২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

আর্জেন্টাইন সমর্থকদের ধন্যবাদ জানালেন আগুয়েরো

বিশ্বকাপ, আগুয়েরো
সার্জিও আগুয়েরো - সংগৃহীত

নক আউট পর্ব পার হতে পারেনি আর্জেন্টিনা। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অধরা স্বপ্ন নিয়ে বিদায় নিতে হয়েছে বিশ্বকাপ থেকে। আর এই সময়ে যারা সাথে ছিলেন তাদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন সার্জিও আগুয়েরো। ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা এই ধন্যবাদ বার্তায় সারাবিশ্বের আর্জেন্টাইন সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তবে আর্জেন্টাইন কোচ জর্জ সাম্পাওলি ও তার কোচিং স্টাফদের এই বার্তায় রাখেননি তিনি।

শনিবার ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলে পরাজিত হয়ে রাশিয়া বিশ্বকাপের শেষ ১৬’র থেকে বিদায় নিয়েছে আর্জেন্টিনা। গ্রুপ পর্বে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের গোলে বিজয়ী হয়ে কোনোরকমে নক আউট পর্ব নিশ্চিত করেছিল গতবারের রানার্স-আপরা। তার আগে দুই ম্যাচে আইসল্যান্ডের সাথে ড্র করলেও ক্রোয়েশিয়ার কাছে ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়ের শঙ্কায় ছিল মেসি, আগুয়েরোরা।

লেস ব্লুজদের বিপক্ষে আগুয়েরো মূল একাদশের বাইরে ছিলেন। কিন্তু বদলি বেঞ্চ থেকে মাঠে নেমেই একটি গোল করেন। জাতীয় দলের বিদায়ের পরে ম্যানচেস্টার সিটির এই স্ট্রাইকার তার পরিবার ও সমর্থকদের ধন্যবাদ দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি বার্তা দিয়েছেন। কিন্তু সেখানে জায়গা হয়নি সাম্পাওলি ও তার কোচিং স্টাফদের।

বার্তায় আগুয়েরো লিখেছেন, ‘প্রতিটি দিন আমাদের সহযোগিতা করার জন্য আমি আমার ছেলে, পরিবার ও বন্ধুদের ধন্যবাদ দিতে চাই। রাশিয়া এসে যারা আমাদের দারুণভাবে উজ্জীবিত করেছেন তারাও ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। আর্জেন্টিনা ছাড়াও অন্যান্য যে দেশের সমর্থকরা আমাদের দারুণভাবে সমর্থন করেছেন তাদের কথা মনে করতেই হবে। এবং সর্বোপরি আমারা সতীর্থরা, প্রতিটি ম্যাচে নিজেদের সেরাটা দেয়ার জন্য যারা জীবন দিয়ে দিয়েছে। এই দলের অংশ হিসেবে চিকিৎসক, ফিজিও, প্রপস, শেফ তাদেরকেও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমরা এই লড়াই একসাথে সবাই মিলে চালিয়ে যাব। আর্জেন্টিনা, তোমাকে ভালবাসি।’

 

আরো পড়ুন : জীবন রূপকথা নয়, অভাগা রাজপুত্র মেসি!

যোগ-বিয়োগ হিসাব করে সব সময় জীবন এগোয় নাহ। আবার জীবন রূপকথা নয়! এমন কী কাঁটাহীন ফুলে ফুলে সাজানো পথও নয়! বাস্তবতার জমিন তো আরো বন্ধুর। নিরন্তর অভাবের শিশু বয়সটা পেরিয়ে এসে কতো কিছুই না পেয়েছেন! নাম, খ্যাতি, অর্থ, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সুন্দর একটা সাজানো সংসার। কিন্তু তারপরও যেন চাঁদের কলঙ্কের মতো লেগে আছে কালো দাগ! একটা অপূর্ণতা, একটা দীর্ঘশ্বাস আজীবন হয়তো তাড়িয়ে বেড়াবে তাকে। বিশ্বকাপটা যে পাওয়া হল না!

সোনার ওই ট্রফিটা যে ৩১ বসন্ত পেরিয়ে গেলেও অসহায়ের মতো দুর থেকেই দেখতে হয়েছে প্রতিবার! ছুঁয়ে দেখা, চুমু আঁকা আর হয়নি! তাইতো শনিবার রাতে লিওনেল মেসি কেমন কেন বাকশুন্য হয়ে গেলেন! চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়বে কি, কান্নাই যে শুকিয়ে গেছে!

গত বিশ্বকাপটা দুর্দান্ত কেটেছিল। অসাধারণ সব ফুটবলের পসরা সাজিয়ে প্রায় একাই দলকে টেনে তুলেছিলেন ফাইনালে। কিন্তু একা কী আর সব হয়? ডিয়োগো ম্যারাডোনাও তো পাশে পেয়েছিলেন, ক্লাদিও ক্যানেজিয়া আর বাতিস্তুতাদের! মেসি একেবারেই অভাগা! মাঠে অনেকেই আছেন, কিন্তু তারপরও কেউ যেন নেই তার পাশে। ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে আর কিছুই করা হল না! যেখানে অতিরিক্ত সময়ে মারিও গোৎজের গোলে সর্বনাশ। একটুর জন্য ট্রফি ডিয়োগো ম্যারাডোনার অর্জন ছোঁয়া হল না। সবই হল কিন্তু সোনার পরী ছোঁয়া হলনা!

