১৯ নভেম্বর ২০১৮
‘জাতীয় নির্বাচনকে প্রভাবিত করাই উদ্দেশ্য’

ভোটের আগে উপজেলায় উন্নয়ন প্রকল্পের হিড়িক

-

ভোটারদের আকৃষ্ট করতে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সরকার নির্বাচনমুখী বিভিন্ন ধরনের বড় অঙ্কের উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দিচ্ছে। গত প্রায় এক বছরে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পসহ শিক্ষা ও ধর্মীয় খাতে বেশ বড় অর্থের অনেক প্রকল্প অনুমোদন এবং বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এসব প্রকল্প স্থানীয় সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় ১০টি করে বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুল অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রতিটি উপজেলায় একটি করে মডেল মসজিদ কমপ্লেক্সের পর এবার ছয়টি করে বেসরকারি মাদরাসার অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ পাচ্ছেন স্থানীয় প্রত্যেক সংসদ সদস্য। স্থানীয় এমপিদের কাছ থেকে মাদরাসার তালিকা নিয়ে দুই হাজার মাদরাসার নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানান পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ নির্বাহী কমিটির (একনেক) চেয়ারপারসন শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গতকাল মঙ্গলবার একনেক সভায় সারা দেশে দুই হাজার মাদরাসার অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনসহ ১৮টি প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এই ১৮ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৭৮৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১৩ হাজার ৮১৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ৪২ কোটি ৬২ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে পাওয়া যাবে তিন হাজার ৯৩০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মন্ত্রণালয় থেকে এমপিদের কাছে মাদরাসার নামের তালিকা চাওয়া হয়। সেই তালিকা অনুযায়ী প্রত্যেক এমপির জন্য ছয়টি করে ৩০০ জন এমপির জন্য এক হাজার ৮০০টি মাদরাসা নির্বাচিত করা হয়েছে। এ ছাড়া বিশেষ বিবেচনায় আরো ২০০টি মাদরাসাকে তালিকায় রাখা হয়েছে। এই প্রকল্পে ব্যয় হবে পাঁচ হাজার ৯১৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এ দিকে ২০১৬ সালের জরিপে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ৯ হাজার ৩১১টি বিভিন্ন ধরনের মাদরাসা রয়েছে। যার মধ্যে মাত্র তিনটি সরকারি। বাকি ৯ হাজার ৩০৮টি বেসরকারি ব্যবস্থায় পরিচালিত। অন্য দিকে চার হাজার ৫৫৯টি মাদরাসায় ২/৩ শ্রেণী কক্ষসহ একতলা ভবন রয়েছে। বাকি চার হাজার ৭৫২টি মাদরাসায় এখনো কোনো অবকাঠামো উন্নয়ন করা সম্ভব হয়নি। এমনকি এখনো Í ৯৭৮টির অবকাঠামো সম্পূর্ণ কাঁচা প্রকৃতির। মাত্র দুই হাজার ১৪৭টি মাদরাসায় সম্পূর্ণ পাকা ভবন নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছে। তাই সারা দেশে নির্বাচিত এক হাজার ৬৮১টি মাদরাসার অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ বছরই কাজ শুরু হয়ে আগামী ২০২১ সালের জুনে শেষ হবে বলে জানানো হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যে বলা হয়েছে, সমতল এলাকার এ শ্রেণীর গ্রাম ও শহর এক হাজার ২৩৪টি মাদরাসা ভবন নির্মাণ করা হবে। চারতলা ভিত বিশিষ্ট চার তলা ভবন। ‘বি’ শ্রেণীর মাদরাসার ভবন ঊর্ধ্বমূখী করা হবে ৯৭টির। এসব দ্বিতলা থেকে ৪ তলা পর্যন্ত করা হবে। ‘সি’ শ্রেণীর ৫০টি মাদরাসার ভবন ৬ তলা ভিতের ওপর ছয় তলা ভবন। পাহাড়ি এলাকায় ‘ডি’ শ্রেণীর ২০টি মাদরাসায় চার তলা ভিতের ওপর চারতলা ভবন করা হবে। উপকূলীয় এলাকায় ‘ই’ শ্রেণীর এক শ’ টি মাদরাসার চার তলা ভিতের ওপর চার তলা ভবন হবে। হাওড়, বিল বা নদী এলাকায় ‘এফ’ শ্রেণীর ৮০টি মাদরাসার চার তলা ভিতের ছয় তলা ভবন। লবণাক্ত এলাকায় ‘জি’ শ্রেণীর ১০০টি মাদরাসার ৪ তলা ভিতের ওপর চার তলা ভবন নির্মাণ করা হবে এই প্রকল্পের মাধ্যমে। এ ছাড়া মাদরাসাগুলোর জন্য ছয় লাখ ১২ হাজার ৯৬টি ইউনিট আসবাবপত্র কেনা হবে।
এ দিকে গত প্রায় এক বছরে বেশ কয়েকটি নির্বাচনমুখী প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। সর্বজনীন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, সংস্কার ও সম্প্রসারণ নামে প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। সংসদ সদস্যদের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতেই স্থানীয় সরকার বিভাগের মাধ্যমে এই প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ২৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের কোনো প্রকল্প হলে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। কিন্তু জনপ্রতিনিধিদের চাহিদা ও সুপারিশের কারণে ৬৬৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটির জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি বলে পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। দেশের বিভিন্ন উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) মসজিদ, ঈদগাহ, কবরস্থান, মন্দির, শ্মশান, প্যাগোডা, গির্জা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। সংসদ সদস্যদের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিটি উপজেলায় এ জন্য এক কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হবে। অন্য দিকে শিক্ষা খাতে সারা দেশে মোট তিন হাজার বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে। প্রত্যেক সংসদীয় আসনে ১০টি করে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নে মোট ১০ হাজার ৬৪০ কোটি পাঁচ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয় গত জানুয়ারিতে। প্রতি স্কুল অবকাঠামো খাতে পাবে গড়ে তিন কোটি টাকা এবং সম্পদ সংগ্রহ ও ক্রয়ে ৩৭ লাখ টাকা।
একনেকে অনুমোদন পাওয়া অন্য প্রকল্পগুলো হচ্ছে চার হাজার ৮১৯ কোটি ৭০ লাখ টাকার রুরাল ট্রান্সপোর্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট-২, পটুয়াখালী জেলার লোহালিয়া নদীর ওপর নির্মাণাধীন পিসি গার্ডার ব্রিজের অসমাপ্ত নির্র্মাণ কাজ সমাপ্তকরণ প্রকল্পে ব্যয় হবে ১০২ কোটি টাকা, ফরিদপুর জেলার আড়িয়াল খাঁ নদী তীর সংরক্ষণ ও ড্রেজিং প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ২৯১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম ও চাঁদপুর কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হবে ৬৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প, চট্টগ্রাম জোনের খরচ ধরা হয়েছে এক হাজার ৪২১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৫১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হবে ৪৮০ কোটি ৬০ লাখ টাকা, সাভারস্থ পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তিন মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন গবেষণা রি-অ্যাক্টর ফ্যাসিলিটির সেফটি সিস্টেমের সমন্বয় সাধন, আধুনিকীকরণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও বর্ধিতকরণ প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৭৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা, জামালপুর জেলার আটটি পৌরসভার ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৬১২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা, রাজশাহী ওয়াসার ভূ-উপরিস্থিত পানি শোধনাগারের জন্য জমি অধিগ্রহণ প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৭৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, পুরনো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ইতিহাস, ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণ ও পারিপাশির্^ক উন্নয়ন প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৬০৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, ১৯৭১-সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গণহত্যায় ব্যবহৃত বধ্যভূমিসমূহ সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় হবে ৪৪২ কোটি ৪০ লাখ টাকা, পাঁচুরিয়া-ফরিদপুর-ভাঙ্গা রেলপথ পুনর্বাসন ও নির্মাণ প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৩৪৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা, জামালপুর-ধানুয়া-কামালপুর-রৌমারী-দাঁতভাঙ্গা জেলা মহাসড়ক প্রশস্তকরণ ও মজবুতিকরণ প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৩৩২ কোটি ১০ লাখ টাকা, বাংলাদেশের ১৩টি নদীবন্দরে প্রথম শ্রেণীর আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৮০ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং বরিশাল বিভাগ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৯২০ কোটি টাকা।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খানের মতে, জাতীয় নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এ ধরনের প্রকল্প নেয়ার উদ্দেশ্যই হচ্ছে নির্বাচনকে প্রভাবিত করা। এতে জনগণ ও জাতির কোনো লাভ হবে না। ক্ষমতাসীনরা নিজেদের উন্নয়নে এসব করছে।
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে, নির্বাচনের আগে এসব প্রকল্প নেয়ার অর্থই আগামী জাতীয় নির্বাচনকে প্রভাবিত করা। অনেক দিন ধরেই তো সরকার ক্ষমতায়। আগে তারা এসব কেন নিলো না? নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এসব প্রকল্প নেয়া মানে অর্থের অপচয়। নির্বাচনী ডামাডোলে এসবের তেমন কোনো খোঁজ না থাকাই স্বাভাবিক। কতটুকু কাজ হলো তার খোঁজ নেয়ারও কেউ থাকবে না। এসব সত্যি অনাকাক্সিক্ষত ও অপ্রত্যাশিত বলে তিনি মনে করেন।


আরো সংবাদ