১৭ আগস্ট ২০১৯

শিশুর উপর বর্বরতা : জার্মান নারীর বিচার শুরু

আইএস
শিশুর উপর বর্বরতার দায়ে জার্মান নারী জেনিফার ডব্লিউর বিচার শুরু হচ্ছে - ছবি: সংগৃহীত

জার্মানীতে পাঁচ বছর বয়সী একটি মেয়েকে পিপাসায় মেরে ফেলার অভিযোগে মঙ্গলবার এক জার্মান নারীর বিচার শুরু হয়েছে। ওই নারী উগ্রবাদী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটে (আইএস) যোগ দিয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।

লন্ডনভিত্তিক প্রখ্যাত মানবাধিকার আইনজীবী আমাল ক্লুনি ওই ইয়াজিদি মেয়েটির মায়ের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী দলের সদস্য। তবে মঙ্গলবারে মিউনিখের ওই বিচারকার্যে তিনি উপস্থিত থাকবেন না বলেই মনে করা হচ্ছে।

অভিযুক্ত নারীর নাম জেনিফার ডব্লিউ। তার বয়স ২৭ বছর।

জেনিফারের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ, হত্যা, সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্য হওয়া ও অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে।

সাপ্তাহিক পত্রিকা ডের স্পিয়েগেল জানিয়েছে, জেনিফারের নিজেরও একটি ছোট মেয়ে রয়েছে।

এফবিআই একটি গাড়িতে আড়িপাতা যন্ত্রের মাধ্যমে জেনিফারের অপরাধের স্বীকারোক্তি পায়। গাড়িতে সে তার কৃতকর্মের জন্য নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছিল।

জার্মান প্রসিকিউটররা অভিযোগ করেন, ২০১৫ সালে জেনিফারের আইএস স্বামী একটি ইয়াজিদি মেয়ে ও তার মাকে কিনেছিলেন। তিনি তাদেরকে তাদের বাড়ির কাজ করার জন্য নিয়ে আসেন। তারা তখন আইএস দখলকৃত ইরাকের মসুল নগরীতে থাকতেন।

প্রসিকিউটররা অভিযোগ করেন, ‘মেয়েটি অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং তোশক ভিজিয়ে দেয়। লোকটি ঘরের বাইরে মেয়েটিকে একটি চেন দিয়ে বেঁধে রাখে। প্রচণ্ড গরমে ও পানি পিপাসায় মেয়েটি মারা যায়।’

প্রসিকিউটররা জানায়, ‘অভিযুক্ত তার স্বামীকে এই নির্মম কাজটি করতে বাধা দেয়নি এবং শিশুটিকে বাঁচাতে কিছুই করেনি।’

উল্লেখ্য, জেনিফার অষ্টম গ্রেডে পড়ার সময় স্কুল ত্যাগ করেন এবং ২০১৩ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে তুরস্ক ও সিরিয়া হয়ে ইরাকে যান এবং আইএসে যোগ দেন।

আরো পড়ুন :
‘আইএস পরাজিত হয়েছে’
মো: বজলুর রশীদ, ১৪ মার্চ ২০১৯
‘আইএস পরাজিত হয়েছে। আমাদের মিশন সফল হয়েছে।’ এই দাবি করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিরিয়া থেকে তার দেশের সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন। পেছনে তাকালে দেখা যাবে, ২০০০ সালের দিকে ইরাক ও আফগানিস্তান আমেরিকার সৈন্যে ছেয়ে যায়। তখন দেশ-বিদেশে আওয়াজ ওঠে, কখন এসব সৈন্য প্রত্যাহার করা হবে? সৈন্য প্রত্যাহারের সময় বেঁধে দেয়ার জন্য বিভিন্ন মহল চাপ দিতে থাকে। তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ কিংবা ওবামা কেউ এ কাজটি করেননি বা করতে পারেননি। চতুর বুশ আফগানিস্তান প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘আমাদের সৈন্যরা সপ্তাহ খানেকের বেশি থাকবে না।’ সপ্তাহ খানেক ১৯ বছরে পড়ল। আমেরিকার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ। ওবামা বিন লাদেনকে ধরে নেয়ার পর উল্লসিত হয়ে ওবামা বলেছিলেন, ‘বিশ্ব দেখুক আমরাই শ্রেষ্ঠ।’ আর এখন ট্রাম্প বলছেন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’।

