১৪ নভেম্বর ২০১৮

আইনমন্ত্রীর বক্তব্য আইনজীবীদের জন্য অপমানজনক : সুপ্রিম কোর্ট বার

-

খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা আইন জানেন না আইনমন্ত্রীর এমন বক্তব্য বাংলাদেশের আইনজীবীদের জন্য অপমানজনক, অসৌজন্যমূলক ও দুঃখজনক উল্লেখ করে তার এ বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট (বার) আইনজীবী সমিতি। গতকাল সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, আইনমন্ত্রী একজন আইনজীবী, তিনি একজন মন্ত্রী এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তি। কাজেই তার কাছ থেকে দেশের মানুষ তথা আইনজীবীরা এরকম বক্তব্য আশা করে না। আমরা মনে করি তার এই বক্তব্য বাংলাদেশের আইনজীবীদের জন্য অপমানজনক। অতীতে এ ধরনের বক্তব্য প্রদান করে অনেকেই সদস্যপদ হারিয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ না করে কারাগারে আদালত স্থাপনে আইনের লঙ্ঘন হয়েছে বলে দাবি করছেন বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে গত ৯ সেপ্টেম্বর তিনি বলেন, আমি মনে করি যে, ওনারা (খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা) যদি এ রকম কথা বলে থাকেন তাহলে আমি বলবো, ওনারা আইন জানেন না।
আইনমন্ত্রীর এ বক্তব্যের প্রতিবাদে আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে গতকাল সুপ্রিম কোর্ট বার অডিটোরিয়ামে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, সহসভাপতি গোলাম মোস্তফা, গোলাম রহমান ভূঁইয়া, কোষাধ্যক্ষ নাসরিন আক্তার, সিনিয়র সহসম্পাদক কাজী মো: জয়নুল আবেদীন, সদস্য মাহফুজ বিন ইউসুফ, ব্যারিস্টার শফিউল আলম মাহবুব, আহসান উল্লাহ মেহেদী হাসান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে জয়নুল আবেদীন বলেন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন অতীতে দেশের আইনের শাসন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও বিচারব্যবস্থা সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখে আসছে এবং ভবিষ্যতেও রাখবে। আপনারা জানেন, কয়েক দিন আগে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রাতের অন্ধকারে বেআইনিভাবে এক গেজেটের মাধ্যমে কারাগারের কক্ষে একটি আদালত স্থাপন করা হয়, যা সংবিধানের আর্টিক্যাল ৩৫(৩) এবং ফৌজদারি কার্যবিধির আইনের ৩৫২ ধারার পরিপন্থী।
তিনি বলেন, ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার সিদ্ধান্ত মোতাবেক দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের কথা উল্লেখ আছে। তা ছাড়াও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও প্রধান বিচারপতি সংবিধানের অভিভাবক। তাই আমরা মনে করেছি এই গেজেট নোটিফিকেশনটি সুপ্রিম কোর্ট রুলসের রুল ১৯(বি)(এ), ১৯৭৩ এবং সংবিধানের আর্টিক্যাল ১১৬ অনুযায়ী করা হয় নাই। আমরা প্রধান বিচারপতির নিকট আইনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে একটি আবেদন করেছি এবং তিনি আবেদনটি আইন মোতাবেক নিষ্পত্তি করবেন বলে আমাদের জানিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, আমাদের প্রধান বিচারপতির নিকট দেয়া আবেদনে আমরা আইনের কোন কোন দিক উল্লেখ করেছি তা একমাত্র প্রধান বিচারপতির বিবেচনার জন্য দিয়েছি। আমাদের সাথে এই সময় সিনিয়র অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সিরকার, খন্দকার মাহবুব হোসেন, এ জে মোহাম্মদ আলীসহ বেশ কয়েকজন নাম করা আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। যারা উপস্থিত ছিলেন প্রত্যেকেই এই বারের প্রতিষ্ঠিত এবং বাংলাদেশের বরেণ্য আইনজীবী। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় আইনমন্ত্রীর উক্তি বেগম খালেদার আইনজীবীরা আইন জানেন না অত্যন্ত দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক।
সরকার সমর্থক আইনজীবীদের পাল্টা সংবাদ সম্মেলন : আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বক্তব্য প্রত্যাহার চেয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির দাবির পর পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেছেন, আইনমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে তারা ঝড় তোলার চেষ্টা করছেন। গতকাল সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির অডিটোরিয়ামে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান এ কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা আইন জানেন না আইনমন্ত্রী এমন বক্তব্য কোন প্রেক্ষাপটে দিয়েছেন, তা আমাদের জানতে হবে। সেটা আপনারাও জানেন। এখানে আইনমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা আইন জানেন না এ বক্তব্য দ্বারা তিনি এটা বুঝাতেন চাননি। তিনি এটা বাই দি বাই বলেছেন।
তিনি বলেন, আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকেই আদালত স্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, কার্যবিধির ৯(২) ধারায় বলা হয়েছেÑ সরকার সরকারি গেজেটে সাধারণ অথবা বিশেষ আদেশ জারি করিয়া নির্দেশ দিতে পারেন যে, যে কোনো স্থানে বা স্থানসমূহে দায়রা আদালত বসিবে। এই রূপ আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত দায়রা আদালত পূর্বের ন্যায় বসিবে। কাজেই কোন অবস্থাতেই বলা যাবে না যে, এটা আইনের মধ্যে নাই।
কারাগারে আদালত বেআইনিভাব বসানো হয়েছে তারা যে অভিযোগ করছেন এ বিষয়ে আপনাদের বক্তব্য কী জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের আইন সম্পাদক বার কাউন্সিলে সদস্য শ ম রেজাউল করিম বলেন, বাস্তবিক হলো এটা কারাগার নয়। এটা পুরনো কারাগার। এখানে কেউ থাকেন না। এটি পরিত্যক্ত কারাগার। যার একটি অংশে বেগম খালেদা জিয়াকে রাখা হয়েছে। কারণটা হলো তার নিরাপত্তার বিষয়টা বিবেচনা করে রাখা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার অবস্থা বিবেচনা করে বিশাল কারাগারের একটি অংশে তাকে রাখা হয়েছে। ফলে এ কথা বলা যাবে না যে কারাগারের ভেতরেই নতুন করে আদালত স্থাপন করা হয়েছে। দ্বিতীয় হচ্ছে তাদের সংবাদ সম্মেলনের আইনমন্ত্রীর বক্তব্য যদি উদ্বেগের কারণ হয় তাহলে বিএনপির আইনজীবী হিসেবে তারা তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারতেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ব্যানার ব্যবহার করা নিতান্তই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
সংবাদ সম্মেলনে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সহ-সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক সহ-সম্পাদক এ কে এম রবিউল হাসান সুমন ও ব্যারিস্টার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।


আরো সংবাদ