২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

নেইমারের 'নাটক' নিয়ে দুশ্চিন্তায় মেক্সিকো

বিশ্বকাপ, নেইমার
মাঠে পড়ে আছেন নেইমার, সুইজারল্যান্ডের ভ্যালন বেহরামিকে হলুদ কার্ড দেখাচ্ছেন রেফারি - সংগৃহীত

ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার নেইমারের ব্যাপারে একটু বেশি সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছেন মেক্সিকোর অধিনায়ক আন্দ্রেস গুয়ারদাদো। তবে মাঠে তিনি দুর্দান্ত খেলেন সে বিষয়ে সতর্কতার কথা জানাননি তিনি। মেক্সিকোর অধিনায়ক বলেছেন, নেইমার একটু ধাক্কা লাগলেই মাঠে লুটিয়ে পড়ে ফাউল দাবি করার একটা প্রবণতা ইদানিং লক্ষ করা যাচ্ছে। এটা চিন্তার বিষয়। কারণ এ ব্যাপারে ফিফা ও রেফারিরাও যথেষ্ট সতর্ক। তবু আমি বলবো আসলেই ফাউল হয়েছে নাকি তিনি (নেইমার) ফাউলের ভান ধরে এটা ভিএআরের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া উচিত হবে।

মেক্সিকোর কোচ বলেন, ‘আমরা চাই সুষ্ঠু বিচার। আমরা সেটাই আশা করব রেফারিদের কাছ থেকে।’ তিনি বলেন, ‘নেইমার একটুতেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ার ভানটা বেশ চমৎকারভাবেই করতে পারেন।

রেফারিরা এতে বেশিরভাগ সময়ে বিভ্রান্তিতে পড়ে যান। যা প্রতিপক্ষের বিপক্ষে চলে যায়। যেহেতু ভিডিও দেখে থার্ড রেফারির কাছ থেকে একটা সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয় রয়েছে। যিনিই ম্যাচের রেফারি থাকবেন তিনি এ বিষয়ের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন।’

অধিনায়ক আবারো তার কথার পুনরাবৃত্তি করে বলেন, ‘এটাই হয়তো তার খেলার স্টাইল। কিন্তু এতে যেন প্রতিপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত না হন সে দিকে নজর দেয়া উচিত।’

মেক্সিকো কখনই বিশ্বকাপে জার্মানিকে ও ব্রাজিলকে হারাতে পারেনি। কিন্তু এবার মেক্সিকোর জেতার একটা সুযোগ দেখছেন দলটির অধিনায়ক। তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো বিশ্বকাপে হারাতে পারিনি ব্রাজিলকে। তবে আমরা এখানে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে এসেছি। আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছি। তা ছাড়া পেছনের পরিসংখ্যান কোনো কাজে লাগে না যদি ঠিকমতো মাঠে পারফরম্যান্সটা প্রদর্শন করা যায়। আমরা সেটাতেই বিশ্বাসী।’

মেক্সিকো গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে সুইডেনের কাছে ০-৩ গোলে হেরেছে। তবে কোরিয়ার কাছে জার্মানির পরাজয়ে তাদের দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠা নিশ্চিত হয়েছে। সুইডেনের বিপক্ষে তিনটি গোলই তারা হজম করে দ্বিতীয়ার্ধে। ৩১ বছর বয়সের এ ফুটবলার বলেন, ‘ব্রাজিলের বিরুদ্ধে জয় না পাওয়ার কোনো কারণ দেখছি না। তবে এর পূর্বশর্ত রয়েছে। আমাদের মাঠে প্লানের সবটাই বাস্তবায়ন করতে হবে। কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। এটা হলে ব্রাজিলকে হারানোর অতৃপ্তি ঘুচানো সম্ভব।’

 

আরো পড়ুন : নেইমারের অতি অভিনয় বিপদে ফেলবে ব্রাজিলকে!

