১৪ নভেম্বর ২০১৮

রাশিয়া বিশ্বকাপে ঘটন-অঘটন

মেসি, নেইমার, বিশ্বকাপ
পরাজয়ের পর হতাশ মেসি (বামে), আনন্দঅশ্রু নেইমারের (ডানে) - নয়া দিগন্ত

বিশ্বকাপের মোট ৬৪টি ম্যাচের ৩৬টি ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। চলতি সপ্তাহেই শেষ হয়ে যাবে এবারের বিশ্বকাপের গ্রুপ স্টেজের খেলা। সপ্তাহ শেষে পরিস্কার হয়ে যাবে কারা যাচ্ছে নকআউট পর্বে।

কিন্তু যে কয়েকটি ম্যাচ এ পর্যন্ত হয়েছে তার ভিত্তিতে এবারের বিশ্বকাপ সম্পর্কে কী ধারণা আমরা পাচ্ছি?

যথেষ্ট অবাক করা ঘটনা এরই মধ্যে ঘটেছে বিশ্বকাপে। দেখা গেছে অনেক চমক। তারই কয়েকটি এখানে দেয়া হলো :

ইংল্যান্ড এবং বেলজিয়াম : গোলের বন্যা

বেলজিয়াম এবার আছে দারুণ ফর্মে। প্রতি ম্যাচে গড়ে চারটি করে গোল করেছে তারা। গেল শনিবারের আগে পর্যন্ত এবারের বিশ্বকাপে গোলের সংখ্যা ছিল খুবই কম, সাম্প্রতিক কোনো বিশ্বকাপের সাথে তুলনা করলে। শুক্রবার পর্যন্ত যতগুলো ম্যাচ হয়েছিল, তাতে ম্যাচ প্রতি গোলসংখ্যা ছিল দুই দশমিক ৩৩।

কিন্তু তারপর গ্রুপ জি-র দুই প্রধান দল যেন গোলের বন্যা বইয়ে দিল। বেলজিয়াম ৫-২ গোলে হারালো তিউনিসিয়াকে। আর ইংল্যান্ড ৬-১ গোলে পানামাকে।

সেনেগাল আর জাপানের খেলা ২-২ গোলে ড্র হলো। সব মিলিয়ে ৩৬টি ম্যাচে গোলের সংখ্যা দাড়িয়েছে ৯০টি।

গত চার বিশ্বকাপের সাথে তুলনা করলে মোটেই খারাপ নয়। গত চারটির মধ্যে কেবল ব্রাজিল বিশ্বকাপেই এর চেয়ে বেশি গোল হয়েছে।

গোলশূন্য ড্র নেই :

ইরান বনাম মরক্কোর ম্যাচ। গোলশূন্য ড্র হওয়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু আত্মঘাতী গোলে হারলো মরক্কো। ফুটবলভক্ত এবং সাংবাদিকরা অভিযোগ করছেন যে, এবারের বিশ্বকাপে নেতিবাচক কৌশলের খেলা দেখাচ্ছে কিছু টিম।

কিন্তু তা সত্ত্বেও এবার কিন্তু এখন পর্যন্ত একটিও গোলশূন্য ড্র নেই এবারের টুর্নামেন্টে।

গোল্ডেন বুট পাওয়ার প্রতিযোগিতায় যারা :

রোনালদো ইতিহাস তৈরি করতে পারে.....কিন্তু তাকে টেক্কা দিতে হবে ইংল্যান্ডের হ্যারি কেনকে। গোলের বন্যায় এবার যার কপাল খুলে যেতে পারে, তিনি ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন। তার গোল্ডেন বুট পাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর আগে ইংল্যান্ডের গ্যারি লিনেকার ১৯৮৬ সালে গোল্ডেন বুট পেয়েছিলেন।

হ্যারি কেন এ পর্যন্ত পাঁচটি গোল করেছেন। কিন্তু তাকে তাড়া করছেন বেলজিয়ামের রোমেলু লুকাকু এবং পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। তাদের দু'জনেই করেছেন চারটি করে গোল।

খেলার মাঠে রাজনীতি

সার্বিয়ার বিরুদ্ধে জয়ের পর ঈগলের ভঙ্গিমায় যাকা। এজন্যে তার এবং শাকিরির বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। সুইজারল্যান্ডের দুই খেলোয়াড় সার্বিয়ার বিরুদ্ধে গোল করার পর যে ভঙ্গিতে উল্লাস করেছেন, সেটি রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করে।

জাকা এবং শাকিরি, দু'জনেই সুইজারল্যান্ড জাতীয় দলের খেলোয়াড় হলেও কসোভোর সাথে তাদের সম্পর্ক আছে এবং দু'জনেই আলবেনিয়ান বংশোদ্ভূত। সার্বিয়ার বিরুদ্ধে গোল দেয়ার পর দু'জনেই দুই হাতে ঈগলের ভঙ্গিমায় উল্লাস করেন, যা আসলে আলবেনিয়ার জাতীয় পতাকার প্রতীক।

