২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

মিসরের হয়ে আর খেলবেন না সালাহ!

সালাহ, মিসর, বিশ্বকাপ
মোহাম্মদ সালাহ - সংগৃহীত

আর খেলবেন না মিসরের হয়ে। এমনটাই জানিয়েছেন মোহাম্মদ সালাহ। তার ঘনিষ্ঠ একজন সিএনএনকে এ কথা জানিয়েছেন। চেচনিয়ার নাগরিকত্ব নিয়ে উঠা বিতর্কের জেরেই সালাহ এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন তিনি।

বিশ্বকাপের অনুশীলনের জন্য চেচনিয়া প্রজাতন্ত্রের রাজধানী গ্রোজনিতে বেইস ক্যাম্প করেছিল মিসর। দুই ম্যাচে হেরে ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে তারা। তাই শুক্রবার সালাহদের বিদায়ী সংবর্ধনা দিয়েছে চেচনিয়ার নেতা রমজান কাদিরভ। এরপরই সালাহকে নাগরিকত্ব দেয়ার ঘোষণা দেন কাদিরভ।

সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে কাদিরভ জানান, ‘মোহাম্মদ সালাহ এখন চেচনিয়ার একজন সম্মানিত নাগরিক। আমি সালাহকে এই সম্মান জানিয়ে ফরমান জারি করছি। এবং সালাহকে এর একটি কপি পাঠিয়েছি। এটি উদযাপনের জন্য আমি রাতে মিসরের পুরো দলের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেছি।’

রাশিয়ার একটি বার্তা সংস্থার ভিডিওতে দেখা গেছে, নৈশভোজে এ ঘোষণার পর সালাহকে চেচনিয়ার পতাকাযুক্ত একটি মর্যাদাপূর্ণ ব্যাজও পরিয়ে দিচ্ছেন কাদিরভ।

এই ঘটনার পর সমালোচনার মুখে পড়েন সালাহ। কিন্তু তিনি কোনো রাজনীতির অংশ হতে চান না।

মিসরের ফুটবল ফেডারেশন সিএনএনকে পাঠানো এক ই-মেইলে জানিয়েছে, 'তারা খুবই আশ্চর্য হয়েছেন এই কথা শুনে যে সালাহ মিসরের জাতীয় দল থেকে বিদায় নিতে চাচ্ছেন। অথচ এ ব্যাপারে তিনি তাদের জানাননি।'

বিবৃতিতে সংস্থাটি আরো জানায়, 'সালাহ কোনো সিদ্ধান্ত নিলে আমাদের জানান। আমরা পুরোদিন সালাহর সাথে ছিলাম। কিন্তু তিনি আমাদের কারো সাথে এই ব্যাপারে কোনো কথা বলেননি।'

তারা জানায়, 'আমরা এখানে খেলতে এসেছি। ফিফার নীতিমালা অনুযায়ী, আমরা কোনো রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা করি না। আর যদি তেমন কিছু নিয়ে কথা বলতে হয়, তবে সেটা সরাসরি ফিফার সাথেই বলা উচিত।'

এদিকে আজ শেষ ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে মাঠে নামবে মিসর। জিতলে গ্রুপে তৃতীয় স্থান নিয়ে সম্মানের সাথে বিদায় নিতে পারবে তারা। সেই সম্মান রাখতেই আজ লড়বে সালাহরা।

 

আরো পড়ুন : সালাহকে নিয়ে রাজনীতি

রফিকুল হায়দার ফরহাদ, রাশিয়া থেকে

ফুটবল মাঠে ঈর্ষণীয় পারফরম্যান্স ও বিনীত আচরণ মোহাম্মদ সালাহকে মুসলমানদের গর্বে পরিণত করেছে। এদিকে সালাহ’র ইমেজকে কাজে লাগিয়ে নিজের যত কুকর্ম ও অপরাধ আছে তাতে স্বচ্ছতার প্রলেপ দেয়ার চেষ্টা করছেন চেচনিয়ার প্রেসিডেন্ট রমজান কাদিরভ। তিনি শুরু করেছেন সালাহকে নিয়ে রাজনীতি।

প্রথমে এই চেচনিয়ার রাষ্ট্রনায়ক মিসর দলের অনুশীলনে গিয়ে সালাহকে সাথে নিয়ে আখমদ স্টেডিয়াম পরিদর্শন করেন। এরপর সালাহ’র হাত তুলে ধরে তার সাথে ছবি তুলেছেন। এখন এই ফুটবল স্টারকে দিয়েছেন চেচনিয়ার সম্মানসূচক নাগরিকত্ব। গত শুক্রবারের ঘটনা এটি।

চলমান বিশ্বকাপে মিসর দলের বেস ক্যাম্প ছিল রাশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত রাজ্য চেচনিয়ার রজাধানী গ্রোজনিতে। আর এই সুযোগেই সালাহ’র ইমেজকে কাজে লাগিয়ে চেচনিয়ার প্রেসিডেন্ট রমজান কাদিরভ বর্হিবিশ্বে নিজের অবস্থান উন্নত করার চেষ্ট করছেন। রমজান কাদিরভের বিপক্ষে তার দেশে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিাযোগ রয়েছে। বিশেষ করে তার মতাদর্শ বিরোদীদের কঠোর হস্তে দমন করা, গুম করে ফেলার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। বহুবিচার বর্হিভূত হত্যাকাণ্ড তার নির্দেশে হয়েছে বলে ব্যাপক অভিযোগ। 
তাই এই লৌহ মানব বর্হিবিশ্বে ব্যাপক সমালোচিত এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য।

এদিকে চেচনিয়ার প্রেসিডেন্টের সাথে ছবি তুলে মোহাম্মদ সালাহও অনেকের অপ্রিয় হয়ে গেছেন। অনেকেই সালাহর সমালোচনায় সোচ্চার হয়েছে কাদিরভের সাথে ঘনিষ্ঠতার জন্য। আসলে সালাহ’র কী দোষ? একজন প্রেসিডেন্ট যদি তার সাথে দেখা করেন ও ছবি তুলতে চান তা হলে এড়িয়ে যাওয়ার তো উপায় থাকে না। তাছাড়া এই চেচনিয়ায় তো মিসর দল আতিথ্য গ্রহণ করেছে। গত শুক্রবার মিসর দলকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান চেচনিয়ার প্রেসিডেন্ট। তখনই সালাহকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দেয়ার ঘোষণ দেন রমজান কাদিরভ। সাথে চেচনিয়ার ক্লাব এফসি আখমদ গ্রোজনি দলের জার্সী উপহার দেয়া হয় সালাহকে। রমজানের বাবার নামেই এই ক্লাব।

এবারের বিশ্বকাপে মেসি, রোনালদো, নেইমারের চেয়ে কম আলোচনায় ছিলেন না সালাহ। বিশেষ করে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের স্প্যানিশ ফুটবলার সার্জিও রামোস কর্তৃক ফাউলের শিকার হয়ে মারাত্মক আহত হওয়া ও পরবর্তীতে সালাহ’র বিশ্বকাপে খেলার অনিশ্চয়তা আরো ব্যাপক মাত্রায় আলোচনায় নিয়ে আসে তাকে। এই লিভারপুল তারকা শেষ পর্যন্ত সকল শঙ্কা কাটিয়ে রাশিয়া বিশ্বকাপে খেলেছেন মোহাম্মদ সালাহ। উরুগুয়ের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে সাইডলাইনে বসে থাকলেও রাশিয়ার বিপক্ষে পুরোপুরি ফিট না হওয়া সত্ত্বেও খেলেছেন। গোলও করেছেন পেনাল্টি থেকে। এই একটি বিষয়ে তিনি লিওনেল মেসির চেয়ে এগিয়ে। এবারের বিশ্বকাপে মেসি এখনও গোলশূন্য। মিস করেছেন পেনাল্টি। অন্যদিকে সালাহ’র ভাণ্ডারে এক গোল। সোমবার সালাহর মিসরের শেষ ম্যাচ সৌদি আরবেব বিপক্ষে। ভলগোগ্রাদে অনুষ্ঠিতব্য এই্ ম্যাচটি দুই দলেরই নিয়ম রক্ষার। তবে সালাহ’র শেষ সুযোগ গোল করে বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকদের প্রত্যাশা পূরণ করা এবং দলকে জেতানো।

রাশিয়ার বিপক্ষে দুই দফা স্বাধীনতা যুদ্ধ করে চেচনিয়া। ১৯৯৩ সালে চেচনিয়া পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষনা করে রাশিয়া থেকে। এর ক্ষুদ্ধ রুশ বাহিনী চেচনিয়া আক্রমণ করলে ১৯৯৪ সাল থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। তাতে জয় হয় চেচেন মুসলিমদের । এরপর রুশবাহিনী ফের চেচনিয়া আক্রমণ করে ১৯৯৯ সালে। তখন এই রমজান কাদিরভের বাবা আখমদ কাদিরভ তার বাহিনী নিয়ে দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থা নিয়ে হাত মেলায় রুশদের সাথে। ফলে ২০০০ সালে পরাজয় হয় চেচনিয়ার যোদ্ধাদের। আখমাদ কাদিরভ হন চেচনিয়ার প্রেসিডেন্ট। পরে স্বাধীনতাকামীদের স্টেডিয়ামে পেতে রাখা বোমায় নিহত হন আখমাদ। এরপর দেশের প্রেসিডেন্ট হন ছেলে রমজান। তখনই তিনি বিরোধীদের দমনে লঙ্ঘন করতে থাকেন মানবাধিকার। তাই সারা বিশ্বেই রয়েছে তার সমালোচনা। উল্লেখ্য ১৯১৭ সালে চেচনিয়া দখল করে সোভিয়েত রাশিয়ার অন্তর্ভূক্ত করা হয়। তখন চেচেনদের শুরু করা স্বাধীনতা যুদ্ধ হারের মাধ্যমে শেষ হয় ১৯২১ সালে।


আরো সংবাদ