১৫ নভেম্বর ২০১৮

ফ্রান্স দ্বিতীয়, নাকি ক্রোয়েশিয়া প্রথম

বিশ্বকাপ
ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়ার জয়োৎসব - সংগৃহীত

চার বছরের প্রতীক্ষার অবসান হচ্ছে আজ। আগামী চার বছরের জন্য নতুন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নকে পাচ্ছে ফুটবল দুনিয়া। আজ রাতেই এর ফয়সালা। কোন দেশ হচ্ছে ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের শিরোপাজয়ী, ফ্রান্স নাকি ক্রোয়েশিয়া। বিশ্বফুটবলে জার্মানির শ্রেষ্ঠত্বের আনুষ্ঠানিক অবসান হয়েছে ২৭ জুন দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে তাদের হারের মাধ্যমে। যা তাদের ছিটকে ফেলে দেয় ২১তম বিশ্বকাপ থেকে। এখনও ফিফা র‌্যাঙ্কিং এ সেরা জার্মানি। কিন্তু আজকের ফাইনাল শেষে তারা আর এই অবস্থানে নাও থাকতে পারে। নতুন হিসেবে অবস্থানের ব্যাপক উন্নতি ঘটবে ক্রোয়েশিয়া এবং ফ্রান্সের। পেছনের কাতারে চলে যেতে পারে জার্মানরা। আজ মস্কোর লুজনিকি স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় রাত ৯টায় রাশিয়া ৬৪তম ম্যাচ।

এই ফাইনাল শেষে ফ্রান্সের অধিনায়ক হুগো লরিচ বা ক্রোয়েট দলপতি লুকা মডরিচের হাতে উঠবে বিশ্বের সবচেয়ে দামী ফুটবল ট্রফি। ফরাসিরা লুজনিকিতে খেলা শেষে বিজয় উৎসবে মাতলে তা হবে তাদের দ্বিতীয়। অন্যদিকে নতুন ইতিহাস গড়তে পারলে ক্রোয়েশিয়ার হবে প্রথম বিশ্ব জয়।

এই পর্যন্ত একবারই বিশ্বকাপ জয় করেছিল ফ্রান্স। তা ১৯৯৮ সালে নিজ মাঠে। সেই মিশনে তারা সেমিফাইনালে পেরিয়েছিল ক্রোয়েশিয়া বাধা। লিলিয়ান থুরামের জোড়া গোলে তারা ২-১ এ হারিয়েছিল ক্রোয়েশিয়াকে। যদিও ডেভর সুকার প্রথমে লিড এনে দিয়েছিলেন অতিথি দলকে। আজ বলকান অঞ্চলের দেশটির একটি জয়েই দুই লক্ষ্য পূরন হবে। ২০ বছর আগে হারের প্রতিশোধ এবং এরচেয়ে বড় প্রাপ্তি বিশ্বকাপ জয়। নতুন ইতিহাস গড়া কি সম্ভব হবে জালাতকো ডেলিচের দলের।

বিশ্ব ফুটবলে দারুণ সময় পার করছে ফ্রান্স। ২০ বছরে তিনবার তারা বিশ্বকাপের ফাইনালে। গত কুড়ি বছরে এই রেকর্ড নেই অন্য সাবেক চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, পশ্চিম জার্মানি, স্পেন এবং ইতালির। ফরাসিরা ১৯৯৮, ২০০৬ এবং ২০১৮ বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট। ব্রাজিল ১৯৯৮ এবং ২০০২ এর বিশ্বকাপের ফাইনালে প্রতিনিধিত্ব করেছিল। জার্মানি ২০০২ এবং ২০১৪ এর শেষ দুই এর দল। ইতালি ২০০৬ এর বিশ্বকাপ জয়ী। স্পেন ২০১০ এর চ্যাম্পিয়ন।

সুতরাং এই পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে আজ ফ্রান্সই ফেবারিট। বিশ্বকাপের বাইরে ইউরোতেও তারা মোটামুটি সফল। ২০০০ এর চ্যাম্পিয়ন দলটি ২০১৬ এর সর্বশেষ ইউরোর রানার্সআপ। গত ১৮ বছরে তারা দুইবারের ফাইনালিস্ট। যদিও সমসংখ্যকবার তাদের বিদায় হয়েছিল কোর্য়াটার থেকে। একবার গ্রুপ পর্বই টপকাতে পারেনি। অবশ্য ফরাসিদের সবাই প্রথম থেকেই এবার ফেবারিটের তালিকায় রেখেছিল।

সে ধারা তারা অব্যহত রাখে এবার রাশিয়ায় একের পর এক ম্যাচ জিতে। গ্রুপে তারা ২-১ এ অস্ট্রেলিয়াকে. ১-০তে পেরুকে হারায়। শেষ ম্যাচে তাদের গোলশূন্য ড্র ডেনমার্কের সাথে। দ্বিতীয় রাউন্ডে ৪-৩ গোলে আর্জেন্টিনাকে কোর্য়াটার ফাইনালে ২-০তে উরুগুয়েকে এবং সেমিতে ১-০তে বেলজিয়ামকে হারিয়ে ইতিহাসে তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠে।

অন্যদিকে একেবারেই দৃশ্যের আড়ালে ছিল ক্রোয়েশিয়া। এমনকি গ্রুপে আর্জেন্টিনাকে ৩-০তে হারানোর পরও কারো কল্পনাতে ছিলনা তারা যে ফাইনাল পর্যন্ত চলে আসবে। গ্রুপের অপর দুই দল নাইজেরিয়াকে ২-০ এবং আইসল্যান্ডকে ২-১ এ হারায় তারা। এরপর নকআউটের তিন ম্যাচেই তাদের ১২০ মিনিটের ম্যাচ। দ্বিতীয় রাউন্ডে পিছিয়ে পড়েও তারা ১২০ মিনিটে ১-১ এ ড্র করে ডেনমার্কের সাথে। শেষ পর্যন্ত জিতেছে টাইব্রেকারে ৩-২ এ।

