২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

সেই প্রতিশোধ কি নিতে পারবে রাশিয়া?

বিশ্বকাপ, রাশিয়া, স্পেন,
১৯৬৪ সালের ইউরোতে নোংরামির স্বীকার হয়েছিল বর্তমান রাশিয়া বা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন - সংগৃহীত

খেলাকে যতোই রাজনীতির বাইরে রাখার স্লোগান মুখে দেয়া হোক না কেন রাজনৈতিক নোংরামি এর পেছনে লেগেই থাকে। ১৯৬৪ সালের ইউরোতে তেমনই নোংরামির স্বীকার হয়েছিল বর্তমান রাশিয়া বা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের বার্নাব্যুতে ২১ জুনের সেই জয় ছিনিয়ে নেয়ার কাহিনী এখনও ভুলতে পারেনি রাশিয়ানরা। সোভিয়েত ইউনিয়নকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইউরোপিয়ান ফুটবলের সেরা হয়েছিল স্পেন। সেই ম্যাচ যতোটা না এই্ দুই দেশের ফুটবল দলের সাথে হয়েছিল তার চেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিল দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে। একই সাথে লড়াই হয়েছিল সাম্রাজবাদ বনাম কমিউনিজমের সাথে। সোভিয়েত রাষ্ট্রপ্রধান নিকিতা ক্রসচেভকে অবশ্য হার মানতে হয় স্পেনের কাউন্টার পার্ট জেনারেল ফ্রাঙ্কোর কাছে। এই জয়ে স্পেন আশ্রয় নিয়েছিল নোংরামির। তাই ওই ম্যাচ শেষে এএফপির রিপোর্টের হেডিং ছিল ‘ফুটবল শিকার হলো ঠাণ্ডা যুদ্ধের।’ আজ কি মস্কোতে ৫৬ বছরের সেই পুরোনো প্রতিশোধ নিতে পারবে রাশিয়া?

নানা নাটক হয়েছিল ১৯৬৪ এর ইউরো নিয়ে। এর আগের ইউরোতে চ্যাম্পিয়ন সোভিয়েত ইউনিয়ন। ৬০' এর এই আসরে অবশ্য পশ্চিম জার্মানি, ইতালি এবং ব্রিটেন খেলেনি। স্পেন দুই দিন আগে বাছাই পর্ব খেলতে অস্বীকার করে সোভিয়ত ইউনিয়ন যেতে। এই অপরাধে উয়েফার উচিত ছিল আসর থেকে স্পেনকে বহিস্কার করা। কিন্তু উয়েফার বিপক্ষে আগে থেকেই ব্যাপক প্রচারণায় নামে স্পেন সরকার। ফলে স্পেনকে অর্থ দণ্ড দিয়েই ক্ষান্ত হয় উয়েফা। এরপর স্পেনকে ১৯৬৪ সালের ইউরোর চূড়ান্ত পর্বের স্বাগতিক হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়।

সেই আসরেও ফেবারিট ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। সেমিফাইনালে তারা ৩-০তে উড়িয়ে দেয় ডেনমার্ককে। এর আগে বাছাই পর্বে ৩-১ এ জয় সুইডেনের বিপক্ষে। তাই ফাইনালে সোভিয়েত ইউনিয়নই ছিল ফেবারিট। কিন্তু ম্যাচে প্রথমে লিড নেয় স্পেন। কিছুক্ষণ পরেই সোভিয়তরা সমতা আনে। এরপর মাঠে স্ত্রী সহ উপস্থিত স্পেনের রাষ্ট্রপ্রধান জেনারেল ফ্রঙ্কো। এতে পাল্টে যায় ম্যাচের চিত্র। পক্ষপাতিত্ব শুরু হয় স্পেনের পক্ষে। শেষ পর্যন্ত স্বাগতিকদের জয় ২-১ এ। ম্যাচ শেষে স্পেনের ফুটবলারাও বলেছিলেন জেনারেলের উপস্থিতি তাদের ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করেছে ফাইনাল জিততে। তাই এই ট্রফি তারই প্রাপ্য।

আজ কি পারবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাশিয়া স্পেনের বিপক্ষে সেই হারের প্রতিশোধ নিয়ে নিজেদের কোর্য়াটার ফাইনালে নিয়ে যেতে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কি মাঠে উপস্থিত থেকে দলকে চাঙ্গা করতে পারবেন জয়ের ব্যাপারে।

 

