১৩ নভেম্বর ২০১৮

লেগুনা বন্ধে চরম দুর্ভোগে যাত্রীরা

যাত্রীবহনে পিকআপ ভ্যান; বিকল্প পরিবহনের দাবি পথচারীদের; বেকার চালকদের নানা অপরাধে জড়ানোর আশঙ্কা
-

পুরান ঢাকার বংশালের একটি শোরুমে কাজ করেন শাখাওয়াত হোসেন। শ্যামপুরে তার বাসা। শ্যামপুর থেকে প্রতিদিন বংশালে যাতায়াত করতেন লেগুনায়। কিন্তু ছয় দিন ধরে তার কর্মস্থলে যেতে হচ্ছে রিকশায় অথবা হেঁটে। সকালে রিকশা চেপে গন্তব্যে যেতে পারলেও রাতে বাসায় ফেরার পথে তাকে পড়তে হয় চরম দুর্ভোগে। রিকশা পাওয়া যায় না। যদিও বা পাওয়া যায় রিকশাচালক ভাড়া হাঁকান দুই থেকে তিন গুণ।
মতিঝিলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রহমত। বাস করেন জুরাইনে। রাতে কাজ শেষ করে বাসায় ফেরার পথে কোনো যানবাহন না পেয়ে হেঁটে যান দয়াগঞ্জ মোড় পর্যন্ত। এরপর দেখেন পিকআপ ভ্যানে জুরাইনের যাত্রী নেয়া হচ্ছে। তবে ঘরে ফেরা লোকের ভিড়ে ওই পিকআপে ঠাঁই হয়নি তার। কিছুক্ষণ পরে আর একটি পিকআপ এলে দ্রুত উঠে পড়েন তিনি। কিন্তু সেখানেও রক্ষা নেই। ভাড়া দ্বিগুণ। ঘটনাটি গত রোববার রাতের। শুধু শাখাওয়াত আর রহমতই নন, বিকল্প ব্যবস্থা না করে হঠাৎ লেগুনা বন্ধ করে দেয়ায় চরম দুর্ভোগ ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন যাত্রী সাধারণ।
গতকাল সকালে রাজধানীর জুরাইন, যাত্রাবাড়ী, দয়াগঞ্জ এলাকায় লেগুনা না থাকায় মোড়ে মোড়ে যাত্রীদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। এক দিকে লেগুনা বন্ধ, অন্য দিকে নগরীতে যাত্রীবাহী বাস কম চলায় বাসে উঠতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে যাত্রীদের। বিশেষ করে অফিস যাওয়ার সময় বাসে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছে। তুলনামূলকভাবে যাত্রী সংখ্যার চেয়ে বাস কম হওয়ায় দীর্ঘ অপেক্ষার পর কোনো বাস এলেও তাতে ওঠার জন্য ধস্তাধস্তি করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় যুবকেরা গায়ের শক্তি খাটিয়ে কোনো মতে ওঠতে পারলেও বয়স্ক এবং নারীরা তা পারছেন না। যাত্রী বেশি থাকায় সিটিং সার্ভিস নামে চলা বাসগুলোও দাঁড় করিয়ে যাত্রী বহন করে চলেছে।
গত ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া রাজধানী থেকে সব ধরনের লেগুনা বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, সড়কে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার কারণ এই লেগুনা। তাই এখন থেকে আর কোনো লেগুনা চলবে না। এত দিন যেসব লেগুনা চলেছে, তাদের কোনো রুট পারমিট নেই। সব অবৈধভাবে চলছে।
তিনি অবশ্য বলেন, শহরের উপকণ্ঠে লেগুনা চলতে পারবে। সেখানে লেগুনা চললে কোনো বাধা দেয়া হবে না। যেমন, বসিলা ও ৩০০ ফিট এলাকার ওদিকে চলতে পারবে। এরপর থেকেই নগরী প্রায় লেগুনাশূন্য হয়ে পড়ে। গতকাল সকাল থেকে ঢাকার অল্পকিছু রুট ছাড়া বেশির ভাগ রুটের লেগুনা স্ট্যান্ডে গিয়ে কোনো লেগুনা দেখা যায়নি। এর ফলে ওইসব সড়কে ভীষণ দুর্ভোগ পোহাতে হয় যাত্রীদের। সড়কগুলোতে বিকল্প কোনো যান না থাকায় এ দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। নিরুপায় সাধারণ মানুষকে কাভার্ড ভ্যান, ভ্যান ও রিকশায় চলাচল করতে দেখা গেছে। সুযোগ পেয়ে এসব যান চালকেরাও ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করেছেন।
