২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বিবর্ণ মেসি-সালাহ, মাঠ দাপাচ্ছেন নতুন তারকারা

মডরিচ, ক্রোয়েশিয়া, বিশ্বকাপ
লুকা মডরিচ (বামে) ও ডেনিস চেরিশেভ (ডানে) - নয়া দিগন্ত

অঘটন কড়া নাড়ছে রাশিয়া বিশ্বকাপের দুয়ারে। গতবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে হারিয়ে ইতোমধ্যেই বড় চমক দিয়েছে মেক্সিকো। মেসির আর্জেন্টিনাকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে ক্রোয়েশিয়া। সুইজারল্যান্ডের কাছে গ্রুপের প্রথম ম্যাচে আটকে গেছে ব্রাজিল। তিকি-তাকার ঝাঁঝ এখনও পাওয়া যায়নি স্পেনের খেলায়। এক কথায় বিশ্বকাপের বড় দলগুলো রীতিমতো নাকানিচুবানি খাচ্ছে তথাকথিত অনামী ও প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকা দলগুলোর কাছে। এই তালিকায় কিছুটা ব্যাতিক্রমী ক্রিশ্চিয়ানো রোনারদো। ব্যক্তিগত ক্যারিশমার জোরে দুই ম্যাচে চার গোল করে গোল্ডেন বুট দখলের লড়াইয়ে অনেকটাই এগিয়ে গেছেন সি আর সেভেন। তবে টিম হিসাবে পর্তুগালের পারফরম্যান্স মোটেই পাতে দেয়ার মতো নয়।

তারকারা সব সময় বড় মঞ্চে জ্বলে উঠতে পছন্দ করেন। লিভারপুলের হয়ে সাড়া জাগানো মোহাম্মদ সালাহকে ঘিরে মিসরবাসী স্বপ্ন দেখেছিল রাশিয়া বিশ্বকাপের নক-আউট পর্বে ওঠার। কিন্তু সালাহ চোটের কারণে প্রায় বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যেতে বসেছিলেন। কিন্তু সব আশঙ্কা দূরে সরিয়ে তিনি গ্রুপের দ্বিতীয় ম্যাচে দেশের জার্সি গায়ে নামেন। গোলও করেন। তবে দলকে জেতাতে পারেননি। পর পর দুটি ম্যাচ হেরে মিসর বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছে। আপাতত বিদায়ী ম্যাচে সালাহর পায়ের জাদু দেখার প্রত্যাশায় ফুটবলপ্রেমীরা।

স্প্যানিশ লিগের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার দ্বৈরথ বিগত কয়েক বছরে কেন্দ্রীভূত হয়েছে মেসি-রোনালদোর ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের প্রদর্শনীতে। পেন্ডুলামের মতো মেসি-নেইমারের পারফরম্যান্স মিটার ওঠা নামা করে ক্লাবের জার্সিতে। রাশিয়া বিশ্বকাপের পুরো ফোকাসটাই ছিল মেসি-রোনালদোর ওপর। সেদিক থেকে দেখলে বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির থেকে কয়েক আলোক বর্ষ দূরে এখন এগিয়ে গিয়েছেন রোনালদো। তবে খাদের কিনারা থেকে কীভাবে ফিরে আসতে হয় সেটা মেসি ভালোই জানেন। বিশ্বকাপে খেলাটাই যখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল, তখন শেষ ম্যাচে জ্বলে উঠেছিলেন লিও। তিনিই মূলত আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপের টিকিট পাইয়ে দিয়েছিলেন। তাই দুই ম্যাচ খেলে আর্জেন্টিনা মাত্র এক পয়েন্ট পেলেও গ্রুপের শেষ লড়াইয়ে নাইজেরিয়াকে উড়িয়ে দিয়ে মেসিদের দ্বিতীয় রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ এখনও রয়েছে। আর সেই জাদু একমাত্র মেসিই দেখাতে পারেন বলে বিশ্বাস করেন আর্জেন্তিনীয় সমর্থকরা। তবে এই আর্জেন্টিনার পক্ষে বিশ্বকাপ জেতা যে কঠিন, সেটা কিন্তু এক কথায় প্রায় সব ফুটবল পণ্ডিতই ভবিষ্যদ্বাণী করে দিয়েছেন।

১৯৫৮ সালের পর থেকে ইউরোপের মাটিতে আয়োজিত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি লাতিন আমেরিকার দেশ। তিতের নেতৃত্বে ব্রাজিল এবার বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে যে দর্শনীয় ফুটবল খেলেছিল, তা দেখার পর অনেকেই বলেছিলেন, এই ব্রাজিল আবার বিশ্বকাপ জিততে পারে। কিন্তু গ্রুপের প্রথম ম্যাচে সুইস-গেটে আটকে গিয়েছিলেন সেলেকাওদের সব আক্রমণ। নেইমার জুনিয়র যখনই বল ধরেছেন, তখনই তাকে কড়া ট্যাকলে ভূপতিত করেছেন সুইস ডিফেন্ডাররা। বার দশেক কড়া ট্যাকলে নেইমারের পায়ের চেটো ফুলে গিয়েছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো কোস্টারিকার বিরুদ্ধে খেলতে পারবেন না। তবে নেইমার প্রথম ম্যাচের ব্যর্থতা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছেন কোস্টারিকার বিরুদ্ধে। বাঁ-প্রান্ত দিয়ে তিনি একের পর এক আক্রমণ শানিয়েছেন বিপক্ষ দলের বক্সে। অতিরিক্ত সময়ে একটিও গোল করেছেন। তবে ঘরের মাঠে চার বছর আগে বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে জার্মানির কাছে ১-৭ গোলে হারের লজ্জা ঘোচাতে মরিয়া নেইমাররা। সাবেক ব্রাজিলিয়ান তারকা রোনাল্ডো বলেছেন, ‘গ্রুপ পর্বের বাধা টপকে যেতে পারলে এই ব্রাজিলকে আর কেউ আটকাতে পারবে না।’

