১২ ডিসেম্বর ২০১৯

মুরসির মৃত্যুর তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে

আন্তর্জাতিক আদালতে মিসরের বিচারের উদ্যোগ নেবো : এরদোগান
-

গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মিসরের প্রথম প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির আদালতের কাঠগড়ায় মৃত্যুকে স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছে না বিশ্বের মানুষ। তার মৃত্যুর পর মানবাধিকার সংস্থা ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, মুরসির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছিল তার সবই ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বেশির ভাগ মানুষের ধারণা, তাকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে, যা অনেকেই ‘গুপ্তহত্যার’ সাথে তুলনা করছেন। তারা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে মিসরের সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান বলেছেন, মুরসির হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। আন্তর্জাতিক আদালতে মিসরের বিচারের জন্য যা যা করা দরকার তার সবই আমরা করব। খবর আলজাজিরা ও এএফপির।
গত সোমবার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গত ছয় বছর ধরে ‘দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’ করার ভিত্তিহীন অভিযোগে মুরসির বিচার চলছিল। আদালতের কাঠগড়ায় তার মৃত্যুর সাথে সাথে সারা বিশ্বে মিসর সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এমনকি মিসরে যারা মুরসি ও তার দল মুসলিম ব্রাদারহুডকে পছন্দ করতেন না তারাও তার এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না। তারাও সহমর্মিতা প্রকাশ করছেন। মৃত্যুর পরদিন মঙ্গলবার সকালে মিসরের সরকার দলীয় পত্রিকাগুলোতে মুরসি যে দেশটির একজন প্রেসিডেন্ট ছিলেন সে বিষয়টি উল্লেখ না করেই খবর ছাপে। দেশটির টিভি চ্যানেলগুলোতে বেশির ভাগ সময় বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আল সিসির সফরের খবর প্রচার করা হয়েছে।
কায়রোর এক ব্যবসায়ী বলেন, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটা খুবই দুঃখজনক যে, একটা দেশের প্রধান যিনি ২০১৩ সাল থেকে ক্ষমতাচ্যুত, তাকে গত মঙ্গলবার গোপনে দাফন করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ ব্যবসায়ী বলেন, মুরসির বয়স হয়েছিল (৬৭) এবং তিনি অসুস্থ ছিলেন। আদালতে শুনানিকালে হঠাৎ অচেতন হয়ে মৃত্যু হয় তার। কিন্তু আদালতে যারা তার বিচার করছিলেন, তারা ভালো মানুষ ছিলেন না।
জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার পরিষদ বলেছে, পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবার অভাব, আইনজীবীর অধিকার ও পরিবার-পরিজনদের সাথে দেখা করার অধিকার খর্ব করাসহ মুরসির বন্দিত্ব নিয়ে শুরু থেকেই উদ্বেগ ছিল। তাকে বরাবরই নির্জন কারাগারে রাখা হয়েছে। স্বাধীন তদন্ত কমিটির মাধ্যমে এর তদন্ত করতে হবে।
খ্যাতনামা মানবাধিকার আইনজীবী খালিদ আলি বলেছেন, মুরসিকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে তার চিকিৎসায় অবহেলা ও ২৪ ঘণ্টাই নির্জন কারাগারে ফেলে রাখাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আটকের পর থেকে কারাগারে তাকে যে অবস্থায় রাখা হয় তাতেই শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু হয়েছে। এটা মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং অবশ্যই শাস্তিযোগ্য।
কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ বলেছেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট ড. মোহাম্মদ মুরসির হঠাৎ মৃত্যুর খবর আমাদের কাছে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। আরব নেটওয়ার্ক ফর হিউম্যান রাইটস বলেছে, মুরসি সিসির ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের একমাত্র শিকার নন। কিন্তু এখানেই যেন ক্ষান্ত হন সিসি। মিসরের রাজনীতিক আয়মান নুর বলেছেন, গত ছয় বছর ধরে যাবতীয় অন্যায়, অবিচার ও নিপীড়ন সহ্য করে অবশেষে শহীদ হয়েছেন মুরসি। তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে ও ধীরে ধীরে হত্যা করা হয়েছে। এর জন্য সিসি ও তার স্বৈরশাসনই দায়ী। ব্রাদারহুডের সিনিয়র নেতা এ এম আর দারাজ বলেছেন, মোহাম্মদ মুরসিকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে। সিসি সেই খুনি। এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও স্বাধীন বিচার করতে হবে।
জর্ডানের ইসলাম অ্যাকশন ফ্রন্ট পার্টির নেতা মুরাদ আদায়লাহ বলেছেন, সরকারের হাতে শহীদ হয়েছেন মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট মুরসি। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, বন্দীদের নির্জন কারাগারে বন্দী রাখা ও অব্যাহত নিপীড়ন চালানোর পুরনো রেকর্ড রয়েছে মিসরের সরকারের। নোবেলজয়ী তাওয়াক্কুল কারমান বলেছেন, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মুক্তির মহান সাধক মুরসির মৃত্যুতে আমার নিজের ও পৃথিবীর সব স্বাধীন মানুষের পক্ষে শোক জানাচ্ছি।
মিসরকে বিচারের আওতায় আনার উদোগ নেবো : এরদোগান
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান বলেছেন, মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেননি, তাকে হত্যা করা হয়েছে। মিসরীয় কর্তৃপক্ষ তাকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই মিসরের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে যা যা দরকার তা আমরা করব। মুরসির মৃত্যুর বিষয়টি ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করা হবে।
এরদোগান বলেন, মোহাম্মদ মুরসির হত্যার বিষয়টি জাতিসঙ্ঘকে দেখতে হবে এবং হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। গত বৃহস্পতিবার ইস্তাম্বুলে সংবাদ সম্মেলনে এরদোগান আরো বলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে মুরসির মৃত্যুর ঘটনাটির প্রতি আলোকপাত করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। আমি বিশ্বাস করি মুরসির সন্দেহজনক হত্যা জাতিসঙ্ঘ এজেন্ডা হিসেবে উত্থাপন করবে এবং তার হত্যাকারীদের শাস্তির আওতায় আনবে।


আরো সংবাদ




hacklink Paykwik Paykasa
Paykwik