কোর্য়াটার ফাইনালে স্বাগতিক রাশিয়াকে টাইব্রেকারে ৪-৩ এ হারায় ক্রোয়েটরা। এই ম্যাচে ১২০ মিনিট শেষ হয়েছিল ২-২এ। সেমিতে তারা ইংল্যান্ড বাধা পেরিয়েছে ২-১ এ জিতে। ১-১ এ ৯০ মিনিট সমাপ্ত হওয়ার পর ১২০ মিনিটে ২-১এ জয়। বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়া দুই বারই নক আউট পর্বে পৌঁছাতে পেরেছিল। প্রতিবারই তারা শেষ চার পর্যন্ত এসেছিল। ১৯৯৮ তে সেমিতে বিদায়। এবার উঠেছে ফাইনালে।

ক্রোয়েশিয়ার তুলনায় ফ্রান্স একটি জায়গায় এগিয়ে। তা হলো ফরাসিরা কোনো ম্যাচই ৯০ মিনিটের বেশি খেলেনি। তাদের জালে বল গেছে চারবার। দিয়েছে ১০ গোল। ক্রোয়েশিয়া নক আউটের টানা তিন ম্যাচ ১২০ মিনিট খেলে দুটিতে জয় টাইব্রেকারে। আগের ৬ ম্যাচে দিয়েছে ১২ গোল। হজম করেছে চার গোল। গোল দেয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে সাবেক যুগোশ্লাভিয়ার দেশটি।

 

আরো পড়ুন : এমবাপ্পে চ্যালেঞ্জে প্রস্তুত ক্রোয়েট

বিশ্বকাপের ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার সাফল্যে দৃঢ় আশাবাদী জালাটকো ডালিচ। তার মতে, রাশান টুর্নামেন্টের ক্রোয়েটদের শ্রেষ্ঠ ফুটবল এখনো অবশিষ্ট রয়েছে। আর্জেন্টাইন সুপারস্টার লিওনেল মেসিকে অকার্যকর রাখতে সক্ষম ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণভাগ এমবাপে ও গ্রিজম্যানের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পুরোপুরিই প্রস্তুত বলে জানান ডালিচ। ফাইনালে ফরাসিদের হারিয়ে ক্রোয়েটদের উৎসবের সামর্থ রয়েছে বলেও তিনি সাফ জানিয়ে দেন। ফিফার ২১তম বিশ্বকাপের শিরোপা লড়াইয়ের জন্য ক্রোয়েশিয়ার প্রস্তুতির অনুশীলন সেশনে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ের এক ফাঁকে এ সব কথা বলেন ডালিচ।

আজ ২০১৮ সালের বিশ্বকাপের স্বপ্নের ফাইনালের ডার্কহর্স হিসেবেই ক্রোয়েশিয়া মাঠে নামবে ফ্রান্সের মোকাবেলায়। ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচে ক্রোয়েটদের সাফল্যে নির্ভার ডালিচ। তিনি বলেন,‘ ক্রোয়েশিয়ার আরো ভালো নৈপুন্য প্রদর্শনের সক্ষমতা রয়েছে। আমি জানি ফ্রান্স অত্যন্ত শক্তিশালী দল। কিন্তু আমরা মেসিকে রুখতে পেরেছি। তাহলে এমবাপে ও গ্রিজম্যানকে কেন নয়?

ফরাসি আক্রমণভাগের হুমকি মোকাবেলায় ক্রোয়েট রক্ষণভাগ পুরোপুরিই প্রস্তুত।’ গত বুধবার রাশান বিশ্বকাপের অতিরিক্ত টাইমের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাসের প্রথম ফাইনালে প্রতিনিধিত্ব করার কৃতিত্ব গড়েছে ক্রোয়েশিয়া। পুরো টুর্নামেন্টেজুড়ে আন্ডারডগ দলটির স্বপ্নযাত্রার সমাপ্তিতেও উৎসবের উপস্থিতি নিশ্চিত করার ব্যাপারেও দারুণ আশাবাদী ডালিচ। যদিও মস্কোর লুজনিকি স্টেডিয়ামের ফাইনালের হট ফেবারিট হিসেবে মাঠে নামবে আটানব্বইয়ের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স।

শিরোপা লড়াইয়ের আন্ডারডগ হলেও দল হিসেবে ক্রোয়েশিয়ার পারফরম করার ওপরেই মূলত নির্ভর করছে ফিফার ২১তম বিশ্বকাপের ফাইনালের ভাগ্য। এক্ষেত্রে সুসংবাদও রয়েছে ক্রোয়েট শিবিরের জন্য। পুরোপুরি ফিট ইভান র্যাকিটিচকেই ফাইনালে পেতে চলেছে ক্রোয়েশিয়া। আকস্মিকভাবে আক্রান্ত ফ্লু’ও বাদ সাধতে পারেনি তার সেমিফাইনালের অংশগ্রহনে। শিরোপা লড়াইয়ে প্রয়োজনে এক পা নিয়ে খেলতে রাজি বলেও জানান বার্সেলোনার প্লে-মেকার র্যাকিটিচ। মাঠের ফুটবলে নিজেদের সর্বোচ্চ উজাড় করে দেয়ায় সর্বদা প্রস্তুত ক্রোয়েট ফুটবলারদের আত্মবিশ্বাসও তুঙ্গে পৌঁছেছে ফাইনালের আগে।

দেখুন:

আরো সংবাদ