ঘোষণা দেয়া হয়েছে ‘আইএস পরাজিত হয়েছে।’ তাই আমেরিকার দুই হাজার সৈন্য সিরিয়া থেকে ঘরে ফিরে যাবে। এতে ঘরে বাইরে সবাই চমকিত হয়েছেন; অনেকে পুলক অনুভব করেছেন। কিন্তু পরাজয়ের ধরন অনেক, আইএস পরাজিত হয়ে নিঃশেষ হয়েছে, পরাজিত হয়ে বশ্যতা স্বীকার করেছে, পরাজিত হয়ে পলায়ন করেছে, এক যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে কিন্তু আবার অস্ত্র ধরতে পারে, এর কোনটি? তা এখনো স্পষ্ট নয়, অথচ এই মার্চ মাসে সিরিয়ায় আমেরিকা ও কুর্দি সৈন্যদের সাথে আইএসের প্রচণ্ড সংঘর্ষ চলছে। আইএসরা ময়দান ছাড়লেও আত্মঘাতী হামলায় বিদেশী সৈন্যদের মৃত্যুর খবর আসছে।

যুদ্ধ কৌশলীরা বলছেন, সিরিয়ায় আমেরিকার সেনা মোতায়েনের আইনগত ভিত্তি ছিল না। আইনগত কাঠামোয় ফেলার জন্য আইএস সমস্যাকে দাঁড় করানো হয়েছে বলে অনেক পণ্ডিত মনে করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সিরিয়ায় ইরানি অবস্থানে হামলা এবং আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অনেককে বিস্মিতও করেছে। মাত্র দুই হাজার মার্কিন সৈন্য আইএস দমনের জন্য বিক্ষুব্ধ ও সঙ্ঘাতপূর্ণ এলাকায় মোতায়েন করা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন রেখেছেন। দশকের পর দশক ইরান ও সিরিয়া একসাথে কাজ করছে। সিরিয়া ও ইরাক কুর্দিদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরুদ্ধে কাজ করছে। তুরস্কও অনেক অঞ্চল দখল করে উদ্বাস্তুদের ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা করছে। এমন জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমেরিকার শুধু কুর্দিদের স্বার্থ রক্ষার কাজ পরিস্থিতিকে আরো অনেক জটিল করেছে বৈ কি।

কুর্দিদের ওয়াইপিজি ঘাঁটিতে তুরস্কের সম্ভাব্য হামলায় বিরাট ক্ষয়ক্ষতির কারণও ট্রাম্পকে সৈন্য প্রত্যাহারে প্রভাবিত করতে পারে। মূলত আমেরিকার সেনা সংখ্যা এত কম যে, ‘গ্রাউন্ডে’ কোনো পরিবর্তন আনতে সক্ষম নয়। তা অনেক আগে প্রমাণিত হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কোনো অবস্থানকে লক্ষ্য করে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য এই সংখ্যা কম নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমেরিকার সবুজ সঙ্কেত না থাকলে উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় ওয়াইপিজি ঘাঁটিতে তুরস্কের হামলা, মোটেই সহজ হবে না, বর্তমান অবস্থায় আমেরিকা কোনোদিনই তুরস্ককে ওয়াইপিজি আক্রমণ করতে দিবে বলে মনে হয় না।

যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারে ইসরাইল আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। সেনা প্রত্যাহার করার ঘোষণার পরপর ইসরাইলি আক্রমণ আরো জোরদার করা হয়েছে, তা থেকে যেকোনো সময় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। আমেরিকার ‘নিউকন’রাও চায় সিরিয়ার মাটিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ হোক; তখন ইসরাইল পুরো কাভারেজ দেবে। প্রত্যাশিত ইরান যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের জন্য নেতানিয়াহু অনেক চেষ্টা করে আসছেন। সম্মিলিত বাহিনীর আরো এক মুনাফেকির আশঙ্কায় রয়েছে কুর্দিরাও। ইরাকি বাহিনী কিরকুক দখল করে সেই বার্তাই দিয়েছে।