পোলিশ রেফারি স্জিমন মারচিনিয়াক শনিবারের জার্মানি ও সুইডেনের উত্তেজনাকর ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজানোর পর সামাজিক মাধ্যমে মানুষের আনাগোনা দারুণভাবে বেড়ে যায়। প্রায় সবার পোস্ট, টুইট বা মন্তব্যেই টনি ক্রুসের শেষ মিনিটের ফ্রি কিকের কথা লেখা হয়। এর পাশাপাশি আরেকটি বিষয়েও পোস্ট করে মানুষ। 'নেইমারের মত কান্না' করেননি বলে প্রশংসা করা হয় ক্রুসের।

পরের দিনই ইনজুরি সময়ের গোলে জয় পাওয়ায় ম্যাচ শেষে কান্নায় ভেঙে পড়েন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড।

ব্রাজিল সমর্থকরাও সেদিন সামাজিক মাধ্যমে অসহানুভূতিশীল মন্তব্যই করেছেন। আর এ থেকেই এবারের বিশ্বকাপে নেইমারের অবস্থাটা বোঝা যায়।

এবারের বিশ্বকাপে সবাই বিশ্বের সবচেয়ে দামী খেলোয়াড়ের সমালোচনায় আগ্রহী।

গত কয়েকসপ্তাহে নেইমারকে নিয়ে তৈরি করা হাস্যরসাত্মক পোস্টগুলো ছড়িয়ে পরেছে সামাজিক মাধ্যমে।

যে বিষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা চলছে সেটি হলো, ফাউল আদায় করতে নেইমারের অতি অল্পতেই পড়ে যাওয়া ও আহত হওয়ার ভান করা।

সার্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে রিও ডি জেনিরো'র একটি পানশালায় এমনও ঘোষণা দেয়া হয় যে, 'নেইমারের প্রতিটি ডাইভের জন্য একটি করে পানীয়' দেয়া হবে বিনামূল্যে।

গত বছর দুই শ' মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থের বিনিময়ে বার্সেলোনা থেকে পিএসজিতে যোগ দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে দামী খেলোয়াড় হন নেইমার। বিলাসবহুল জীবনযাত্রার কারণে অনেকেই তাকে কিছুটা নেতিবাচকভাবে দেখেন। যদিও ব্রাজিলে আরো অনেকে মিলিয়নিয়ার ফুটবলারই আছেন।

এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাঝেমধ্যেই নেইমার তার মেজাজ হারান। কোস্টারিকার বিপক্ষে ম্যাচের পর মাঠে তার কান্নার সমালোচনার জবাবে ক্ষুদ্ধ হয়ে ইন্সটাগ্রাম পোস্টে লেখেন, "টিয়া পাখিও কথা বলতে পারে।"

কোস্টারিকার বিপক্ষে ম্যাচে রেফারির সাথে অসদাচরণের কারণে হলুদ কার্ড দেখেন নেইমার। ভিডিও অ্যাসিস্টান্ট রেফারির রিভিউর পর তার একটি পেনাল্টি আবেদন নাকচ হয়ে যায়। যেখানে নাটকীয় ব্যবহারে রেফারিকে প্ররোচণার চেষ্টার অপরাধে লাল কার্ডও দেখতে পারতেন তিনি। তবে ওই ম্যাচে গোল করে অনেক সমালোচনারই জবাব দেন তিনি।

কোস্টারিকার বিপক্ষে ওই গোলটি ছিল নেইমারের ৫৬তম আন্তর্জাতিক গোল। এর ফলে ব্রাজিলের হয়ে সর্বোচ্চ গোলস্কোরারের তালিকায় তৃতীয় স্থানে উঠে আসেন তিনি। ১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী রোমারিওকে টপকে তিনি এই স্থান দখল করেন।

এই অর্জনের পর নেইমারের প্রশংসাই করেছেন রোমারিও। ইন্সটাগ্রামে এই ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার লিখেছেন, " নেইমার তুমি যা পারো আর যা করতে সক্ষম তা এই বিশ্বকাপে এখনো দেখাতে না পারলেও আমি বিশ্বাস করি তুমি পারবে।"