কয়েকদিন ধরে দেখা গেছে, ঢাকা নিউমার্কেট থেকে পুরান ঢাকার বিভিন্ন গন্তব্যÑ নিউ মার্কেট থেকে ফার্মগেট, মোহাম্মদপুর থেকে মিরপুর, মোহাম্মদপুর থেকে মহাখালী, মিরপুর থেকে মহাখালী, গুলিস্তান থেকে মুগদা, বাসাবো ও খিলগাঁও, রামপুরা থেকে গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী থেকে ডেমরা, যাত্রাবাড়ী থেকে চিটাগাং রোড-সাইনবোর্ডের সড়কে লেগুনা চলাচল বন্ধ রয়েছে। অনুমোদনহীন বলে লেগুনা বন্ধ করে দিলেও পণ্য পরিবহনের পিকআপ ভ্যানে যাত্রী বহনে বাধা দিচ্ছে না পুলিশ, যদিও এতে ভাড়া, ভোগান্তি এবং ঝুঁকি সবই বেড়েছে। দয়াগঞ্জ থেকে জুরাইনে লেগুনায় ভাড়া ছিল ৮ টাকা। অথচ এখন পিকআপে ভাড়া নেয়া হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকা। ভ্যান গাড়িতে জনপ্রতি নেয়া হচ্ছে ২০ টাকা। জুরাইন থেকে যাত্রাবাড়ী পিকআপে নেয়া হচ্ছে ১৫ টাকা অথচ লেগুনায় ভাড়া ছিল ৫ টাকা। আর রিকশাচালকেরা ভাড়া চাচ্ছে তাদের ইচ্ছেমতো।
এ ছাড়া লেগুনা তুলে দেয়ায় যেভাবে বিপাকে পড়েছেন পথচারীরা; তেমনি ওইসব গাড়ির মালিক ও চালকেরাও উপার্জন বন্ধ হয়ে বিপদে পড়ে গেছেন। সিদ্দিকুর রহমান নামে এক লেগুনা চালক গতকাল বলেছেন, গাড়ি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন তিনি বেকার। না খেয়ে থাকতে হচ্ছে। বিকল্প কোনো ব্যবস্থাও নেই। আর কোনো কাজও জানেন না। কি দিয়ে সংসার চলবে তা নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায়। একাধিক মালিক বলেছেন, তাদের কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে এই সেক্টরে। এই গাড়িগুলো দিয়ে এখন কি হবে সে বিষয়টিও তাদের কাছে স্পষ্ট নয়।
বিপ্লবী সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আলী রেজা এ বিষয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, রাস্তায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে যে তৎপরতা চলছে, তা পরিকল্পিতভাবে হচ্ছে না। ফলে এর লক্ষ্য অর্জন হবে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করে লেগুনা, সিএনজি অটোরিকশা তুলে দিলে আরো বিশৃঙ্খল পরিবেশের সৃষ্টি হবে। ওইসব গাড়ির চালকেরা বেকার হয়ে নানা অপরাধে জড়াবে। সমাজে অপকর্ম বাড়বে। তিনি বলেন, মূলত পুলিশের ঘুষ বাণিজ্য বন্ধ না হলে পরিবহন সেক্টরে কোনো শৃঙ্খলা আসবে না।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রহমত বলেছেন, তিনি মতিঝিল থেকে জুরাইনে যেতেন লেগুনায়। রাজধানী মার্কেটের সামনে থেকে ১০ টাকায় তিনি জুরাইনে যেতেন। ওই গাড়িগুলো হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন তিনি বিপাকে পড়েছেন। ওই রুটে তেমন কোনো বাস নেই। যে দু-একটি বাস রয়েছে, তাতে ভিড়ের কারণে উঠতে পারেন না। ফলে তাকে হেঁটে বা রিকশা করে মতিঝিল থেকে জুরাইনে যেতে হয়। লেগুনায় নিয়মিত যাতায়াতকারীদের বেশ কয়েকজন বলেছেন, বিকল্প ব্যবস্থা না করে হঠাৎ এভাবে গাড়িগুলো তুলে দেয়ার বিষয়টি তাদের কাছে অপরিপক্ব সিদ্ধান্ত মনে হয়েছে।
শাখাওয়াত হোসেন বলেন, লেগুনায় তার কর্মস্থলে যেতে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ টাকা খরচ হতো। আর এখন লেগুনা না থাকায় বংশালে তার শোরুমে যেতে আসতে প্রতিদিন ভাড়া গুনতে হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, স্বল্প বেতনে চাকরি করি। আমাদের তো আর ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা মোটরসাইকেল নেই। রিকশা-সিএনজি নিয়ে চলার ক্ষমতাও নেই। লেগুনা দিয়ে কম ভাড়ায় যাতায়াত করতাম। সেটাও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তাহলে আমরা সাধারণ মানুষ যাতায়াত করব কিভাবে। তিনি লেগুনা বন্ধ থাকলে এর বিকল্প বাহনের ব্যবস্থা করার জন্য কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
গতকাল রাজধানীর ডেমরা, চিটাগাং রোড ও যাত্রাবাড়ী লেগুনা স্ট্যান্ডে গিয়ে কোনো লেগুনা দেখা যায়নি।
স্টাফ কোয়ার্টার থেকে যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান রুটের একাধিক যাত্রী বলেন, এ রুটে বেশির ভাগই শিক্ষার্থী। যাতায়াতের বিকল্প ব্যবস্থা না করে হঠাৎ এ বাহনটি বন্ধ করায় তারা ভোগান্তিতে পড়েছেন। তাদের দাবি, দ্রুত বিকল্প কোনো পরিবহনের, যাতে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারেন নগরবাসী।
রায়েরবাগের বাসিন্দা আবদুল আজিজ বলেন, ঢাকা শহরে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত ও নি¤œমধ্যবিত্ত প্রায় ৪০ ভাগ লোকের প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম হচ্ছে লেগুনা। লেগুনা চলাচল উঠিয়ে দেয়ার আগে ভাবতে হবে কাদের সুবিধা বা অসুবিধার জন্য এই সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপে নেয়ার আগে অবশ্যই বেশির ভাগ জনগণের (বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নি¤œমধ্যবিত্তের) সুবিধা বা অসুবিধা কথা বিবেচনায় রাখতে হবে।
জানা গেছে, পরিবেশ দূষণের কারণে ২০০২ সালে তিন চাকা অটোটেম্পো ঢাকা মহানগর থেকে উচ্ছেদ করা হয় এবং বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে পরিবেশবান্ধব লেগুনা (হিউম্যান হলার) চলাচলের অনুমোদন দেয়া হয়। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত রাজধানী ঢাকায় পাঁচ হাজার ১৫৬টি হিউম্যান হলারের রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। রাজধানীতে গণপরিবহনের ২৫১টি রুটের আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি আরটিসি (রিজিওনাল ট্রান্সপোর্ট কমিটি) প্রায় ১৫৯টি রুটে এসব গাড়ি চলাচলের অনুমোদন দিয়েছে। তবে পরিবহন মালিক শ্রমিক সূত্রে জানা গেছে নগরীতে চলছে প্রায় ১০ হাজার লেগুনা। যেসব রুটে এ লেগুনা অনুমোদন দেয়া হয়েছে বর্তমানে ওই রুটগুলোকে ভিআইপি বা প্রধান রোড হিসেবে দেখছে ডিএমপি।


আরো সংবাদ

১০ বিশিষ্ট ব্যক্তিকে নির্বাচনে সম্পৃক্ত করতে চান ড. কামাল আস্থা রাখুন, হিন্দু সম্প্রদায়কে ফখরুল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আগের চেয়ে বেশি দমনমূলক : অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আ’লীগের মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য হলেন ফারুক খান ও আব্দুর রাজ্জাক সহকর্মীর আঘাতে প্লাস্টিক ফ্যাক্টরির কর্মচারী নিহত শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে : শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিক শিমুল হত্যা মামলায় মেয়র মিরুর জামিন স্থগিত শিশুশ্রম নির্মূলের ল্যমাত্রা অর্জনে দেশ যথেষ্ট পিছিয়ে নির্বাচনী তফসিল পুনর্নির্ধারণ জাপা ইতিবাচকভাবেই দেখছে : জি এম কাদের ৩২ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে খেলাফত আন্দোলন অভিভাবক ঐক্য ফোরাম চেয়ারম্যানের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি

সকল