বাস্তবে কুর্দিরা আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কম কোণঠাসা হয়নি। তারা সিরিয়া ত্যাগ করে অন্য কোনো নিরাপদ স্থানে সরে যেতে চায়। যেমন, গত জানুয়ারিতে হাজিন শহরের পতন হয়েছে। এখানে আইএস ও জিহাদিরা অবস্থান করত। হাজিনে পরাজিত হলেও অন্য শহরে আইএস সক্রিয় এবং স্থানীয় অনেকের সহায়তাও পেয়ে আসছে। খণ্ড খণ্ড বিদ্রোহী দল ও জিহাদিরা যেদিকে সুবিধা পায় সেদিকে যোগদান করছে। বলা চলে বহু আইএস পরাজিত বা অপরাজিত অবস্থায় সিরিয়ার মাটিতে রয়ে গেছে। জার্মানভিত্তিক থিংক-ট্যাংক গ্লোবাল পাবলিক পলিসি ইনস্টিটিউট জানায়, আইএস ছয়টি রাসায়নিক হামলা চালিয়েছে। সিরিয়ার বাসার সরকারের গোপন আস্তানা থেকে তারা রাসায়নিক অস্ত্র নিতে সক্ষম হয়েছিল।

ফেব্রুয়ারি ও চলতি মার্চের প্রচণ্ড যুদ্ধের পর মনে করা হচ্ছে, আইএস চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়েছে এটা বলার সময় এখনো আসেনি। যেকোনো স্থানে আইএস আবার সদস্য রিক্রুট বা পুনঃরিক্রুট করার শক্তি রাখে। তাদের ইন্টারনেটে তথ্য প্রকাশ, হামলা ও পশ্চিমা সৈন্যদের মৃত্যুদণ্ড ও শিরশ্ছেদ, ছবি প্রকাশ, ভিডিও এবং অডিও বার্তা, ঘাঁটি আক্রমণ এসব ঘটনা প্রতিনিয়ত প্রমাণ করে যে, আইএস নিজস্ব কৌশল নিয়ে বৃহৎ শক্তির সাথে যুদ্ধ করে আসছে। আইএসের বড় সমস্যা, তাদের নিজস্ব যুদ্ধ বিমান ও বিমানঘাঁটি নেই। তারপরও আইএস দীর্ঘদিন ইরাক ও সিরিয়ায় ঘাঁটি স্থাপন করে আছে। দল উপদল সৃষ্টি, ভাঙন ও পুনঃগঠন প্রক্রিয়া শেষ করে আইএস সুদৃঢ় হয়ে উঠছে। আলকায়েদার অনেক সদস্য আইএসে যোগদান করেছে। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখের আগে ওয়াশিংটনের তালিকায় আলকায়দা ছিল শীর্ষে। বিল ক্লিনটনকে এখনো সমালোচনা করা হয় ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করতে বা ধরতে ব্যর্থ মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে।

ওয়াশিংটনের ‘ওয়ার টেবিল’ মনে করে- আইএস পরাজিত হয়নি। এক হিসাবে জানা যায় সিরিয়ায় যুদ্ধরত ১৫ হাজার আইএস রয়েছে। এটাও সত্য, সিরিয়ায় আইএস ইতোমধ্যে তাদের দখলকৃত ও প্রভাবিত ৯৫ শতাংশ এলাকা হারিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন আক্রমণ জোরালো করেছে। অনেক শীর্ষ নেতা এখন আইএস পরিচালনা করছে, এরমধ্যে আবু বকর আল বাগদাদী উল্লেখযোগ্য।

অনলাইনে আইএসের উপস্থিতি বেশ লক্ষণীয়। অবস্থা দেখে মনে হয়, মিডিয়াকে আইএস অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। আরো একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো, সিরিয়া ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সে বহু কুর্দি রয়েছে। তবে তাদের পক্ষে বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে প্রভাবিত রাখা সম্ভব নয়। তাই পুরোপুরি আইএস ধ্বংস করা অসম্ভব বিষয়। আইএস কারা এবং কিভাবে সহায়তা পায় এসব তথ্য একত্রিত করলে দেখা যাবে- আইএস নিশ্চিহ্ন করা দুঃসাধ্য। তা ছাড়া ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নেভি সিল’ পাকিস্তানের অ্যাবাটাবাদে বিন লাদেনকে হত্যা করার পর দলের সেকেন্ড ইন কমান্ড আইমান আল জাওয়াহেরী হাল ধরেছেন। পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে এখনো হাজার খানেক আলকায়দা সক্রিয় রয়েছে। আইএস সমর্থিত অনেক দল-উপদল বিভিন্ন স্থানে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। যেমন- মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু দেশে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, লিবিয়ার বিভিন্ন গোষ্ঠী, নাইজেরিয়ার বোকো হারাম ও সোমালিয়ার আল শাবাব এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