আরো পড়ুন : ডিফেন্স নিয়ে সমস্যা স্পেনের

২০১০ সালের বিশ্ব চাম্পিয়ন তারা। দলে আছেন দুই বিশ্বখ্যাত ক্লাবে বার্সেলোনা রিয়ার মাদ্রিদের নামকরা ডিফেন্ডাররা। সার্জিও রামোস, জেরার্ড পিকে, কারভাহাল, জর্ডি আলভারা আছেন এই তালিকায়। দল হিসেবে ফেবারিটের তালিকায়। মানে সম্ভাব্য শিরোপা জয়ী তারা। অথচ এই স্পেনই এবারের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের তিন খেলায় হজম করেছে ৫ গোল। পর্তুগালের বিপক্ষে এই জন্যই জয়ের দেখা মেলেনি তাদের। শেষ গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তো মরক্কো দুই দফা লিডে পায় তাদের বিপক্ষে। ইনজুরি টাইমে সমতা এনে কোনো মতে দ্বিতীয় রাউন্ডে কোয়ালিফাই করা স্প্যানিশদের। ডিফেন্সের এই ভুলেই তাদের হালির উপর গোল হজম। আজ নক আউট পর্বে রাশিয়ার সামনে এই ভঙ্গুর রক্ষণ লাইনের স্পেন। প্রথম রাউন্ডের এই সমস্যা উৎরাতে না পারলে হয়তো অঘটন ঘটিয়ে দিতে পারে রাশিয়া। দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই বিদায় নিতে হতে পারে সাবেক বিশ্বসেরাদের। অঘটন বলা হলো এই কারণে যে, স্পেনের র‌্যাঙ্কিং ১০। আর রাশিয়ার ৭০।

স্বাগতিকরা এবারের বিশ্বকাপ শুরু করেছে দারুণভাবে। প্রথম ম্যাচে ৫-০তে উড়েয়ে দেয় সৌদি আরবকে। পরের ম্যাচে ৩-১ এ জয় মিসরের বিপক্ষে। তাদের ডেনিশ চেরিসেভ তিন ম্যাচে করেছেন তিন গোল। এর মধ্যে সৌদি আরবের বিপক্ষে বল জালে পাঠান দুই বার। মিসরের বিপক্ষে একবার। আরতেম জুবার একটি করে গোল এই দুই দলের বিপক্ষে। উরুগুয়ের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে অবশ্য দলে কিছু পরিবর্তন আনেন রুশ কোচ। ফলে উরুগুয়ের কাছে হার ৩-০তে। সুতরাং দারুণ ফর্মে থাকা এই দুই রুশ আজ মাথা ব্যাথার কারণ হতে পারে স্প্যানিশ রক্ষণভাগের জন্য। শেষ ষোলতে আসা দলগুলোর মধ্যে রাশিয়া সেরা তিন দলের একটি যারা প্রথম রাউন্ডে সবচেয়ে বেশি গোল করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে স্পেনের ডিফেন্ডার দানি কারভাহালও স্বীকার করলেন তাদের রক্ষণভাগের দুর্বলতার কথা। তার বক্তব্য, আমরা গ্রুপ পর্বে যে গোলগুলো আমরা হজম করেছি এর মধ্যে পর্তুগালের দুই গোল ছিল সেট পীস থেকে। বাকি গোলগুলোতে প্রতিপক্ষের কৃত্বিতের চেয়ে ভুল ছিল আমাদের রক্ষণভাগের। আমরাই তাদের সহজে গোল করার রাস্তা করে দিয়েছি। তার মতে, এই ভুলগুলো হয়েছে মূলত মনযোগের অভাব। যোগ করেন, এখন নক আউট পর্বে এই সমস্যার সমাধান না হলে বিদায় নিতে হতে পারে আমাদের।

কোচ ফার্নান্ডো হিয়েরোও এই বিষয়ে সতর্ক করলেন তার শিষ্যদের। মরক্কোর সাথে ম্যাচে পর তিনি জানান, আমরা তিন ম্যাচে পাঁচ গোল খেয়েছি। এটা খুবই দুঃখজনক। আমি খেলোয়াড়দের বলেছি এই ভুলের পুনরাবৃত্তি হতে থাকলে আসর থেকে বিদায় নিতে হবে।

রুশ ডিফেন্ডার ইলা কুতেপভ অবশ্য মনে করেন না সমস্যা অব্যাহত থাকবে তাদের আজকের প্রতিপক্ষদের রক্ষণ প্রাচীরে। জানান, তাদের তো বার্সেলোনা এবং রিয়ার মাদ্রিদে খেলা অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার আছে। ঠিকই সংশোধন করে নেবে তারা।

উল্লেখ্য, স্পেন ২০০৮ ও ২০১২ এর ইউরো এবং ২০১০ বিশ্বকাপেও এতো গোল খায়নি। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে তাদের বিশ্বজয়ের নেপথ্য ছিল দুর্ভেদ্য ডিফেন্স লাইন। এবার পর্তুগালের সাথে ম্যাচের আগে গত দুই বছরে স্পেন মাত্র তিন গোল হজম করেছিল। গত নভেম্বরে এই রাশিয়াই তাদের জালে বল পাঠায়।

এবারের বিশ্বকাপে স্পেনের মতোই গ্রুপ পর্বে পাঁচ গোল হজম করেছে আর্জেন্টিনা, আইসল্যান্ড, কোস্টারিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং পোল্যান্ড। এছাড়া মিসর ছয়, সৌদি আরব সাত তিউনিশিয়া আট এবং সর্বাধিক ১১ গোল খেয়েছে পানামা।

আরেকটি তথ্য সাম্প্রতিক সময়ে কোনো বিশ্ব চ্যাম্পিয়নই তাদের ট্রফি জয়ের পথে চারটির বেশি গোল খায়নি।


আরো সংবাদ