১৯৭০ বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য ও ব্রাজিলের অন্যতম সম্মানিত ফুটবল বিশেষজ্ঞ টোস্টাও মনে করেন অতি অভিনয়ের কারণে নিজেকে ও দলকে বিপদে ফেলতে পারেন নেইমার।

কোস্টারিকার বিপক্ষে ম্যাচের পর টোস্টাও লেখেন, "তিনি মাঠে অভিযোগ করতেই থাকেন আর মেজাজও প্রদর্শন করেন। এরকম ক্ষেত্রে সবসময়ই কার্ড দেখার সম্ভাবনা থাকে।"

"ওর মাঠের বাইরের কাজকর্মের চেয়ে মাঠের ভেতরের আচরণ আমাকে বেশি ভয় পাওয়ায়।"

সমস্যা হলো নেইমার যাই করেন তা নিয়েই বিশ্লেষণ শুরু হয়ে যায়।

কোস্টারিকার বিপক্ষে ম্যাচের পর তার কান্না নিয়ে মনোবিশারদ থেকে শুরু করে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এক্সপার্ট, সবাই নানাবিধ আলোচনা করেছেন ব্রাজিলিয়ান গণমাধ্যমে।

এমনকি ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা ডা'সিলভা, যিনি বর্তমানে কারাবন্দী রয়েছেন, ব্রাজিলের একটি টেলিভিশনের ক্রীড়া অনুষ্ঠানে বার্তা পাঠান।

লুলা লেখেন, "নেইমারের কান্নার দৃশ্য থেকেই তার মানসিক অবস্থার প্রমাণ পাওয়া যায়।" (২৮ জুন, ২০১৮ প্রকাশিত সংবাদ)

 

আরো পড়ুন : শুধু নেইমার নন, এমন নাটক আরো অনেকেই করেছেন

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে কোস্টারিকার বিপক্ষে ২-০ গোলে জিতেছে ব্রাজিল। এই ম্যাচে জয়ের ফলে শেষ ১৬'র দৌড়ে এগিয়ে আছে তারা। তবে সবকিছু ছাপিয়ে আলোচনায় নেইমারের পড়ে যাওয়ার নাটক।

ঘটনাটি ঘটে ম্যাচের ৭৮ মিনিটে। কোস্টারিকার ডি বক্সে রক্ষণভাগের খেলোয়াড় গঞ্জালেজের সাথে কোনো সংঘর্ষ না হওয়ার পরও মাটিতে পড়ে যান নেইমার, যেন বড় ধরণের কিছু একটা হয়েছে। রেফারিও বুঝতে পারেননি যে এটি ছিল নেইমারের অভিনয় মাত্র, ফলে বাঁশিও বাজান তিনি। কিন্তু কোস্টারিকার খেলোয়াড়দের তীব্র প্রতিবাদে ভিএআরের সহায়তা নেন রেফারি। আর রিপ্লেতে দেখা গেলো রীতিমত নাটক করেই পড়ে গেছেন নেইমার। তখন বাতিল হয়ে যায় পেনাল্টির সুযোগ। এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠে নেট দুনিয়ায়।

তবে এই ঘটনা এবারই প্রথম নয়। একমাত্র নেইমারই এমন কাণ্ড করেননি, এই তালিকায় আছে আরো অনেকে। জানুন-

ঈশ্বরের হাত : এই তালিকায় প্রথমই আছেন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলার দিয়েগো ম্যারাডোনা। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে তার অসাধারণ পারফরমেন্সে শিরোপা জিতেছিল আর্জেন্টিনা। তবে কোয়াটার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দেয়া ম্যারাডোনার গোলটি ছিল বিতর্কিত। পেনাল্টি এরিয়ায় বাম হাতের ছোঁয়ায় গোল করেছিলেন ম্যারাডোনা! 'গোলটি পরবর্তী সময়ে ‘ঈশ্বরের হাতে গোল’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

