মঙ্গলবার, ১৯ জুন ২০১৮
বেটা ভার্সন

ক্ষেপে গেলেন মেসি, ফাঁস করলেন অজানা কথা

ক্ষেপে গেলেন মেসি, ফাঁস করলেন অজানা কথা - ছবি : সংগৃহীত

বিশ্বকাপ শুরুর মুহূর্তে এ যেন আহত লিওনেল মেসি। নিজের দেশের সংবাদপত্রে খোলাখুলি জানিয়ে দিলেন, দেশের হয়ে খেলা নিয়ে অন্যায়ভাবে অনেকেই তার সমালোচনা করে থাকেন। বিশেষ করে কোপা আমেরিকা ফাইনালে হারের পরে যেভাবে নিন্দুকরা তার বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচার’ করতে নেমেছিল, তা একেবারেই মেনে নিতে পারেননি তিনি। আর্জেন্টিনার ‘লা ন্যাসিয়ন’ সংবাদপত্রে মেসি বলেছেন, ‘‘কোপা আমেরিকার সময় অনেক কথা বলা হয়েছিল। সেই সব মন্তব্যগুলোর সঙ্গে বাস্তবের কোনো সম্পর্ক ছিল না।’’

সেই সময়ে তার বিরুদ্ধে বলা কথাগুলির মধ্যে ব্যক্তিগত আক্রমণের গন্ধও খুঁজে পেয়েছেন মেসি। তার উত্তেজিত প্রতিক্রিয়া, ‘‘বেশির ভাগ মন্তব্য আমাকে উদ্দেশ্য করে করা হয়েছিল। আমি নাকি দেশের হয়ে খেলতে চাই না। জাতীয় সঙ্গীতও গাই না। আমি নাকি আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের জার্সির গুরুত্ব বুঝি না। এ সব মন্তব্য শুনে একটাই কথা মনে হতো। অন্যায়ভাবে ওরা আমাকে আক্রমণ করছে।’’ সমালোচকদের মন্তব্য নিয়ে যে তিনি ভাবতে বাধ্য হয়েছিলেন, সে কথাও গোপন করেননি মেসি। বলেছেন, ‘‘অনেক সময় ভেবেছি, সত্যি কি আমিই সমস্ত সমস্যার কারণ? নাকি আমাদের পুরো দলটাই খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে? কিন্তু সেই ভাবনাগুলো চিরস্থায়ী হয় না। মন্তব্যগুলোকে পিছনে ফেলে দিয়ে এগিয়ে গিয়েছি।’’

নিজের সেরাটা দিয়েও যে সব সময় সেরা হওয়া যায় না, সেই যন্ত্রণা বিদ্ধ করে বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তারকাকে। মেসির কথার মধ্যে বেরিয়ে আসে সেই যন্ত্রণার সুর, ‘‘মাঝেমধ্যে আপ্রাণ চেষ্টা করার পরেও নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী ফল পাওয়া যায় না। জীবনে কিছু ঘটনা ঘটে, যার কোনও উত্তর পাওয়া যায় না।’’ আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হিসেবে মাঠে নামতে যে তিনি গর্বিত বোধ করেন, তা জানিয়ে দিয়েছেন মেসি। ‘‘যখন মনে করি, এই আর্মব্যান্ডটা আমাদের দেশের কী সব বিখ্যাত নামের শরীরে উঠেছে, গায়ে কাঁটা দেয়। তৎক্ষণাৎ আমার মধ্যে দায়িত্বজ্ঞান তৈরি হয়। মনে হয়, ভালো খেলে আমার দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমার দায়িত্ব দেশের হয়ে ভাল খেলা এবং দেশকে ফুটবল মাঠে জিততে সাহায্য করা।’’

আর্জেন্টিনার কোন ফুটবলারকে তার ভালো লাগে? কে তার প্রিয় ফুটবলার? নিজের দেশের কাগজকে মেসি জানিয়েছেন পাঁচটি নাম। ম্যারাডোনা, সোরিন, জানেত্তি, আয়ালা, মাসচেরানো। কী ভাবে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হয়েছিলেন তিনি, সেই কাহিনিও ফাঁস করেছেন মেসি। ঘটনাটি ঘটে সাবেক কোচ সাবেয়ার আমলে। তিনিই প্রথম বলেন যে, তোমাকে অধিনায়ক হতে হবে। ‘‘তার পর মাসচেরানো বলতে শুরু করল, আমাকেই ক্যাপ্টেন হতে হবে। তখন ও-ই ক্যাপ্টেন ছিল এবং সরে দাঁড়াতে চাইল। মাসচেরানোর মহানুভবতার পরিচয় ছিল সেটা। আমার তাই মনে হয়েছিল, অধিনায়কত্বটা দুই বন্ধুর মধ্যে হাত বদল হলো,’’ বলে দিচ্ছেন মেসি।

আরো পড়ুন :

কেন শুধু ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা উন্মাদনায় ভাসে বাংলাদেশ?
বিবিসি
বাংলাদেশের বিশ্বকাপের সিংহভাগ জুড়ে থাকে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা নিয়ে উন্মাদনা। বিশ্বকাপ শুরুর অনেক আগে থেকেই রাস্তাঘাট পতাকায় ছেয়ে যায়। জার্মানি, ফ্রান্স বা স্পেনের মতো দলের সমর্থক থাকলেও মূলত ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা নিয়েই আলোচনা বেশি হয় বাংলাদেশে।

বিশ্বকাপ শুরুর আগে ঢাকার ছোট-বড় পোশাক কারখানা থেকে শুরু করে পাড়ার দর্জির দোকানেও যেসব পতাকা তৈরি হয় তার সিংহভাগই ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার।