শনিবারই হয়তো ঠিক হয়ে যাবে জার্মানির বিশ্বকাপ ভাগ্য। সুইডেনের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ম্যাচে যদি জোয়কিম লো’র ছেলেরা হেরে যায়, তাহলে দেশে ফেরার টিকিট কাটতে হবে মুলারদের। বিশ্বকাপের ইতিহাস বলছেন, ইস্পাত কঠিন মানসিকতাই জার্মান ফুটবলারদের মূল সম্পদ। তবে জোয়াকিম লো’র কোচিংয়ে জার্মানি বিগত কয়েক বছরে যে দৃষ্টিনন্দন ফুটবল খেলেছে, তার মধ্যে অনেকেই ব্রাজিলের ‘জোগো বোনিতো’ কিংবা স্পেনের ‘তিকি-তাকা’ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে জার্মান দলে ধীরে ধীরে ট্রানজিশন পর্ব চলেছে। নয়জন পুরানো ফুটবলারের সাথে নবাগতদের নিয়ে বিশ্বকাপের দল সাজিয়েছেন লো। ম্যান সিটির লেরয় সানের মতো তারকাকে ছেঁটে ফেলা যে কতটা ভুল সেটা নিশ্চয়ই বুঝছেন জার্মান কোচ। রাশিয়া বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে জার্মানি ছিটকে গেলে এক ঝটকায় জোগিলোর সাম্রাজ্যের পতন ঘটবে।

বিশ্বকাপ বরাবর তারকার জন্ম দেয়। ১৫ জুলাইয়ের পর জানা যাবে রাশিয়া বিশ্বকাপের তারকা কে হলেন? তবে যারা স্টারডম স্ট্যাটাস নিয়ে বিশ্বকাপে খেলতে এসেছিলেন, তাদের অধিকাংশই কিন্তু নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি।

সেদিক থেকে কিছুটা ব্যাতিক্রমী ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেন, স্পেনের স্ট্রাইকার ডিয়েগো কস্তা, ক্রোয়েশিয়ার মিডিও লুকা মডরিচ, জার্মানির বিরুদ্ধে মেক্সিকোর একমাত্র গোলদাতা হারভিং লোজানো আর আয়োজক দেশ রাশিয়ার তারকা ডেনিস চেরিশেভ।

 

আরো পড়ুন : কেন কান্নায় ভেঙে পড়লেন নেইমার

নাটক করলেন, গোল করলেন, কান্নায় ভেঙেও পড়লেন। ব্রাজিল বনাম কোস্টা রিকা ম্যাচে পিটার্সবার্গের সবচেয়ে বড় শো-ম্যান হিসেবে নিজেকে মেলে ধরলেন নেইমার। ম্যাচের জন্য নির্ধারিত ৯০ মিনিটের মধ্যে যখন গোলমুখ খুলতে পারছিল না ব্রাজিল৷ পেনাল্টি আদায় করে নেয়ার জন্য এইসময় ফাউলের নাটক করলেন এন-টেন। অতিরিক্ত সময়ের ৭ মিনিটে ডগলাস কোস্তার পাশ থেকে গোল করলেন নেইমার। গোল করার পর ম্যাচ শেষে মাঠে বসে নেইমারের কেঁদে ফেলার ছবি ধরা পড়ল টিভি ক্যামেরায়।

কোস্টা রিকাকে হারিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের জায়গা শক্ত করার পর ম্যাচ শেষে কান্নায় ভেঙে পড়ার ব্যাখ্যা দিলেন নেইমার। ইন্সটাগ্রামে একটি পোস্টে নেইমার লেখেন, ‘এতটা আসতে আমি যে কিসের মধ্য দিয়ে গিয়েছি, তা অনেকেই জানে না। এই কান্না ,আনন্দ, সমস্যা কাটিয়ে ওঠা এবং জয় পাওয়া। আমার জীবনে কখনও কিছুই সহজ ছিল না৷ এখনো কিছুই সহজ নয়।

বিশ্বকাপের শুরুতেই কোচ তিতে জানিয়েছিলেন ১০০ শতাংশ ফিট নন দলের সেরা ফরোয়ার্ড৷ তার প্রমাণও দিয়েছেন নেইমার। সুইজারল্যান্ড ম্যাচ থেকে একাধিকবার মাঠে পড়ে গড়াগড়ি খেতে দেখা যায় নেইমারকে৷ কোস্টা রিকার ম্যাচে ৭৮ মিনিটে এক হাস্যস্পদ ঘটনা ঘটালেন বিশ্বের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড। ডি-বক্সে কোস্টা রিকার ডিফেন্ডার তাকে ভালোভাবে স্পর্শও করেননি। অথচ ব্রাজিল তারকা এমনভাবে পড়ে গেলেন, যেন তাকে টেনেহিঁচড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে। এইভাবে পেনাল্টি আদায় করলেও ভিডিও রিভিউয়ে নেইমারের প্লে-অ্যাক্টিং ধরা পড়ে যাওয়ায় রেফারি সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নেন। তবে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে পাওয়া গোল এনটেন-কে সমস্ত সমালোচনার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।


আরো সংবাদ