আইএস সদস্যরা এমন এক রাষ্ট্রের চিন্তা করে যেখানে ‘খেলাফত’ প্রতিষ্ঠিত হবে। সিরিয়া থেকে ইরাক পর্যন্ত বিস্তীর্ণ জায়গায় এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করার ধারণা আইএসের। অনেকেই এই ধারণাকে সমর্থন দিচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তরুণ-তরুণীরা আইএসের পক্ষে যুদ্ধের জন্য দেশান্তরিত হয়েছে। শুধু ইরাক ও সিরিয়া নয়, এই ধারণাকে অনেক দেশের কিছু সাধারণ মানুষ পছন্দ করে। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ডাক এলে হাজার হাজার নারী-পুরুষ তাদের পতাকা তলে সমবেত হবে- এমনই মনে করছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা। এসবের সাথে ‘ইমাম মেহেদী ডকট্রিন’, খেলাফত ডকট্রিন, দাজ্জাল ও ‘দাব্বাতুল আরদ’ ডকট্রিন, ঈসা আ:-এর পুনঃআগমন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা- এসব ধর্মীয় বিষয়ও একত্রিত হয়েছে। বাইরে থেকে এসব তত্ত্ব হাস্যকর মনে হতে পারে। কিন্তু মুসলমানদের একটা জনগোষ্ঠী এসব বিশ্বাস করে। তাই আইএস বিনাশ করা জটিল হয়ে উঠতে পারে। এখানে বলে রাখা ভালো মুসলিম বিশ্ব আইএসকে সমর্থন দেয়নি। তাদের কথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও কর্মকাণ্ড ইসলাম সমর্থিত নয় বলে প্রায় সবাই মত দিয়েছেন। আইএস সদস্যরা এখন কোণঠাসা হলেও যেকোনো সময় অন্য কোনো নামে কিংবা কোনো নতুন গোষ্ঠী অনুরূপ কর্মকাণ্ডের ডাক দিতে পারে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিরিয়ায় আইএস ‘পরাজয়ে’র ঘোষণা মূলত তার জনগণের সাথে এক ধরনের চালাকি এবং বাস্তবতার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ বলেও অনেকে মনে করেন। আগামী ভোটযুদ্ধে জনমত তার পক্ষে আনার একটি চাল মনে করছেন অনেকে। আইএসকে যুদ্ধ দিয়ে পরাজয় করা সহজ হবে না। এর কিছু উদাহরণও দেয়া যায়, ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী সুদানে ওসামা বিন লাদেন পরিচালিত আলকায়েদা ক্যাম্পে বোমা হামলা চালায়। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা আফগানিস্তানে হামলা করে আলকায়দা উৎখাতের জন্য। তখনো ঘোষণা দেয়া হয়েছিল আলকায়েদা শেষ হয়েছে। এরপর ২০০৩ সালে ইরাকেও সব কিছু তছনছ করে দেয়া হয়। তখন আবু মুসাব আল জারকাভির উদয় হয়, তিনি আলকায়েদার চেয়েও ভয়ঙ্কর হামলা চালাতে থাকেন।