চায়ের দোকানের আড্ডায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুবান্ধব, অফিসের সহকর্মীরাও এই এক মাস ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে প্রথমবারের মত টেলিভিশনে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখানো হয় ১৯৮৬ সালে। তাও শুধুমাত্র নকআউট পর্বের খেলাগুলোই দেখানো হয়। প্রবীণ ফুটবল ভক্তদের মতে, বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে ব্যাপক উম্মাদনার শুরুটা তখন থেকেই।

সে সময় আবাহনী-মোহামেডানের খেলা ছিল তরুণ ফুটবল ভক্তদের আলোচনার প্রধান বিষয়। তাই স্বভাবতই ছিয়াশির বিশ্বকাপ সেসময়কার তরুণদের মনে দাগ কাটে।

প্রবীণ সাংবাদিক নাজমুল আমিন কিরণ বলেন, বাংলাদেশের ফুটবলের স্বর্ণালী যুগ যখন শুরু হয় তখনই এই ফুটবল নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়। ব্রাজিল আর্জেন্টিনা বরাবরই এদেশে ফেভারিট।

"একটা সময় পেলের কারণে ব্রাজিল, ম্যারাডোনার কারণে আর্জেন্টিনা"।

"তখন টিভি বলতেই ছিল বাংলাদেশ টেলিভিশন। চার বছর পর বিশ্বকাপ দেখাতো তাও সবগুলো ম্যাচ দেখাতো না।"

কিরণ বলেন, জার্মানি বা ফ্রান্সও তখন ভালো খেলতো কিন্তু ব্রাজিল অথবা আর্জেন্টিনার মতো তারকা খেলোয়াড় ছিল না। আর্জেন্টিনার ম্যারাডোনা, ব্রাজিলের পেলে প্রথমে, পরে রোনালদো, এখন আর্জেন্টিনার মেসি।

মূলত ৮৬ ও ৯০'র বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার প্রদর্শনী মানুষকে আর্জেন্টিনার সমর্থনে উদ্বুদ্ধ করে। এরপর ম্যারাডোনার সমর্থকরাই আর্জেন্টিনার সমর্থন দিয়ে আসছে। এরপরের যুগটাই ব্রাজিল বিশ্বকাপ ফুটবলে রাজত্ব করে।

১৯৯৪ সালে বিশ্বকাপ জেতে শক্তিশালী ইতালিকে হারিয়ে, ১৯৯৮ সালে ফাইনালে উঠে স্বাগতিক ফ্রান্সের কাছে হেরে যায়, ২০০২ সালে আবারো বিশ্বকাপ জেতে ব্রাজিল।

মূলত: বাংলাদেশে টেলিভিশনে বিশ্বকাপ দেখানোর পর থেকে টানা পাঁচটি বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের দাপট থাকার কারণেই এই সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি হয় ও এই দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। কখনো এটা খুনসুটির পর্যায়ে থাকলেও, মারামারির মতো গুরুতর ঘটনাও ঘটেছে বাংলাদেশে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত কয়েক দশক যাবত চা বিক্রি করছেন আব্দুল জলিল স্বপন, তিনি ঢাকায় আসেন ১৯৮৪ সালে। তিনি বলেন, ছিয়াশির বিশ্বকাপে খেলা দেখার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে টিভি নিয়ে আসা হয়। প্রচুর মানুষ আসতো তখন খেলা দেখতে। তখনই ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকগোষ্ঠী দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়।

তিনি বলেন, ব্রাজিলের ভক্তরা আর্জেন্টিনার ভক্তদের পছন্দ করে না, তেমনি আর্জেন্টিনার ভক্তরাও ব্রাজিলের ভক্তদের পছন্দ করতো না। "এটা অনেকটা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থনের মতো হয়ে যায়"।

আর্জেন্টিনার একজন সমর্থক জাহিদ হাসানের মতে, আর্জেন্টিনার সমর্থক তৈরিতে টেলিভিশনেরর একটি বড় ভূমিকা আছে।

তিনি বলেন, টেলিভিশন আসার পর যে দুটি বিশ্বকাপ দেখতে পেরেছে বাংলাদেশের ফুটবল ভক্তরা। তার প্রথমটিতে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, পরেরটিতে ফাইনাল খেলেছে। তাই এই দুটি বিশ্বকাপ এখানে বড় ভূমিকা পালন করেছে।

শুরুতে ম্যারাডোনার ব্যক্তিত্ব, খেলার ধরণ ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে আলোড়ন তৈরি করে। জাহিদের মতে, ম্যারাডোনাই আর্জেন্টিনার এতো বড় সমর্থক গোষ্ঠী তৈরির অন্যতম প্রভাবক।

ব্রাজিলের একজন সমর্থক শান্ত কৈরির মতে, ব্রাজিলের সমর্থক তৈরি হয়েছে দুটো প্রজন্মকে ঘিরে। প্রথমটি পেলের যুগ, ষাটের দশকে অনেকেই পেলের খেলার কারণে ব্রাজিল সমর্থন করতো কিন্তু তখন প্রচার বেশি ছিল না। তাই মাতামাতি কম ছিল।

এরপর নব্বইয়ের দশকে ফুটবল অঙ্গনে ব্রাজিলের উত্থান বড় ভূমিকা রাখে সমর্থক গোষ্ঠী তৈরিতে।

তবে খেলা ছাড়াও অনেকেই পারিবারিক কারণে ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা সমর্থন করে আসছেন।


আরো সংবাদ