১৫ অক্টোবর ২০১৯

‘আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় আইনের পরিপন্থী’

যেকোনো দিন রিভিউর রায়
-

যাবজ্জীবন অর্থ আমৃত্যু কারাদণ্ড ঘোষণা করে আপিল বিভাগের দেয়া রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে আবেদনের শুনানি শেষ হয়েছে। রিভিউ আবেদনের বিষয়ে যেকোনো দিন রায় ঘোষণা করবেন আপিল বিভাগ। গতকাল বৃহস্পতিবার উভয় পক্ষের শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) ঘোষণা করেন।
বৃহস্পতিবার আপিল বিভাগে শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের নজির আদালতে উপস্থাপন করে আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। সে লক্ষ্যে সমন্বিত শাস্তিব্যবস্থা প্রণয়ন প্রয়োজন। তিনি বলেন, আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় আমাদের বর্তমান প্রচলিত আইনের পরিপন্থী।
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, দণ্ডবিধিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড নামে কোনো দণ্ড নেই। আর যাবজ্জীবন অর্থ আমৃত্যু কারাদণ্ড হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ এবং জেল কোডের সংশ্লিষ্ট বিধান অকার্যকর হয়ে যায়। এ ছাড়া যাবজ্জীবন অর্থ আমৃত্যু কারাদণ্ড হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১, ৪০২ এবং দণ্ডবিধির ৫৫ ধারায় প্রদত্ত সরকারের ক্ষমতা খর্ব করা হবে।
খন্দকার মাহবুব হোসেন আরো বলেন, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ব্যক্তির সংশোধন ও সংস্কার। এ মামলার রায়ে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার এ স্পিরিটকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। শুনানিকালে খন্দকার মাহবুব হোসেনের সাথে ছিলেন আইনজীবী শিশির মনির।
অপর দিকে রাষ্ট্রপক্ষের শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অর্থ হচ্ছে আজীবন বা আমৃত্যু কারাদণ্ড। যাবজ্জীবন অর্থ ৩০ বছর সাজা হবে না। আমৃত্যু কারাবাস করতে হবে।
আপিল বিভাগের শুনানি শেষে এক ব্রিফিংয়ে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আমাদের মূল বক্তব্য ছিল যাবজ্জীবন ন্যাচারাল লাইফ পর্যন্ত সাজা হবে না। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বর্তমান আইন মোতাবেক সর্বোচ্চ ৩০ বছর এবং ওই সময় থেকে বিচার চলাকালে জেলে থাকার সময় বাদ যাবে। তদুপরি জেল কোড অনুযায়ী সদাচারের জন্য বিভিন্ন মেয়াদে রেয়াত পাবে; কিন্তু আপিল বিভাগের এ রায় অনুযায়ী প্রচলিত আইনকে বাতিল করে দেয়া হয়েছে। এটা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী এবং আদালতের এখতিয়ার বহির্ভূত। তাই ওই রায়টি পুনর্বিবেচনার যোগ্য। আমরা বলেছি ওই রায় বাতিল করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে ৫২০৫ জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি রয়েছেন। আমরা আশা করি, এ মামলার রায় আমাদের পক্ষে আসবে। অর্থাৎ আইনের বিধান মোতাবেক হলে এতে সবাই সুবিধা পাবেন। অনেকে ২০ বছর বা ২৫ বছর পর বের হয়ে যেতে পারবেন।
এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, এ মামলায় চারজন অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দেয়া হয়। তারা সবাই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অর্থ ৩০ বছর বলেছেন। আদালতে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে লিখিত অভিমতে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফ বলেন, যাবজ্জীবন সাজার ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা জরুরি। মানবিক বিচারেও আমৃত্যু কারাদণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়। আরেক অ্যামিকাস কিউরি সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিন অভিমত দেন, যাবজ্জীবন অর্থ আমৃত্যু কারাদণ্ডÑ এ ধরনের ব্যাখ্যা দেয়া যাবে না। কারণ এতে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির মুক্তি পাওয়ার কোনো আশা থাকে না এবং সরকারের ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে খর্ব করা হয়। তাই যাবজ্জীবন অর্থ ৩০ বছর কারাদণ্ড রাখতে হবে।
এর আগে গত ৯ মে যাবজ্জীবন অর্থ আমৃত্যু কারাদণ্ড এ-সংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) আবেদনের শুনানি শুরু হয়। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতির বেঞ্চে রায়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন খন্দকার মাহবুব হোসেন।
শুনানিতে খন্দকার মাহবুব বলেছিলেন, যাবজ্জীবন সাজার একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকতে হবে। আমাদের আইনে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হিসেবে ৩০ বছর বলা আছে, যা রেয়াত পাওয়ার পর সাড়ে ২২ বছর হয়। উন্নত বিশ্বেও সাজার মেয়াদ বলে দেয়া হয়। সেখানে প্যারোল ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে কারাদণ্ডপ্রাপ্তদের দীর্ঘ দিন কারাগারে থাকতে হয় না; কিন্তু আমাদের দেশে সে ব্যবস্থা নেই। তাই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হিসেবে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হলে কারাগারগুলো বৃদ্ধাশ্রম হয়ে যাবে। তিনি বলেন, বর্তমানে সারা দেশের কারাগারে পাঁচ হাজার ৫৩৭ জন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রয়েছেন। এ-সংক্রান্ত রায় নিষ্পত্তি না হওয়ায় তারা ও তাদের পরিবার বুঝতে পারছে না কত দিন কারাগারে কাটাতে হবে।
এর আগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অর্থ আমৃত্যু কারাদণ্ডÑ একটি মামলায় আপিল বিভাগের এমন রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ নিষ্পত্তির জন্য চারজন সিনিয়র আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দেন আপিল বিভাগ। চারজন অ্যামিকাস কিউরি হলেনÑ সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফ, আইনজীবী আবদুর রেজাক খান ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন।
সাভারে ২০০১ সালে জামান নামের এক ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় নি¤œ আদালত ও হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বহাল থাকা আসামি আতাউর রহমানের সাজা কমিয়ে আপিল বিভাগ যাবজ্জীবন সাজা দেন। ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বিভাগের বেঞ্চ সাভারের জামান হত্যা মামলায় দুই আসামির আপিলের রায় দেয়ার সময় বলেন, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অর্থ ৩০ বছর নয়, বরং আমৃত্যু কারাদণ্ড। স্বাভাবিক মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত জেলে থাকতে হবে।
সে সময় প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, তিনি আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে দেখাবেন, ৩০ বছর নয়, যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাদণ্ড। বিশেষ করে আদালত যদি এ মর্মে আদেশ দেন যে আমৃত্যুই থাকতে হবে।
খন্দকার মাহবুব হোসেন জবাবে বলেছিলেন, ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৫৭ ধারায় যাবজ্জীবন দণ্ডের অর্থ হলো সর্বোচ্চ ৩০ বছর কারাদণ্ড। কারাগারে রেয়াত পেলে দণ্ড আরো কমে আসে; কিন্তু আমৃত্যু সাজা হলে রেয়াত খাটবে না। তিনি বলেন, যদি কারাদণ্ড আমৃত্যুই হয়ে থাকে, তাহলে তাদের রেয়াতের কী হবে? এ রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে রিভিউ আবেদন করেন আতাউর।


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum