১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮

নেইমার কতটুকু দায়ী?

বিশ্বকাপ, নেইমার
নেইমার - সংগৃহীত

শেষ বাঁশি বাজার সময় শূন্য দৃষ্টিই সম্বল নেইমারের। গ্যালারির দিকে সাম্বা সমর্থকদের দিকে এক পলক তাকিয়েই মাথা নামিয়ে নিলেন। পাশ দিয়ে এক ছুটে রোমেলু লুকাকু পৌঁছালেন কেভিন ডি ব্রুইনের কাছে। কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে হয়তো বললেন, ‘ওয়েল ডান পার্টনার। তোমার গোলেই শেষ ব্রাজিলের হেক্সার স্বপ্ন।’

সত্যিই তাই। স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় তখন দুনিয়াপ্রেমী ব্রাজিল অনুরাগীরা। দু’চোখ অশ্রুসজল। নির্বাক। যাবতীয় উদ্যম ব্লটিং পেপারের মতো শুষে নিয়েছে রবার্তো মার্টিনেজের দল। পাওলিনহো-গ্যাব্রিয়েল হেসাসদের উপর যে ক্ষোভ দেখাবেন তারও যেন আর ইচ্ছে নেই। এবার দেশে ফেরার পালা। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত শরীরগুলো যেন কাজান এরিনার আসনে চুইংগামের মতো আটকে গেছে। কেউ তুলে দিলে যেন ভালো হয়।

দর্শকদের মতো একই অনুভূতি নেইমার-ফার্নান্দিনহো-রবার্তো ফারমিনোদেরও। গত ৯০ মিনিট কী যে হয়ে গেল! ভাবতেই পারছেন না তারা। ফেলিপে কুতিনহোকে সাথে নিয়ে কোনোক্রমে টানেলে ঢুকলেন নেইমার। জানেন, এবার শুরু হবে ঘরে-বাইরে তার সমালোচনা।

রাশিয়া বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার জন্য কখনোই দায় এড়াতে পারেন না ব্রাজিলের নম্বর টেন। প্লে-অ্যাক্টিংকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার নেশায় তিনি মত্ত। তাই পারফরম্যান্সে মনঃসংযোগের অভাব। বক্সের বাইরে বল পেলেই তার প্রথম চিন্তা, কীভাবে পেনাল্টি আদায় করা যায়। শুক্রবার কাজানের বেলজিয়ামের বিরুদ্ধেও ভিনসেন্ট কোম্পানিকে দু’বার একের বিরুদ্ধে এক পরিস্থিতিতে পেয়েও তিনি লক্ষ্যে সফল হতে পারেননি। বল ধরে দৌড়ানো শুরু করার পরেই তার মাথায় ঘুরছে প্লে-অ্যাক্টিংয়ের কথা।

লিওলেন মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো পেশাদারিত্বের মোড়কে নিজেকে মোড়াতে ব্যর্থ নেইমার। কোনো ক্লাবেই তিনি বেশিদিন থাকতে পারেন না। বার্সেলোনায় তিনি সব পেয়েছিলেন। অর্থ, খ্যাতি, প্রতিপত্তি-সবই। তা সত্ত্বেও সেখানে মন টিঁকল না তার। বেশি অর্থ পেলে যে কোনো ফুটবলারই ক্লাব বদল করতে পারেন। তাতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু নেইমার যেভাবে একাধিক ফুটবলারের সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে বার্সা ছেড়েছিলেন তা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু।

শুধু তাই নয়, রেকর্ড পরিমাণ বাই-আউট ক্লজ মিটিয়ে ব্রাজিলিয়ান মহাতারকাটিকে নিয়ে সমস্যা বেড়েছে পিএসজি’র। প্যারিসে পৌঁছেই ড্যানি আলভেস-থিয়াগো সিলভাদের মদত পেয়ে নেইমার বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠেন। সুগন্ধির শহরে মায়াবী রাতের হাতছানিতে প্রলোভিত হন। মাঠের ভিতরও এডিনসন কাভানির সাথে দ্বন্দ্ব বাঁধে। তারপরই বাবা তথা এজেন্টের মাধ্যমে কথা বলা শুরু করেন রিয়াল মাদ্রিদ প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের সাথে। অর্থাৎ বোঝাই যাচ্ছে, কেন নেইমার পিছিয়ে বর্তমান সময়ের দুই মহাতারকা মেসি ও রোনালদোর থেকে। ইউরোপিয়ান ফুটবলে মাত্র পাঁচটি মৌসুম খেলার পর তার বন্ধুর থেকে শত্রু সংখ্যা বেশি। শোনা যাচ্ছে, পিএসজি’র একাধিক ফুটবলারের সাথে নেইমারের সম্পর্ক এখন তলানিতে।

এবার রাশিয়ায় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখেছিল ব্রাজিলপ্রেমীরা। নেইমার এবং ফেলিপে কুতিনহোর বোঝাপড়াই ছিল তার মূলধন। কিন্তু শুক্রবার কাজান এরিনায় সব কিছু মুছে দিলো বেলজিয়াম। তাই বিশ্বসেরা দলের প্রতিনিধি হওয়ার জন্য আরো চার বছর অপেক্ষা করতে হবে নেইমারকে। ভুলে গেলে চলবে না, কাতারে আয়োজিত বিশ্বকাপের সময় তার বয়স হবে ৩০।

শেষ আট থেকে বিদায়ের পরে সমর্থকদের কতটা সহানুভূতি পাবেন নেইমার? পরিসংখ্যান অবশ্য কিছুটা হলেও তার পক্ষেই কথা বলছে। শেষ আটের আগে তিনিই ছিলেন বিপক্ষ ডিফেন্ডারদের প্রধান টার্গেট। সর্বাধিক ২৩ বার ফাউলের শিকার হওয়াই তার প্রমাণ। শুক্রবারের ম্যাচে আরো তিনবার তাকে ফাউল করা হয়েছে। তারও মধ্যে নেইমার চেষ্টা করেছেন গোল পেতে। তার একটি শট বেলজিয়াম গোলরক্ষক কোর্তোয়া রুখে না দিলে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়াতেই পারত। শুক্রবার ৪৫টি সফল পাস দিয়েছেন নেইমার, যার মধ্যে ৩৫টিই অ্যাটাকিং থার্ডে। তৈরি হয়েছে সাতটি সুযোগ। কিন্তু আসল কাজটাই তো হয়নি। তাই সমালোচনা গ্রহণের জন্য নেইমারকে তৈরি থাকতে হবে।

বিশ্বকাপের আগে প্রায় চার মাস চোটের কারণে মাঠের বাইরে ছিলেন তিনি। রাশিয়ার মাটিতে খেলতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় ছিল। তা দূর করে নেইমার মাঠে ফিরলেও স্বমহিমায় তাকে পাওয়া যায়নি। গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচে আহামরি না খেললেও স্রেফ নামের জোরে উতরে গেছেন নেইমার। তবে রাউন্ড অব সিক্সটিনে মেক্সিকোর বিপক্ষে তার দুরন্ত পারফরম্যান্সের পর আশা কয়েক গুণ বেড়েছিল। কিন্তু বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে ফের স্বপ্ন ভঙ্গ হলো। অথচ এই রাশিয়াতেই ছিল তার বিশ্বকাপ জয়ের সেরা সুযোগ। চার বছর পর কাতারে কী হবে তা এখনই বলা উচিত নয়। তবে সম্ভাবনা তো অবশ্যই কমবে।


আরো সংবাদ