উল্লেখ্য, কসোভো ২০০৮ সালে সার্বিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। তাদের এই উল্লাসের ভঙ্গিমা স্বাভাবিকভাবেই সার্বিয়ার কাছে অপমানজনক লেগেছে।

ফিফা ইতোমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তাদের দু'জনেই দুটি করে ম্যাচে নিষিদ্ধ হতে পারেন।

লাল কার্ড, হলুদ কার্ড :

জাপানের বিরুদ্ধে খেলায় এবারের বিশ্বকাপের প্রথম লাল কার্ড পেলেন কলম্বিয়ার কার্লোস স্যানচেজ। রাশিয়া বিশ্বকাপের প্রথম ৩০টি ম্যাচে ৯৫টি হলুদ কার্ড দেখানো হয়েছে। এর মানে প্রতি ম্যাচে তিনটির বেশি করে হলুদ কার্ড।

১৯৯৪ সালের পর যত বিশ্বকাপ হয়েছে, সেগুলোর সাথে তুলনা করলে, হলুদ কার্ডের সংখ্যা সেরকম বেশি নয়।

তবে গেলবারের বিশ্বকাপের তুলনায় এই সংখ্যা একটু বেশি। সেইবার ম্যাচ প্রতি হলুদ কার্ডের সংখ্যা ছিল তিনের নিচে।

দর্শকে পরিপূর্ণ স্টেডিয়াম :

এ সপ্তাহান্ত পর্যন্ত প্রায় ১৪ লাখ দর্শক মাঠে গিয়ে খেলা দেখেছেন। স্টেডিয়ামগুলোর প্রায় ৯৭ শতাংশ আসন ছিল পূর্ণ।

সবচেয়ে বেশি দর্শক খেলা দেখেছেন মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে।

সেখানে রাশিয়া বনাম সৌদি আরব, পর্তুগাল বনাম মরোক্কো এবং জার্মানি বনাম মেক্সিকোর খেলায় সবচেয়ে বেশি দর্শক হয়েছিল।

গণশত্রু নেইমার :

সোশ্যাল মিডিয়ায় নেইমারের লাখ লাখ ফলোয়ার। কিন্তু রাশিয়ায় গিয়ে তার কিছু কিছু আচরণে অনেকে ক্ষিপ্ত। বিশেষ করে ব্রাজিল কোস্টারিকার বিরুদ্ধে যে ম্যাচে ২-০ গোলে নাটকীয়ভাবে জিতলো, সেই ম্যাচে তিনি যেভাবে রেফারির কাছে অভিযোগ করছিলেন। একই ম্যাচে যেভাবে তিনি পড়ে গিয়ে পেনাল্টি পাওয়ার চেষ্টা করেন, সেটিও সমালোচিত হয়।

গুগল ট্রেন্ডের ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এবার ব্রাজিল দলের ব্যাপারেই গুগলে সবচেয়ে বেশি সার্চ করা হয়েছে।

গুগলে নয় শতাংশ সার্চ ছিল ব্রাজিলের জন্য। এর পর রয়েছে আর্জেন্টিনা এবং জার্মানি (৭ শতাংশ)। তৃতীয় স্থানে ফ্রান্স (৬ শতাংশ)। স্পেন, ইংল্যান্ড এবং পর্তুগাল আছে চতুর্থ স্থানে (৫ শতাংশ)।

খাদের কিনারে মেসি :

দুটি ম্যাচে আর্জেন্টিনার সংগ্রহ মাত্র এক পয়েন্ট। যদি নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে জিততে না পারে, তাহলে টুর্নামেন্ট থেকেই তাদের বাদ পড়তে হবে।

কিন্তু মেসি এ পর্যন্ত যেভাবে খেলেছে, তাতে আর্জেন্টিনার সমর্থকরা খুবই হতাশ। ফুটবলে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ টুর্ণামেন্ট হচ্ছে বিশ্বকাপ। সেটি যদি এবারও আর্জেন্টিনার জন্য জিততে না পারেন মেসি, যদি গ্রুপ পর্ব থেকেই তাদের বিদায় নিতে হয়, তাহলে সমর্থকরা তাকে ক্ষমা করবেন না।

পানামার উল্লাস :

কেউ যদি হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পানামার গোল এবং তারপর পানামার খেলোয়াড়দের উল্লাস দেখেন, ভাবতে পারেন, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বুঝি তারা বড় অঘটন ঘটিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়। পানামা ইংল্যান্ডের কাছ থেকে ছয় গোল খেলেও বিশ্বকাপে এই প্রথম তারা গোল করেছে। সেজন্যেই এত উল্লাস!

বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো খেলতে এসে তারা এরই মধ্যে নয় গোল খেয়েছে, তাতে কী!

 

আরো পড়ুন : বিশ্বকাপ জিতেই অবসর নেবো : মেসি

ফুটবল বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তোলার পরই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিতে চান আর্জেন্টিনা অধিনায়ক লায়নেল মেসি। ৩১তম জন্মদিনে এমন পণই করলেন বিশ্ব ফুটবলের খুদে এই জাদুকর। এমনিতেই চলতি বিশ্বকাপে এখনো শেষ ষোলো নিশ্চিত হয়নি আর্জেন্টিনার। শেষ ষোলোতে যাওয়ার দোলাচলে দুলছে মেসির দল। এমন অবস্থায় বিশ্বকাপ জিতেই অবসর নেয়ার অঙ্গীকার করলেন মেসি, ‘আমি গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব কিছুই জিতেছি। কিন্তু শেষটাতে এসে আমি উচ্চাভিলাষী। আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ না জিতে আমি ফুটবল থেকে অবসর নেবো না।’

২০১৪ বিশ্বকাপে একাই দলকে ফাইনালে তোলেন মেসি; কিন্তু ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ওই বিশ্বকাপের ফাইনালের অতিরিক্ত সময়ের গোলে জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। ফলে বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরার দ্বারপ্রান্তে এসে হতাশার চাদরে মুষড়ে পড়তে হয় মেসিকে।
২০১৪ আসরের ব্যর্থতার পর কোপা আমেরিকার শততম টুর্নামেন্টের ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে হেরে টানা দ্বিতীয়বারের মতো রানার্স-আপ হতে হয় আর্জেন্টিনাকে। ২০১৫ সালেও এই চিলির কাছে টাইব্রেকারে ৪-১ গোলে হেরেছিল মেসির দল। এই ক্ষোভে ২০১৬ জাতীয় দলে অবসরের ঘোষণা দিয়ে দেন মেসি।

তবে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের অনুরোধে অবসর ভেঙে আবারো আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফিরে আসেন মেসি। ফিরে এসে ২০১৮ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখতে থাকেন তিনি। তবে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে বাধা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পেরোতে হয় দু’বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে। বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের শেষ ম্যাচে মেসির হ্যাটট্রিকে ইকুয়েডরকে ৩-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের টিকিট কাটে আর্জেন্টিনা।
তারপরও বিশ্বকাপে ভালো করার ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন মেসি। কিন্তু নবাগত আইসল্যান্ডের সাথে ১-১ গোলে ড্র দিয়ে এবারের বিশ্বকাপ শুরু করে আর্জেন্টিনা। অবশ্য ওই ম্যাচে মেসি পেনাল্টি মিস না করলে খেলার ফল অন্য রকম হতে পারত।

ড্রর পর ক্রোয়েশিয়ার কাছে ৩-০ গোলে লজ্জার হার বরণ করে অর্জেন্টিনা। ওই হারে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে যাওয়ার পথ কঠিন হয়ে পড়ে মেসির দলের। তবে শেষ ষোলোতে যাওয়ার পথ এখনো খোলা আছে তাদের। আজ গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে নাইজেরিয়াকে হারাতেই হবে আর্জেন্টিনার। পাশাপাশি ‘ডি’ গ্রুপের অন্য ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার কাছে আইসল্যান্ডের হারতে হবে অথবা ড্র করতে হবে। তাই নাইজেরিয়ার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে আত্মবিশ্বাসী বক্তব্যই দিলেন মেসি। ওই ম্যাচ নিয়ে কথা না বললেও আর্জেন্টিনাকে ৩২ বছর পর বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ দেয়ার ইঙ্গিত দিলেন মেসি, ‘বিশ্বকাপ জয় আমার কাছে অনেক বড় কিছু। কারণ, আর্জেন্টিনার জন্য বিশ্বকাপ জয় বিশেষ একটা ব্যাপার। আসলে আমার কাছে এটা বিশেষ কিছু।’

আর্জেন্টিনার হয়ে একবার বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরতে মরিয়া হয়ে আছেন মেসি। জন্মদিনে তার বক্তব্য এমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে, ‘বিশ্বকাপের ট্রফি ওপরে তুলে ধরার স্বপ্ন আমি সব সময়ই দেখে আসছি। বিশ্বকাপ জেতার পর যে আনন্দের অনুভূতি হয়, সেটা অন্যদের মধ্যে দেখেছি। ওই মুহূর্তটি নিয়ে ভাবলে আমার মাথার চুল দাঁড়িয়ে যায়। আমি বিশ্বের লাখ-লাখ আর্জেন্টাইনকে বিশ্বকাপের আনন্দ দিতে চাই। আমি সবার স্বপ্নটা বিসর্জন দিতে পারি না।’

২৪ জুন ছিল মেসির ৩১তম জন্মদিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জন্মদিনের শুভেচ্ছার বার্তা পেয়েছেন তিনি। তাকে শুভেচ্ছা দিতে ভুল করেননি মেসির স্ত্রী অ্যান্তোনেইয়া রোকুজ্জোও।

জন্মদিনের দিন বিশ্বকাপ জয়ের জন্য অস্থির হয়ে উঠলেন মেসি। এমনকি বিশ্বকাপ না জিতে ফুটবল থেকে অবসর না নেয়ার পণও করে বসলেন তিনি। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে এটি কিসের আভাস তা সময়ই বলে দেবে।


আরো সংবাদ