১৭ নভেম্বর ২০১৮
বিজেপি সম্পাদকের ঘোষণা

ভারতে নাগরিকত্ব হারাদের বাংলাদেশে তাড়ানো হবে

রাম মাধব -

ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ঘোষণা দিয়েছে, সে দেশের আসাম রাজ্যে চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা বা ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস (এনআরসি) থেকে যাদের নাম বাদ পড়েছে তাদের বাংলাদেশে তাড়ানো (ডিপোর্ট) হবে।
বিজেপির অন্যতম প্রভাবশালী সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব গত সোমবার সন্ধ্যায় দিল্লিতে এনআরসি বিষয়ক এক সেমিনারে তাদের এই নীতির কথা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন। এ দিকে আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেছেন, ভারত সরকার বন্ধুপ্রতিম বাংলাদেশ সরকারের সাথে বিষয়টি ঠিকই ‘কূটনৈতিক দক্ষতায় ম্যানেজ করে নিতে পারবে।’ বিবিসি বাংলা, আইএএনএস, পিটিআই।
গণমাধ্যমগুলোর খবরে উল্লেখ করা হয়, রাম মাধব বলেছেন, এখানে আমাদের পরিকল্পনা হলো তিনটি ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট। অর্থাৎ প্রথম ধাপে অবৈধ বিদেশীদের শনাক্ত করা (ডিটেক্ট) যা এখন চলছে। এরপরের ধাপে ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দেয়া এবং বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু করা (ডিলিট) আর শেষ বা তৃতীয় ধাপে আমরা তাদের বাংলাদেশে তাড়িয়ে (ডিপোর্ট) দেবো।
এর আগে বিজেপির শীর্ষস্তরের কোনো নেতা এই ভাষায় এনআরসি থেকে বাদপড়া লোকজনকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার কথা বলেননি। রাম মাধব বিদেশীদের তাড়ানোর কথা বলার সাথে সাথে মুখ্যমন্ত্রী সোনোওয়ালসহ সেমিনারে উপস্থিত বিজেপির শীর্ষ নেতারা টেবিল চাপড়ে সেই মন্তব্যকে স্বাগত জানান।
সেমিনারে আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেন, অবৈধ বিদেশীদের খুঁজতে আসামের পর এবার সারা ভারতেই এনআরসি প্রক্রিয়া চালু করা উচিত। প্রকৃতপক্ষে রাম মাধব ‘অবৈধ বিদেশী’দের যেভাবে বাংলাদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করেছেন, তাতে পরিষ্কার বিষয়টি নিয়ে বিজেপির মধ্যে ইতোমধ্যেই অনেক আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, অনেকে হয়তো প্রশ্ন তুলবেন, বাংলাদেশ আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ, সেখানে কিভাবে আপনি এই লোকগুলোকে ডিপোর্ট করবেন। বন্ধু তো আপনাদের সবাই- তাই বলে কি তাদের যেসব লোকজন অবৈধভাবে এখানে আছেন তাদের কি ফেরত পাঠানো যাবে না? বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের দিকে তাকান। বাংলাদেশ নিজেরাই তো লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে সে দেশের সাথে সক্রিয় আলোচনা চালাচ্ছে। সৌদি আরবও সে দেশে থাকা অবৈধ পাকিস্তানি, বাংলাদেশী বা ভারতীয়দের মাঝে মধ্যেই ফেরত পাঠায়। কাজেই ডিপোর্ট করার মধ্যে অন্যায় কিছু নেই। এ সময় সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেন, ভারত সরকার বন্ধুপ্রতিম বাংলাদেশ সরকারের সাথে বিষয়টি ঠিকই ‘কূটনৈতিক দক্ষতায়’ ম্যানেজ করে নিতে পারবে।
রাম মাধব বিজেপির নিছক একজন সাধারণ সম্পাদক নন, তিনি দলের কাশ্মির থেকে শুরু করে উত্তর-পূর্ব ভারতের নীতিও দেখাশুনা করেন। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএসের সাথে বিজেপির প্রধান সমন্বয়কও তিনি। বিজেপির পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও দলের বাংলাদেশ বিষয়ক নীতি ও কার্যক্রম পরিচালিত হয় রাম মাধবের নির্দেশে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বা এইচ টি ইমাম, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদসহ যারাই দিল্লি সফর করেন, তারা রাম মাধবের সাথে দেখা করবেন এমনটি ধরেই নেয়া হয়।
দিল্লিতে রাম মাধব ‘ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন’ নামে যে থিংকট্যাংকের সাথে যুক্ত, বাংলাদেশের বিভিন্ন দরের নেতা-মন্ত্রী-নীতিনির্ধারকেরাও সেখানে নিয়মিত বিভিন্ন আলোচনাসভা বা সেমিনারে যোগ দেন। এই কারণেই রাম মাধব এনআরসি থেকে বাদপড়া লোকজনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর কথা বললে সেটার গুরুত্বও বেড়ে যায়। তবে এ মন্তব্য যে তার ব্যক্তিগত নয়, বরং বিজেপির ‘সুচিন্তিত মতামত’, সেটাও তিনি সোমবার সভার পর একান্ত আলোচনায় উল্লেখ করেন।
এ দিকে এনআরসি থেকে যারা বাদ পড়বেন, তাদের বাংলাদেশে ডিপোর্ট করাটা ভারত সরকারের নীতি কি নাÑ দিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্টতই এ প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যাচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবিশ কুমার এ বিষয়ে বিবিসির এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমরা এনআরসি প্রক্রিয়া নিয়ে বাংলাদেশের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করছি। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে পরিচালিত এই প্রক্রিয়া যে এখনো শেষ হয়নি এবং খসড়া তালিকায় যাদের নাম বাদ পড়েছে তারা নিজেদের ভারতীয় নাগরিক প্রমাণের সুযোগ পাবেন বলেও বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে। এই মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি কিছু আমাদের বলার নেই।’ তার কথা থেকে এটা পরিষ্কার যে, বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব বাংলাদেশে ডিপোর্ট করার কথা পরিষ্কার করে বললেও ভারত সরকার এখনই এ বিষয়ে মুখ খুলতে চাইছে না।
ভারতে গত জুলাই মাসের শেষে আসামের জাতীয় নাগরিক তালিকার (এনআরসি) দ্বিতীয় খসড়া প্রকাশিত হয়েছে, তা থেকে রাজ্যের প্রায় ৪০ লাখ বাসিন্দার নাম বাদ পড়েছে।
কিন্তু এসব প্রক্রিয়া শেষেও আসামের কয়েক লাখ লোক অবৈধ বিদেশী হিসেবেই চিহ্নিত হতে পারেন।
তবে বাংলাদেশ সরকার অনেক আগেই ভারতকে জানিয়ে দিয়েছে, তারা ভারতের এসব নাগরিককে নিজেদের বলে মনে করে না, আর তাই তাদের ফিরিয়ে নেয়ারও কোনো প্রশ্ন ওঠে না।

 


আরো সংবাদ