২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ইংল্যান্ড বনাম বেলজিয়াম, নিয়মরক্ষা নাকি মানরক্ষার ম্যাচ?

বিশ্বকাপ
তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটিকে নিয়ম রক্ষার ম্যাচ বললেও দুই দলের জন্য কিন্তু মানরক্ষা ম্যাচও - সংগৃহীত

বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছে ইংল্যান্ড ও বেলজিয়াম। চাপা কষ্ট বুকে নিয়েই আজ মাঠে নামতে যাচ্ছে তারা। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটিকে নিয়ম রক্ষার ম্যাচ বললেও দুই দলের জন্য কিন্তু মানরক্ষা ম্যাচও। জিতলে অন্তত খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হবে না। বাংলাদেশ সময় রাত ৮টায় সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেডিয়ামে ম্যাচটি শুরু হবে।

এবারের আসরে একই গ্রুপে খেলেছিল ইংল্যান্ড ও বেলজিয়াম। গ্রুপ পর্বের লড়াইয়ে বেলজিয়ান রেড ডেভিলসরা ১-০ গোলে ইংলিশ থ্রি লায়ন্সদেরকে পরাজিত করেছিল। এবার তাই গ্যারেথ সাউথগেটের প্রতিশোধ নেয়ার এবং সম্মান নিয়ে বাড়ি ফেরার পালা।

অপরদিকে বেলজিয়ামের জন্য জয় অবশ্য বিশ্বকাপ ফুটবলে তাদের সেরা ফল নিয়েই বাড়ি ফেরার সুযোগ করে দেবে। কারণ ১৯৮৬ বিশ্বকাপে একই রকম তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে তারা ফ্রান্সের কাছে পরাজিত হয়েছিল। বেলজিয়ামের ফুটবলার টমাস মুনিয়ের তাই মনে করছেন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় দিয়ে বিশ্বকাপ ব্রোঞ্জ পদকের মাধ্যমে শেষ করাটাই এখন তাদের লক্ষ্য। সেন্ট পিটার্সবাগে তারা ফ্রান্সের কাছে পরাজিত হয় সেমিফাইনালে। মানে বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্মের জন্য রাশিয়া বিশ্বকাপও আরো একটি হতাশা বয়ে নিয়ে এসেছে। ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে পরাজয় এবং ২০১৬ ইউরোতে শেষ আটের লড়াইয়েই ওয়েলসের কাছে পরাজিত হয়েছিল লুকাকু, হ্যাজার্ড ও ফেলাইনির বেলজিয়াম। সেই দলের ১৫ জন সদস্য রাশিয়া বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের হয়ে খেলেছে।

মুনিয়ের বলেন, ‘গ্রুপ পর্বে আমরা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় পেয়েছিলাম এবং আসন্ন ম্যাচটিতেও আমরা জয়ী হতে চাই। জয় আমাদের জন্য একেবারে নিশ্চিত নয়। অনেকেই মনে করে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ বিশ্বকাপে সময়ের অপচয়। কিন্তু আমরা এই ম্যাচটি খেলতে চাই।’

কেভিন ডি ব্রুইনা, এডেন হ্যাজার্ড এবং রোমেলো লুকাকুর মতো ফুটবলারকে নিয়ে বেলজিয়াম এবার বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলতে চেয়েছিল যারা বিশ্বের সেরা লিগ ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলে থাকে। গ্রুপ পর্ব থেকে তারা শতভাগ জয়ের রেকর্ড নিয়ে রাউন্ড অব সিক্সটিন নিশ্চিত করেছিল। শেষ ষোলতে তারা জাপানের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও ৩-২ গোলে অসাধারণ জয় নিশ্চিত করে। কোয়ার্টার ফাইনালে তারা এবারের আসরের সবচেয়ে ফেভারিট নেইমারের ব্রাজিলকে ২-১ গোলে পরাজিত করে।

রাশিয়া বিশ্বকাপে ছয়টি ম্যাচ খেলে সবচেয়ে বেশি গোল করা বেলজিয়াম সেমিফাইনালে ফ্রান্সের এমবাপে ও পগবাদের নৈপুণ্যের কাছে পরাজিত হয় ১-০ গোলে। তৃতীয় এবং চতুর্থ স্থান নির্ধারণী ম্যাচটি উভয় দেশের ব্যথা কিছুটা উপশম করতেই পারে। রবার্ট মার্টিনেজের বেলজিয়াম রাশিয়া বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে পরাজয়ের আগে ২৪টি ম্যাচে অপরাজিত ছিল এবং কোচ হিসেবে মার্টিনেজও চাইবেন না তার অধীনে বেলজিয়াম পরপর দুটি ম্যাচে পরাজিত হোক। ইংল্যান্ডের হৃদয় সেমিফাইনালে ভেঙেছিল ক্রোয়েশিয়া জালাটকো ডালিচের ক্রোয়েশিয়ার হয়ে সেদিন ইভান পেরিসিচ এবং মারিও মান্দজুকিচ গোল করেছিলেন। কিন্তু খেলার পাঁচ মিনিটে কিয়েরেন ট্রিপার গোল করে সাউথগেটের ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলের ব্যবধানে ক্রোয়েশিয়া জয়লাভ করে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নেয় এবং ইংলিশ থ্রি লায়ন্সরা ১৯৬৬ বিশ্বকাপের পর তাদের দ্বিতীয় ফাইনালে খেলার সুযোগ হারায়। ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার গ্যারি কাহিলের মতে এই খেলাটিতে অংশ নেয়া কেমন যেন অদ্ভুত।

তিনি বলেন, ‘এটি একটি অদ্ভুদ ম্যাচ। দুই দেশই তাদের সেমিফাইনালের হতাশা নিয়ে এই ম্যাচে খেলতে নামবে। আমরা আমাদের সেরাটা দিয়েছি। একটি তরুণ দল হিসেবে নিজেদেরকে নিয়ে আমি গর্বিত হতেই পারি। সামনে আরো একটি বাধা আমাদের সামনে আছে এবং সেটিকে আমরা পেরিয়ে যেতে চাই।’

এই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের ফুটবল দলে বেশ কয়েকজন প্রতিভার বিকাশ হয়েছে হ্যারি ম্যাগগুয়ের, জন স্টোনস, কিয়েরেন ট্রিপার এবং জর্ডান পিকফোর্ড। বিশেষ করে ইংলিশ জনগণ তাদের দলের পেছনে ছিল উল্লাস এবং উৎসাহ নিয়ে। তারা চেয়েছিল বিশ্বকাপ যেন জন্মভূমিতে ফেরত আসে কিন্তু তা হয়নি। যদিও বেলজিয়ামের বিপক্ষে জয় তাদেরকে কিছুটা সান্ত্বনা এনে দিতে পারবে ও গর্ব নিয়ে দেশে ফেরত যাওয়ার রসদ জোগাবে। ট্রেন্ট আলেকজান্দার আরনল্ড এবং রুবেন লফটাস চেক ও ড্যানি ওয়েলবেক এই ম্যাচে প্রথম একাদশে খেলতে পারে কিয়েরেন ট্রিপার, কাইল ওয়াকার এবং জর্ডান হেন্ডারসনের পরিবর্তে। এই দুই দেশের ২২ বারের লড়াইয়ে ইংল্যান্ড ১৫ বার জয়লাভ করেছে। বিশ্বকাপে এবারই প্রথম বেলজিয়াম ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় পেয়েছে।

 

আরো পড়ুন : ইংল্যান্ডের ফাইনাল খেলা উচিত ছিল : মরিনহো

চলতি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেয়া একবারের চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড। ক্রোয়েশিয়ার কাছে ২-১ গোলে হারের লজ্জা পায় তারা। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ম্যাচে ১-১ সমতা ছিল। এরপর অতিরিক্ত সময়ে গোল হজম করে ম্যাচ হারতে হয় ইংলিশদের। ফলে বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলার স্বপ্ন ভেঙে যায়। তবে ইংল্যান্ডের ফাইনাল খেলা উচিত ছিল বলে মনে করেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোচ হোসে মরিনহো। তিনি বলেন, ‘টুর্নামেন্টের শুরু থেকে যেভাবে খেলছে ইংল্যান্ড, এ জন্যই তাদের ফাইনাল খেলা উচিত ছিল। এভাবে ইংল্যান্ডের বাদ পড়াটা উচিত হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই এখন ইংল্যান্ডের খারাপ লাগাটা ভীষণ কঠিন। তাদের পারফরম্যান্স আমার ভালো লেগেছে।’

