্দের বাড়িতে ভাড়ায় বসবাস শুরু করে। বেশ কিছুদিন তাদের সম্পর্ক ভালোই ছিল। এখানেই শামসুন্নাহারের সাথে পরিচয় হয় মান্নানের। শামসুন্নাহার এক সময় মান্নানের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে যায়। পরকীয়ার টানে আট মাস আগে শামসুন্নাহার সিরাজকে তালাক দিয়ে মান্নানকে বিয়ে করে। শামসুন্নাহার এ সময় তার সাথে ৭ বছরের মেয়ে মিঞ্জুকে নিয়ে আসেন। এরপর থেকে প্রতিবন্ধী সিরাজ নিজের মেয়ে মিঞ্জুকে দেখতে প্রায়ই সিদ্ধিরগঞ্জের পাগলাবাড়ি এলাকায় আসতো। শনিবারও নিজের মেয়েকে দেখতে আসেন সিরাজ। কিন্তু সেই যাওয়াই তার শেষ যাওয়া। স্ত্রীর বর্তমান স্বামী মান্নানের ভুল তথ্যে সিরাজকে গণপিটুনিতে মরতে হলো।
জানা গেছে, সিরাজ পেশায় রাজমিস্ত্রির সহযোগী ছিলেন। সিদ্ধিরগঞ্জের সাইলো এলাকার ঠিকাদার মোহর চানের বাড়িতে ভাড়া থাকেন তারা। গ্রামের বাড়ি ভোলার লালমোহন থানার মুগিয়া বাজার এলাকায়। বাকপ্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও রাজমিস্ত্রির সহযোগী হিসেবে কাজ করে সংসার চালাতেন। এদিকে গতকাল রোববার তার লাশ সিদ্ধিরগঞ্জের সাইলোগেট এলাকায় নিয়ে গেলে কান্নায় ভেঙে পড়েন এলাকাবাসী। তাদের অনেককেই আক্ষেপ করে বলতে শোনা যায়, ‘এমন করে মানুষকে পিটিয়ে মারতে পারলো লোকজন!’ অনেকে এটাকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলেও উল্লেখ করেন ও হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে মিছিল করেন।
গণপিটুনিতে নিহত সিরাজ ও আহত শারমিনের ঘটনায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় দু’টি মামলা হয়েছে। ভিকটিম সিরাজের বিষয়ে এসআই শাখাওয়াত বাদি হয়ে মামলা করেন। আহত শারমিনের মা তাসলিমা বেগম বাদি হয়ে আরেকটি মামলা করেন। দু’টি মামলায় ১৪ জনকে ইতোমধ্যে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।
নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ জানান, বর্তমান সময় ছেলেমেয়ে ধরা সন্দেহে কিংবা গলা কাটা সন্দেহে গণপিটুনি দিয়ে নিরীহ লোকজনকে মারা হচ্ছে যা অনাকাক্সিক্ষত। সন্দেহবশত কাউকে পিটিয়ে মারা যাবে না। তাকে না মেরে আটক করুন। নিকটস্থ থানা বা পুলিশ বা আইন প্রয়োগ সংস্থার হাতে তুলে দিন।
পুলিশ সুপার বলেন, ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি একটি ফৌজদারি অপরাধ। আইন নিজের হতে তুলে নেবেন না। গণপিটুনির ঘটনায় যারা জড়িত তদন্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা রাষ্ট্রবিরোধী কাজের শামিল। সুতরাং কেউ অপরাধ করে পার পাবে না। তিনি জানান, নারায়ণগঞ্জ পুলিশের পক্ষ থেকে গুজবে কান না দেয়ার জন্য নারায়ণগঞ্জবাসীকে অনুরোধ করা হলো। আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য একটি চক্র এ ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের সব থানার ওসিদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে মাইকিং করার জন্য (ইতোমধ্যে মাইকিংয়ের কাযক্রম চলছে)। এলাকার জনপ্রতিনিধি, চেয়ারম্যান, কমিশনার, কাউন্সিলর মেম্বারসহ স্কুল কলেজ, মাদরাসার শিক্ষকদের সহিত এ বিষয়ে আলোচনা করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিকেশন (পিবি আই) নারায়ণগঞ্জ জোনের পরিদর্শক (প্রশাসন) জহিরুল ইসলাম জহির বলেন, শনিবার সকালে ঘটনার পরেই আমরা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করি। পিবিআইয়ের নারায়ণগঞ্জ জোনের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান, আমি ও এসআই সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞ টিপু সুলতানের নেতৃত্বে নিহতের ফিঙ্গার প্রিন্টসহ আনুসঙ্গ পরীক্ষা করে পরিচয় নিশ্চিত হয়েছি। নিহতের নাম সিরাজ। তার বাড়ি সিদ্ধিরগঞ্জের ৫নং ওয়ার্ড এলাকাতে। সিরাজের বাবার নাম আবদুর রশিদ মণ্ডল ও মায়ের নাম কমলা খাতুন। আর গণপিটুনিতে গুরুতর আহত শারমিন কেরানীগঞ্জের সালমান মিয়ার স্ত্রী।
কেরানীগঞ্জে গণপিটুনিতে আহত ব্যক্তির মৃত্যু
নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, ঢাকার কেরানীগঞ্জের খোলামুড়া এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে গুরুতর আহত অজ্ঞাত (৩৫) পুরুষ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। গত রাত সোয়া ৮টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তিনি মারা যান।
পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের খোলামুড়া আদর্শ স্কুলের সামনে ছেলেধরা সন্দেহে এক ব্যক্তিকে স্থানীয় লোকজন পিটুনি দেয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে ওই দিন রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত রাতে তিনি মারা যান। নিহতের লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে রয়েছে।


আরো সংবাদ




bedava internet