তদুপরি যুক্তরাষ্ট্র ‘চরমপন্থী’ দমনের নামে অনেক আইন বানিয়েছে, যুদ্ধ করেছে, কিন্তু পুরোপুরি সফল হতে পারেনি। সুদানে আলকায়েদার ওপর বোমাবর্ষণ সফল হলে ৯/১১ আক্রমণ হতো না। আফগানিস্তানে অবরোধ সফল হলে বা মার্কিন সেনারা বিজয়ী হলে ইরাকে জারকাভির আবির্ভাব হতো না। ইরাকে আমেরিকা চরমপন্থীদের নির্মূল করতে পারলে ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস জন্ম নিত না। তাই বলা চলে, ‘চরমপন্থী’ ও ‘সন্ত্রাসী’দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে মূলত কাক্সিক্ষত বিজয় অর্জিত হয়নি। তবে মুসলমানদেরএকটা বড় অংশের জান, মাল, সভ্যতা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ ধ্বংস হয়েছে, কিছু নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ধ্বংস হয়েছে সাধারণ মানুষের সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। তাহলে আমরা কি ধরে নেব- এ ক্ষতির জন্যই এসব যুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে ও হয়েছে? তাহলে মুসলিম বিশ্বের নেতারা জনসাধারণের স্বার্থ রক্ষার জন্য কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?

সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো নিয়মিত সেনাবাহিনী নয়, তার অংশও নয়। ওয়াশিংটন কোনো রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ করলে সহজে জয়লাভ করতে পারে। সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্যরা বেপরোয়া, আত্মঘাতী, হতাশাগ্রস্ত, ভুল আদর্শের অনুসারী এবং ভুল আদর্শে অনুপ্রাণিত, এদের অনেকেই জীবনযুদ্ধে পরাজিত ও বঞ্চিত, জীবনের প্রতি এদের মায়া কম, তাই সব ক্ষেত্রেই এরা ভয়াবহ হতে পারে।

দেখা যায়, যেসব দেশে গণতন্ত্র সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নেই, মানবাধিকার সংহত নয় এবং মত প্রকাশের নেই স্বাধীনতা সেসব দেশের লোকজন বেশি আইএসে যোগ দিচ্ছে। অনেকে নৈরাজ্যের কারণে এসব দলে যোগদান করে। তারা মনে করে- সঙ্ঘাত বা সহিংসতার মাধ্যমে অধিকার আদায় করতে এবং লক্ষ্যে পৌঁছতে হবে। অনেকে মনে করেন, আরব বসন্তের ধ্বংসাবশেষ থেকে আইএস জন্ম নিয়েছে। অনেকে মনে করেন, সাদ্দামের পতনের পর ইরানকে ঘায়েল করার জন্য খোদ আমেরিকাই কথিত ‘খেলাফত ও শরিয়াহ’ তত্ত্ব ইরাকি সৈন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে সহায়তা করেছে। আমেরিকার ওভাল অফিসের কর্মকর্তারা মুসলমানদের ‘খেলাফত’ ও শরিয়াহ আইন’ প্রতিষ্ঠা করাকে ভয় পায়। তাই এসব বন্ধ করার জন্য সিআইএ এবং পেন্টাগণের অনেক কর্মসূচি রয়েছে। ‘লিবারেল মুসলমান’, ‘মধ্যপন্থী মুসলমান’ এসব তত্ত্বও অধুনা বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে।

বোমা, মিসাইল এবং গুলি দিয়ে কিছু আইএস হত্যা করা গেলেও, তাদের চিন্তাধারাকে শেষ করা কার্যত সম্ভব নয়। ওয়াশিংটনসহ পাশ্চাত্য যদি আইএস মুছে দিতে চায়, তবে যেন অত্যাচারী যেসব শাসকদের সমর্থন ও সহায়তা না দিয়ে বরং সার্বজনীন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা প্রদান করে। আইএস যদি একটি দল হয়, তাকে পরাজিত করা সহজ। তবে যদি একটি মতবাদ হয় তাকে পরাজিত করা সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আইএসের নারী-পুরুষদের মন ও মগজের সাথে যুদ্ধ করতে হবে নতুবা অন্য কোনো সময় অন্য কোনো নামে সাইরেন বেজে উঠবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সার্বিক স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, প্রকৃত গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং স্বচ্ছ নির্বাচন প্রতিষ্ঠিত হলে নাশকতা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম দূর হয়ে যাবে। তখন অস্ত্র নিয়ে যারা কথা বলে তারা সমর্থনহীন এবং নিঃসঙ্গ হয়ে পড়বে। সমাজের তরুণদের সুপথ প্রাপ্তির জন্য এমন বাস্তবতা নির্মাণ করা এখন বড় প্রয়োজন।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব, বাংলাদেশ সরকার ও গ্রন্থকার


আরো সংবাদ




bedava internet