সুয়ারেজের নাটক : লুইস সুয়ারেজ। গত বিশ্বকাপে কামড়ের জন্য কুখ্যাত ছিলেন তিনি। তবে তার আগের বিশ্বকাপে ভিলেন হিসেবে পরিচিত ছিলেন উরুগুয়ের এই তারকা ফুটবলার। ২০১০ সালের বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে প্রায় পৌঁছেই গিয়েছিল ঘানা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ঘানার স্ট্রাইকার আসামোয়া গিয়ানের সাথে চ্যালেঞ্জে সুয়ারেজের হাতে আঘাত পাওয়ার নাটকে পেনাল্টি পায় উরুগুয়ে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গোল করে সেমিফাইনালে পৌছে উরুগুয়ে। পরে অবশ্য সুয়ারেজকে আঘাত পাওয়া হাতে জয়োল্লাস করতে দেখা যায়।

বল লেগেছিল হাটুতে, ব্যাথা মুখে : ২০০২ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের রিভাল্ডোর কাণ্ড ধরা পড়েছিল রিপ্লেতে। তুরস্কের বিপক্ষে ম্যাচে স্ট্রাইকার হাকান উনসালকে তার কারণে লাল কার্ড দেখানো হয়। কী করেছিলেন তিনি? কিছুই না। পুরো নাটক করেছিলেন রিভাল্ডো। কর্নার কিক নিতে যাচ্ছিলেন রিভাল্ডো। বলটি কিক করে তার দিকে দিচ্ছিলেন উনসাল। তার ছোড়া বলে আঘাত পাওয়ার নাটক করেন রিভাল্ডো। মুখ চেপে পড়ে যান। সাথে সাথেই তাকে লাল কার্ড দেখান রেফারি। পরে ভিডিও রিপ্লেতে দেখা যায়, বলটি আসলে লেগেছিল রিভাল্ডোর হাঁটুতে, মুখে নয়! এই ঘটনার জন্য জরিমানার মুখে পড়তে হয় রিভাল্ডোকে।

ক্লিন্সম্যানের ডাইভ : সর্বকালের সেরা স্ট্রাইকারদের একজন পশ্চিম জার্মানির জার্গেন ক্লিন্সম্যান। ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে নাটক করেন তিনিও। আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার পেদ্রো মোনজোনের সাথে চ্যালেঞ্জে শূন্যে লাফিয়ে উঠে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়েন তিনি। তার এই নাটক এতোটাই সত্যি মনে হয়েছিল যে রেফারি সাথে সাথেই মোনজোনকে লাল কার্ড দেখিয়ে দেন। বিশ্বকাপে সেইবার প্রথম কোনো ফাইনাল ম্যাচে লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল। পরে পেনাল্টি থেকে পাওয়া একমাত্র গোলে শিরোপা জিতে পশ্চিম র্জামানি।

রোনালদোর চোখের ইশারা : ২০০৬ সালের বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ম্যাচে পর্তুগালের প্রতিপক্ষ ছিল ইংল্যান্ড। সেই ম্যাচ ৬২ মিনিট পর্যন্ত গোলশূন্য ছিল। তখন রেফারি হোরাসিয়া ইলজোন্দোকে পটানোর চেষ্টা করেছিলেন রোনালদো। কেন করেছিলেন? তিনি রেফারিকে ওয়েন রুনিকে সরিয়ে দেয়ার জন্য পটিয়েছিলেন। কারণ এই ইংলিশ স্ট্রাইকার পর্তুগালের রিকার্দো কারভোলোর সামনেই দাড়িয়ে ছিলেন। এরপর রেফারি রুনিকে সরিয়েও দিয়েছিলেন। পরে রোনালদো চোখ মেরে কোচ লুইস স্কোলারিয়াকে সেটি বুঝিয়ে দেন। ওই ম্যাচে পেনাল্টি থেকে গোল করে জয়লাভ করে পর্তুগাল। কিন্তু পরে টিভি ক্যামেরায় সে ঘটনা ধরা পড়লে সমালোচনার মুখে পড়েন রোনালদো।


আরো সংবাদ