ব্রাজিল বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলার হয়েও মন মরা হয়েই বুয়েন্স আয়ার্সের বিমানে উঠছেন লিওনেল মেসি! তারপরও মনে ছিল একটা স্বপ্ন। রাশিয়াতে নিশ্চয়ই সোনার হরিণটা মুঠোবন্ধী হবে! এর মাঝে অবশ্য কোপা আমেরিকার ফাইনালে গিয়েও চিলির কাছে অতিরিক্ত সময়ে হারের যন্ত্রনায় বিদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। আরেকটা ফাইনালে ব্যর্থ, মনের দুঃখে আন্তর্জাতিক ফুটবলটাকেই গুডবাই বলে দিয়েছিলেন!

কিন্তু ২৯ বছর বয়সে এই প্রিয় লিও'র বিদায়টা ভক্তরা মেনে নিতে পারেনি কিছুতেই। অনুরোধের পর অনুরোধ! এমন কী কোচ হোর্হে সাম্পাওলির পরামর্শ। শেষ অব্দি না করতে পারলেন না তিনি। সিদ্ধান্ত বদলে ফিরলেন নীল-সাদা জার্সি। মনে হচ্ছিল বিশ্বকাপ জিতেই বুঝি বিখ্যাত সেই জার্সিটা তুলে রাখবেন।

বাছাই পর্বের বৈতরনী পার হতে রাখলেন বড় ভূমিকা। তারপর অনেক স্বপ্ন সঙ্গী করে পা রাখলেন ভ্লাদিমির লেনিনের দেশে! গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচের একটিতে হার, একটি ড্র দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল ভক্তদের। কিন্তু সেই শঙ্কার মেঘ উড়িয়ে পথ দেখালেন মেসিই। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে খেলালেন পুরো দলটাকে। দল উঠে এলো দ্বিতীয় রাউন্ডে। এবার অবশ্য প্রথম দুই ম্যাচে প্রতিপক্ষের নজর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারছিলেন না সেইভাবে। তবে সময় মতো নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ঠিকই থাকল তার অসাধারন সব পাস, হঠাৎ গতি, আর সুক্ষ চিন্তার জাল ছড়িয়ে নু ক্যম্পের সেই মেসিকেই মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন!

নকআউটে শনিবার প্রতিপক্ষ শক্তিশালী ফ্রান্স। তারুণ্যের উচ্ছল সেই দলটার বিপক্ষে অভিজ্ঞ আর্জেন্টিনা। ভাল একটা ম্যাচের প্রতিশ্রুতি তো ছিলই। কিন্তু কে জানতো রোমাঞ্চে মোড়ানো সেই ম্যাচটাতে এক রহস্য জড়িয়ে থাকবে। রক্ষণভাগের ব্যর্থতায় তিন গোল দিয়ে হজম করলেন চারটি! এভাবেই শেষ ৯০ মিনিট! এভাবেই শেষ মেসির আরো একটা বিশ্বকাপ।

জীবনে কতো কিছুই দেখলেন আর্জেন্টিনার এক অবহেলিত অঞ্চল রোজারিওতে বেড়ে উঠা এই কিশোর। হরমোনজনিত রোগ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে ১১ বছর বয়সে যে মেসি ফুটবল স্কাউটদের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছিলেন, তার জীবনে এতো চমক অপেক্ষা করছে কে জানতো। কে জানতো ন্যাপকিন পেপারে লেখা সেই চুক্তিবদ্ধ ফুটবলারটিই উঠে আসবেন এভাবে, সবাইকে ছাড়িয়ে!

ক্যারিয়ারে কী না পেয়েছেন। ৯টি লা লিগা, চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, তিনটি ফিফা ক্লাব কাপ ট্রফি! আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপে রানার্স আপ, কোপা আমেরিকার তিনবারের ফাইনালিস্ট। পাঁচবার ফিফার বর্ষসেরা ফুটবলার। অর্জনের এমন তালিকা করতে গেলে সহজে ফুরাবে না।

তারপরও ডিয়েগো ম্যারাডোনা, পেলে এমন কী জিনেদিন জিদানের পাশেও লিওনেল মেসির নামটা লেখার সুযোগ থাকছে না। ইতিহাস বড় নিষ্টুর বিশ্বকাপ না জেতা কাউকে কখনোই যে সর্বকালের সেরাদের তালিকায় নিয়ে আসতে কার্পন্য করে! সময়ের সেরা এই তারকার কোথায় জায়গা হবে কে জানে!

জর্জ বেস্ট, ইউসেবেবিও, জর্জ উইয়াহ কিংবা আলফ্রেডো ডি স্টেফানো'র মতো ফুটবলারদের সঙ্গে এক সময় আক্ষেপ নিয়ে উচ্চারিত হবে হয়তো মেসির নাম। কিন্তু এই একটা প্রজন্ম কখনোই হয়তো ভুলতে চাইবে না ক্ষুদে যাদুকরের কথা। ফুটবল নিয়ে তার কারিকুরির কথা। এমন কী বার্সেলোনার গোল মেশিন, ৩১টি ট্রফি জয়ের নায়ককে নয়, মনে থাকবে টানা চার 'বিগ' ফাইনালে হেরে যাওয়া এই অসহায়, বিধ্বস্ত, মায়াবী ফুটবলারটিকেও। নতুন প্রজন্মের কাছে পেলে-গারিঞ্চা'রা নয়, রোজারিও'র বিস্ময় বালকটিই মুগ্ধতা ছড়িয়ে বেঁচে থাকবেন, আজীবন!


আরো সংবাদ

সকল