গ্রুপ পর্বে রানার্স-আপ হয়েই শেষ ষোলোতে ওঠে ইংল্যান্ড। শেষ ষোলোয় কলম্বিয়ার সাথে ১-১ গোলে ড্র করে টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে জয় পায় ইংলিশরা। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইডেনের বিপক্ষে ২-০ গোলে জিতে সেমিতে পা রাখে হ্যারি কেনের দল। তবে শেষ চারে এসে মুখথুবড়ে পড়ে ইংল্যান্ড। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ১২০ মিনিটের লড়াইয়ে ২-১ গোলে হার মানে ইংলিশরা। তাই ৫২ বছরের পুরনো স্মৃতি আবারো ফিরিয়ে আনতে পারল না ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপ আসরে সর্বশেষ ১৯৬৬ সালে ফাইনাল খেলেছিল ইংলিশরা। তখন শিরোপা জিতেই মাঠ ছাড়ে ইংল্যান্ড।

এবারো ৫২ বছর আগের সোনালি অতীত ফিরিয়ে আনার সুবর্ণ সুযোগ ছিল ইংল্যান্ডের; কিন্তু তারা ব্যর্থ। বেশি আত্মবিশ্বাসী হওয়াটাই কাল হলো ইংল্যান্ডের বলে মনে করেন মরিনহো। বিশ্বকাপের খেলা দেখতে রাশিয়ায় থাকা মরিনহো সেখানকার সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘শেষ আটের ম্যাচ জিতে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে ইংল্যান্ড। এত বেশি আত্মবিশ্বাসী হওয়া উচিত হয়নি তাদের। এই আত্মবিশ্বাসই কাল হলো ইংলিশদের। তারা ভেবেছিল, আগের ম্যাচগুলোর মতো সহজেই সেমিতে জিতবে। এ ছাড়া প্রথম গোল পেয়ে ফাইনাল খেলার স্বপ্ন দেখে ফেলে ইংল্যান্ড; কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল, ম্যাচের তখনও অনেক সময় বাকি।’

ভালো খেলার কারণেই সেমিফাইনালে উঠতে পারে ইংল্যান্ড। তবে এত দূর এসে ইংল্যান্ডের ফাইনাল খেলা উচিত ছিল বলে মনে করেন মরিনহো। তিনি বলেন, ‘তাদের খেলা আমার মন কেড়েছে। ইংল্যান্ডের উচিত ছিল এই দল ও এই পারফরম্যান্স নিয়ে এবার ফাইনাল খেলা। দলটি সব দিক দিয়েই ভালো ও ভারসাম্যপূর্ণ ছিল। আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্নতি করেছে দলটি। এ দলের বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই বেশ তরুণ। কিন্তু সত্যি বলতে নিজেদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করল ইংল্যান্ডকে।’

এবারই শিরোপা জয়ের সবচেয়ে ভালো সুযোগ ছিল ইংল্যান্ডের। এমনও মন্তব্য করলেন মরিনহো। তিনি বলেন, ‘এবার বেশ কিছু বড় দল শেষ চারের আগেই বাদ পড়েছে। এ ছাড়া সেমিফাইনালে ফ্রান্সের সাথে ম্যাচ পড়েনি ইংল্যান্ডের। তাই সেমির ম্যাচ জিতে যেমন ফাইনাল খেলা উচিত ছিল তাদের, ঠিক তেমনি শিরোপা জয় করাও উচিত ছিল। কারণ এবারই শিরোপা জয়ের সবচেয়ে ভালো সুযোগ ছিল তাদের সামনে।’

বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও কোচ গ্যারেথ সাউথগেটকে রেখে দেয়া উচিত বলে মনে করেন মরিনহো। তিনি বলেন, ‘আমি যদি ইংল্যান্ড ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান হতাম, তবে আমি অবশ্যই সাউথগেটকে ইংল্যান্ডের জন্য রেখে দিতাম। এই দলকে দারুণভাবে তৈরি করেছে সাউথগেট। এই দল নিয়েই ভবিষ্যতে সাউথগেট ভালো করতে পারবে বলে আমার দৃঢ়বিশ্বাস।’

দেখুন:

আরো সংবাদ