১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

অপ্রতিরোধ্য ডেঙ্গুতে প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছে অর্ধশতাধিক

-

ডেঙ্গু জীবাণুবাহী এডিস মশা বেশ অপ্রতিরোধ্য। সরকারি- বেসরকারি হাসপাতালসহ রাজধানীতে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারেও আসছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী। স্বাস্থ্য অধিদফতর গত ২৪ ঘণ্টায় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ৫৮ জন রোগী আক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে। জানুয়ারি থেকে গতকাল বুধবার (১২ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত দৈনিক গড়ে আক্রান্ত হয়েছেন ১৭.৪৪ জন। চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম দিন থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত এই জ¦রে আক্রান্ত হয়েছেন তিন হাজার ৯২৪ জন এবং মারা গেছেন ১১ জন।
এ তথ্য শুধু সেসব হাসপাতালের যেখান থেকে দৈনিক স্বাস্থ্য অধিদফতরকে ডেঙ্গু রোগীর তথ্য দেয়া হয়। এর বাইরে চিকিৎসকদের চেম্বারে প্রচুর রোগী আসেন যারা হাসপাতালে ভর্তি হন না; কিন্তু সুস্থ হয়ে যান। ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা করেন এমন ডাক্তাররা জানিয়েছেন, ইদানীং ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী তারা বেশি পাচ্ছেন। একজন চিকিৎসক জানিয়েছেন, গত কয়েক দিন ধরে তারা পাঁচ থেকে ছয়জন ডেঙ্গুর রোগী পাচ্ছেন। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা একেবারে কম থাকে। মে থেকে বৃষ্টিপাত বেড়ে গেলে হঠাৎ করেই আক্রান্তের হার বাড়ে। এ সময়টায় বেশ বৃষ্টিপাত হয়। জুন মাসে নতুন করে মওসুমি বৃষ্টিপাত হয় কিছুটা বিরতি দিয়ে। এডিস মশা বৃষ্টির বিরতির সময়ই সবচেয়ে বেশি বেড়ে থাকে।
চিকিৎসক, এপিডেমিওলজিস্ট ও রাজধানীবাসী মনে করছেন, সিটি করপোরেশন থেকে মশক নিধনের ব্যবস্থা না থাকা, থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়া, রাজধানীর ঘরে ঘরে শোভা বর্ধনের জন্য গাছ ও ফুলের টবের পানি এবং এসি থেকে বের হওয়া পানিতে জন্মাচ্ছে এডিস মশা। রাজধানীবাসী বিষয়টা নিয়ে সচেতন হলে এডিস মশা বৃদ্ধির প্রকোপ হ্রাস পাবে এবং আক্রান্তের সংখ্যাও কমে যাবে।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, বলতে গেলে রাজধানীর প্রায় প্রতিটি ঘরেই এডিস মশার বাস। নিজের অজান্তেই এডিস মশার বাসপোযোগী পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে অনেক বাসাবাড়িতে। কাজে লাগছে না সরকারিপর্যায় থেকে প্রচারিত জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি। ফলে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
জানুয়ারির পয়লা দিন থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত রাজধানীসহ সারা দেশে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন এক হাজার ৩৫ জন, মারা গেছেন আট জন। জুলাই মাসেই চারজন মারা গেছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের ১২ দিন পর্যন্ত মারা গেছেন তিনজন। সাধারণত শক সিন্ড্রোম হয়ে গেলেই মারা যান। আবার নাক, চোখ, দাঁত থেকে রক্ত বের হয়ে (হেমোরেজিক) হয়ে গেলেও রোগী মারা যান। স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসের শেষ সাত দিনে বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্ব¦রে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৪২ জন।
গত ২৫ জুন থেকে ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) রাজধানীর বাসাবাড়িতে কী পরিমাণ মশার লার্ভা জন্মায় তা জানার জন্য একটি সমীক্ষা চালায়। ডিএসসিসির লোকেরা ধানমন্ডি, কলাবাগান, সেগুনবাগিচা ও মিন্টো রোডের মন্ত্রিপাড়ায় ৪৫ শতাংশ বাড়িতে ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস মশার উপস্থিতি পেয়েছেন। এর বাইরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অবশিষ্ট এলাকায় এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে ৮ শতাংশ বাড়িতে। ডিএসসিসি তার এলাকার ১৯ হাজার ৫৪২টি বাড়িতে এডিস মশার উপস্থিতি আছে কি না সেই অনুসন্ধান চালায়।
ঢাকা সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের স্পষ্ট করে জানায়, অভিজাত এলাকার ঘরেই এডিস মশা জন্ম নিচ্ছে। পানি আটকে থাকে, ঘরের এমন স্থানে মশা বেড়ে ওঠার আবাসস্থলটি তিন-চার দিন পরপর পরিষ্কার করতে না পারলে এ মশা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না বলে জানান তারা। এডিস মশা বাড়ির ভেতরে ফুলের টবে, এসি ও ফ্রিজের তলায় ও আশপাশের পানিপূর্ণ পরিত্যক্ত পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসায় জমাকৃত পানিতে ডিম ছাড়ে। এ মশা সাধারণত দিনের বেলায় সূর্যোদয়ের পর এবং সূর্যাস্তের আগে কামড়ায়।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী গত জুলাই মাসে দৈনিক ১৫ থেকে ২৬ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর বাইরে চিকিৎসকের প্রাইভেট চেম্বারে কত জন ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়েছেন এর কোনো পরিসংখ্যান নেই। শিশু চিকিৎসক ডা: হামিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, তার চেম্বারেই ১০ থেকে ১২টি শিশুকে গত দুই মাসে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। তবে কাউকেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়নি, অল্প চিকিৎসাতেই সুস্থ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, অভিজাত পাড়ার মানুষের কথা বলতে পারব না। তবে সাধারণ ঘরে মানুষের মধ্যে অনেক সচেতনতা এসেছে। তারা চলে আসছেন চিকিৎসকের কাছে সময় মতোই।
উল্লেখ্য, ২০০২ সালে দেশের মানুষ সর্বোচ্চসংখ্যক অর্থাৎ ছয় হাজার ২০০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। ডেঙ্গু জ্বরে বেশি মৃত্যু হয় ২০০০ সালে। তবে ২০১৬ সালে ছয় হাজার ৬০ জন আক্রান্ত হলেও চিকিৎসার সহজলভ্যতা, মানুষের মধ্যে সচেতনতার কারণে মৃতের সংখ্যা ছিল ১৪। ২০১৭ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন দুই হাজার ৭৬৯ এবং মারা যান আটজন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান জানিয়েছেন, ডেঙ্গু জ্বর হলে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত ১০৪-১০৫ ডিগ্রি (ফারেনহাইট) পর্যন্ত উঠতে পারে। সাথে মাথাব্যথা, মাংসপেশি, চোখের পেছনে ও হাড়ে প্রচণ্ড ব্যথা, ত্বকে লালচে ছোপ (র‌্যাশ) দেখা দেবে। এ সময় রোগীকে প্রচুর তরল খাবার খাওয়াতে হবে এবং মশারির ভেতরে বিশ্রামে রাখতে হবে। জ্বরে শুধু প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে। কোনো অবস্থাতেই এসপিরিন (এনএসএআইডি) জাতীয় ওষুধ দেয়া যাবে না। হেমোরেজিক ডেঙ্গু জ্বর ও ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হলে দাঁতের মাড়ি, নাক, মুখ ও পায়খানার রাস্তা দিয়ে রক্তপাত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিলম্ব না করে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।

 


আরো সংবাদ




Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme