বেটা ভার্সন

ট্রাম্প-কিম ঐতিহাসিক বৈঠক

বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতার দাবি উভয় পক্ষের
সিঙ্গাপুরে মেনটোসা দ্বীপের একটি হোটেলে ঐতিহাসিক বৈঠকের পর করমর্দন করছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন :এএফপি -

সব জল্পনা-কল্পনা আর প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে গতকাল সিঙ্গাপুরে ঐতিহাসিক বৈঠক করলেন এই মুহূর্তে বিশ্বে সব থেকে আলোচিত দুই রাষ্ট্রপ্রধান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। বৈঠক শেষে উভয় নেতা নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন। খবর বিবিসি, রয়টার্স, সিএনএন, এপি, দ্য গার্ডিয়ান ও দ্য স্ট্রেইট টাইমস।
বৈঠকে দুই নেতার মধ্যে ঘণ্টাখানেক কথা হয়। পরে তারা যখন একসাথে সাংবাদিকদের সামনে আসেন, তখন করমর্দন করেন। ট্রাম্প বললেন, ‘বৈঠক খুব ভালো হয়েছে। সব সমালোচনা, অনুমান ভুল প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের সম্পর্ক দারুণ।’ আর কিমের সরল স্বীকারোক্তি, ‘আমরা শান্তির লক্ষ্যে কাজ করব। অনেক আলোচনা হয়েছে। অনেক পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। কিন্তু আমরা সব সমস্যা কাটিয়ে এই আলোচনার টেবিলে বসেছি।’
আর উত্তর কোরিয়ার পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে যে জল্পনা চলছিল, সেই প্রসঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্পের দাবি, ‘শিগগিরই পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ শুরু করবে উত্তর কোরিয়া।’
সিঙ্গাপুরের দক্ষিণাঞ্চলের রিসর্ট-দ্বীপ সেন্টোসার ক্যাপিলা হোটেলে কঠোর নিরাপত্তায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই রাষ্ট্রপ্রধান ছাড়া হলে ঢোকার অনুমতি ছিল শুধু দুই নেতার সাথে থাকা দোভাষীর। সূত্রের খবর, প্রায় ৪০ মিনিট একান্ত বৈঠক করেন তারা। পরে সেখানে যোগ দেন দুই দেশের শীর্ষ প্রশাসনিক কর্তারাও। বৈঠকের বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে চায়নি হোয়াইট হাউজ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেশে ফেরার পরই এ বিষয় বিস্তারিত জানানো হবে বলে হোয়াইট হাউজ থেকে বলা হয়েছে। তবে বৈঠক শেষে ট্রাম্প ও কিম দুইজনই বলেছেন, ‘একটা বড় সমস্যার সমাধান হলো।’
কূটনৈতিক মহলের মত, কিম বা ট্রাম্প তাদের দুইজনকেই বোঝা দায়! বৈঠক পরবর্তী সময়ে শেষ পর্যন্ত দুইজনই শান্তির পথে থাকবেন কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। কিম পরমাণু নিরস্ত্রীকরণে কতটা গুরুত্ব দেবেন? তার দেশে মজুদ পরমাণু অস্ত্র ধ্বংস করতে রাজি হবেন কি না? অন্য দিকে উত্তর-দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তে যে প্রায় সাড়ে ৫৮ হাজার মার্কিন সেনা মজুদ রয়েছে, তা সরিয়ে নিতে রাজি থাকবেন কি ট্রাম্প? এ সব বিষয়ে এখনো সন্দেহ রয়েছে কূটনৈতিক মহলের।
তবে স্বস্তির বিষয় এই যে, দুই দেশের নেতাদের মধ্যে এই প্রথম এ ধরনের বৈঠক হলো। বৈঠকটি শুর হয় গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ৯টায়। বৈঠকের শুরুতে তারা করমর্দন করেন যা আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সরাসরি সম্প্রচার করে। বৈঠক শেষে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কিম জং উন গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেন।
এক সাংবাদিকের তথ্য মতে কিম জং উন বলেছেন, বিশ্বের অনেকেই মনে করতে পারেন যে, এটি ছিল সায়েন্স ফিকশন মুভির কোনো কোনো অলিক ঘটনা। হোয়াইট হাউজ সূত্র জানিয়েছে, পরমাণু বিষয়ক আলোচনা ধারণার চেয়েও দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে।
বিবিসি জানিয়েছে, বৈঠকের শুরুতে কিম বলেন, ‘আপনার সাথে দেখা হয়ে খুশি হলাম মিস্টার প্রেসিডেন্ট।’ উত্তরে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি সত্যি গর্ব অনুভব করছি। আমরা মহৎ একটি আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছি এবং তা সফল হবে বলে আশা করছি। আমার ধারণা এটি সত্যিই সফল হতে যাচ্ছে এবং আমাদের মধ্যে সম্পর্ক গভীর হবে, এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।’
কিম আরো বলেন, ‘ওয়েল, এ পর্যন্ত আসাটা সহজ ছিল না। অতীতে আমাদের পথে অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল; কিন্তু আমরা সেগুলো সব অতিক্রম করে আজ এখানে এসেছি।’ বৈঠকে যোগ দেয়ার আগে লিমুজিন থেকে নামার সময় উভয় নেতাকেই বেশ সিরিয়াস মনে হয়েছে বলে জানিয়েছেন রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শী এক সাংবাদিক।
যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর : সিঙ্গাপুরে ঐতিহাসিক বৈঠক শেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও উত্তর কোরিয়ার নেতা একটি যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছেন। বিবিসি জানিয়েছে, এই যৌথ ঘোষণা সম্পর্কে ট্রাম্প বলেছেন, এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যাপক। তিনি ও ‘চেয়ারম্যান কিম’ এটি স্বাক্ষর করে দুইজনেই খুব সম্মানিত বোধ করছেন।
অন্য দিকে কিম বলেছেন, আমরা একটি ঐতিহাসিক বৈঠকে মিলিত হয়েছি এবং অতীতকে পেছনে ফেলে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বৈঠক হওয়ার জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন কিম।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী যৌথ ঘোষণার প্রধান তিনটি পয়েন্ট হচ্ছে, শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য দুই দেশের জনগণের আকাক্সক্ষানুযায়ী ইউএসএ-ডিপিআরকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।
কোরীয় উপদ্বীপে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী শান্তির শাসন প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্র ও ডিপিআরকে তাদের উদ্যোগ যুক্ত করবে। চলতি বছরের ২৭ এপ্রিলের পানমুনজোম ঘোষণা নিশ্চিত করে কোরীয় উপদ্বীপকে পুরোপুরি পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করতে ডিপিআরকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।
যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করার পর ট্রাম্প বলেছেন, আজকে যা হলো তার জন্য আমরা অত্যন্ত গর্বিত। আমরা দুইজনেই চাই কিছু করতে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে সামরিক মহড়া বন্ধ করবেন ট্রাম্প : উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের সাথে সিঙ্গাপুরের বৈঠকের পর দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে সামরিক মহড়া বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
কোরিয়া উপদ্বীপে ওই যৌথ মহড়াকে ‘খুবই উসকানিমূলক’ এবং ‘ব্যয়বহুল’ বলে বর্ণনা করেছেন তিনি।
উত্তর কোরিয়াকে চাপে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র দেশ দক্ষিণ কোরিয়া প্রতি বছরই নিয়মিত এ সামরিক মহড়া করে আসছে। এ মহড়াকে ‘যুদ্ধের উসকানি’ বলেই মনে করে উত্তর কোরিয়া।
গতকাল উত্তর কোরিয়ার নেতা কিমের সাথে বৈঠকের পর সিঙ্গাপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘ওই যুদ্ধ মহড়া (ওয়ার গেম) খুবই ব্যয়বহুল। এ মহড়া অনুষ্ঠানের জন্য বেশির ভাগ অর্থ আমরাই দিতাম। বর্তমান পরিস্থিতিতে যেহেতু আমরা আলোচনা করছি, তাই আমার মনে হয় ওই যুদ্ধ মহড়া চালিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না।’
তার এই ঘোষণাকে স্পষ্টতই বড় ধরনের ছাড় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে যৌথ সামরিক মহড়া বন্ধ করার কথা বলে ট্রাম্প আসলে ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন সে সম্পর্কে স্পষ্ট করে জানতে ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনার প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের কর্মকর্তারা।
ট্রাম্পের দীর্ঘ সংবাদ সম্মেলন : ঐতিহাসিক বৈঠকের পর এক ঘণ্টা পাঁচ মিনিটের ম্যারাথন সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সিবিএস নিউজের হোয়াইট হাউজ প্রতিনিধি মার্ক নোলার বলেছেন, ‘সময়ের হিসাবে এটি ট্রাম্পের দীর্ঘ সময়ের সংবাদ সম্মেলন। এর আগে গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্পের দীর্ঘ সংবাদ সম্মেলনের স্থায়িত্ব ছিল এক ঘণ্টা ১৭ মিনিট।
গতকালের সংবাদ সম্মেলনে বৈঠকের আয়োজক হিসেবে সিঙ্গাপুরকে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও চীনের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি। বৈঠককে নজিরবিহীন বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প বলেন, প্রকৃত পরিবর্তন যে সম্ভব তা প্রমাণিত হয়েছে। এখন আমরা একটি নতুন ইতিহাস, একটি নতুন অধ্যায় শুরু করার জন্য প্রস্তুত। আমরা একটি যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছি যাতে কোরীয় উপদ্বীপকে সম্পূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণে উত্তর কোরিয়ার দ্বিধাহীন অঙ্গীকার রয়েছে। চেয়ারম্যান কিম আমাকে বলেছেন, উত্তর কোরিয়া এরই মধ্যে প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার একটি স্থাপনা ধ্বংস করতে শুরু করেছে। আমরা এমন একটি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি যেখানে সব কোরীয় ঐক্যবদ্ধভাবে বসবাস করবেন। যেখানে যুদ্ধের অন্ধকারকে দূর করবে শান্তির আলো। এটিই হবে যৌক্তিক এবং এটি আমাদের নাগালের কাছে। মানুষ মনে করেছিল, এটি কখনই হবে না। তবে উত্তর কোরিয়ার ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে বলে জানান তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি তিনি কমাবেন না; তবে সামরিক মহড়া বন্ধ করবেন। শিগগিরই কোরীয় যুদ্ধের অবসান ঘটবে।
বৈঠকের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে জানতে চাইলে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, আমরা এই চুক্তি নিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে কাজ করছি। বিস্তারিত জানার জন্য আগামী সপ্তাহে (জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা) জন বোল্টনের সাথে আমরা বসব। আমি আবারো আনন্দের সাথে এই দেশে আসব। তোমাদের প্রধানমন্ত্রী চমৎকার মানুষ। তিনি খুবই অতিথিপরায়ণ।’
বৈঠকে কিমের সাথে মানবাধিকার নিয়েও কথা হয়েছে বলে জানান ট্রাম্প। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এ বিষয়টি নিয়ে আরো বিশদ আলোচনা হবে। কোরীয় যুদ্ধে আটকে পড়াদের ফেরত পাওয়ার আকুতি জানিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার অসংখ্য মানুষের কল, চিঠি ও টুইট আমার কাছে আসে। তারা তাদের ছেলেমেয়ে, বাবা-মাকে ফেরত চান। আমি এটি নিয়ে কথা বলেছি। শিগগিরই ৬০০০ বন্দীকে ফেরত পাঠানো হবে।


আরো সংবাদ