১৮ আগস্ট ২০১৯

মানুষের জীবন নিয়ে খেলা যাবে না

দুধ-দইয়ে রাসায়নিক সংক্রান্ত শুনানিতে হাইকোর্ট
-

নিম্নমানের দুধ ও দই প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এবং জড়িত ব্যক্তিদের নামের তালিকা চেয়ে আদালত বলেছেন, মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দেয়া হবে না, মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক অণুজীবসহ দুধ-দই উৎপাদনকারীদের শাস্তি হতে হবে। সাধারণ মানুষকেও এ বিষয়ে জানিয়ে সচেতন করতে হবে। রিপোর্টের বিষয় ওয়েবসাইটেও দিতে হবে।
বিচারপতি মো: নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের হাইকোর্ট গতকাল বুধবার বেঞ্চ দুধ ও দইয়ে রাসায়নিক পাওয়া সংক্রান্ত শুনানিতে এসব কথা বলেন। একই সঙ্গে আদালত বাজারের সব ধরনের তরল দুধ ও দই পরীক্ষা করে আগামী এক মাসের মধ্যে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও বিএসটিআইকে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
এ সময় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে না পারায় বিএসটিআইর প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে আদালত বলেছেন, মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিয়ে খেলা যাবে না। আদালত বলেনে, কোন কোন কোম্পানির দুধ ক্ষতিকর তা জানতে চায় মানুষ। নিরাপদ খাদ্যের বিষয়ে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। সে যেই হোক তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। নিরাপদ খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য ঠিক না হলে জাতি গঠন হবে কিভাবে?
আদালত জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির (এনএফএসএল) গবেষণায় গাভীর দুধে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক ও নানা ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের উপাদান পাওয়া সংক্রান্ত প্রতিবেদনসহ প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক ডা: শাহনীলা ফেরদৌসকে আগামী ২১ মে সকাল সাড়ে ১০টায় সশরীরে আদালতে উপস্থিত হয়ে এ বিষয়ে তার রিপোর্টটি জমা দিতে আদেশ দেন। আর নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও বিএসটিআইকে ক্ষতিকারক দুধ ও দই প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের নামসহ তাদের গৃহীত কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত প্রতিবেদন আগামী ২৩ জুন আদালতে দাখিল করতে আদেশ দিয়েছেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক। দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মুহম্মদ ফরিদুল ইসলাম। বিএসটিআইর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সরকার এম আর হাসান। এ বিষয়ে আমিন উদ্দিন মানিক বলেন, গত ১১ ফেব্রুয়ারি এক আদেশে এনএফএসএলের কারিগরি ব্যবস্থাপক অধ্যাপক ডা: শাহনীলা ফেরদৌসকে ওই প্রতিবেদন ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি এখনো এ প্রতিবেদন আদালতে জমা দেননি। এ কারণে আগামী ২১ মে ওই প্রতিবেদনসহ হাইকোর্টে হাজির থাকতে বলা হয়েছে।
ফরিদুল ইসলাম বলেন, গত সপ্তাহে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন দিয়েছি। আমরা তাতে বলেছি, এক মাসের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেবো। এটা বিশাল একটি কাজ। বিভিন্ন রিপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে হবে। মিটিং করে তা স্বাস্থ্যের জন্য কতটুকু ক্ষতিকর ও নি¤œমানের তা নিরূপণ করে প্রতিবেদন দিতে হবে। আমরা ডা: শাহনীলার প্রতিবেদন সংগ্রহ করব। এর আগে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের করা ১৬ সদস্যের কমিটিতে তিনিও একজন সদস্য।
গত ১০ ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকে ‘গাভীর দুধ ও দইয়ে অ্যান্টিবায়োটিক, কীটনাশক, সিসা!' শীর্ষক প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গাভীর দুধে (প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়া) সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক ও নানা ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের উপাদান পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে বিভিন্ন অণুজীবও। একই সঙ্গে প্যাকেটজাত গাভীর দুধেও অ্যান্টিবায়োটিক ও সিসা পাওয়া গেছে মাত্রাতিরিক্ত। বাদ পড়েনি দইও। দুগ্ধজাত এ পণ্যেও মিলেছে সিসা। সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির (এনএফএসএল) গবেষণায় এসব ফলাফল উঠে এসেছে। সংস্থাটি জাতিসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আর্থিক সহায়তায় গাভীর খাবার, দুধ, দই ও প্যাকেটজাত দুধ নিয়ে জরিপের কাজ করেছে।
গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলে জানানো হয়, ৬৯-১০০ শতাংশ গো-খাদ্যে বিভিন্ন রকমের রাসায়নিক- কীটনাশক (৯টি নমুনায়), সিসা (২২টি নমুনায়), ক্রোমিয়াম (১৬টি নমুনায়), টেট্রাসাইক্লিন (২২টি নমুনায়), এনরোফ্লোক্সাসিন (২৬টি নমুনায়), সিপ্রোসিন (৩০টি নমুনায়) এবং আফলাটক্সিন (১৯টি নমুনায়) গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি পাওয়া যায়। গরুর দুধের ৯৬টি নমুনার মধ্যে ৯ শতাংশ দুধে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কীটনাশক, ১৩ শতাংশে টেট্রাসাইক্লিন, ১৫ শতাংশে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রায় সিসা পাওয়া যায়। ৯৬ শতাংশ দুধে মেলে বিভিন্ন অণুজীব। প্যাকেটজাত দুধের ৩১টি নমুনায় ৩০ শতাংশে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি হারে পাওয়া গেছে টেট্রাসাইক্লিন। একটি নমুনায় সিসা মিলেছে। একই সঙ্গে ৬৬ থেকে ৮০ শতাংশ দুধের নমুনায় বিভিন্ন অণুজীব পাওয়া গেছে।
দইয়ের ৩৩টি নমুনা পরীক্ষা করে একটিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি সিসা পাওয়া গেছে। আর ৫১ শতাংশ নমুনায় মিলেছে বিভিন্ন অণুজীব।
ওই প্রতিবেদন নজরে আসার পর ১১ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুলসহ আদেশ দেন।
আদেশে গাভীর দুধ (প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়া) ও বাজারের প্যাকেটজাত দুধ, দই এবং গো-খাদ্যের নমুনা সংগ্রহ করে তাতে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কী পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া, কীটনাশক, অ্যান্টিবায়োটিক, সিসা ও রাসায়নিক রয়েছে তা নিরূপণে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।


আরো সংবাদ

bedava internet