২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকত্ব কি কেনা যায়?

ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকত্ব কি কেনা যায়? - ছবি : সংগৃহীত

ইউরোপীয় ইউনিয়নের যেসব দেশে অর্থের বিনিময়ে নাগরিকত্ব পাওয়া যায় সেসব দেশের নাগরিকত্ব প্রদানের কর্মসূচি খতিয়ে দেখছে ইউরোপীয় কমিশন। এই কর্মসূচিতে দুর্নীতি, কর ফাঁকি এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে ঝুঁকি তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপটে তারা এই ঘোষণা দিয়েছে।

আসলেই কি তাই? ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকত্ব নেয়া কতোটা সহজ?

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৮টি সদস্য দেশের যেকোনো একটি দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণের মাধ্যমে আপনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিক হয়ে উঠতে পারেন।

নাগরিকত্ব দেয়ার বিষয়ে ই ইউর প্রত্যেকটি দেশেরই আছে আলাদা আলাদা নিয়ম, শর্ত ও আইন কানুন।

কোনো কোনো দেশ আছে যেসব দেশের সরকার তাদের দেশে বড় ধরনের অর্থ বিনিয়োগের বিনিময়ে লোকজনকে নাগরিকত্ব দিয়ে থাকে।

সরকারি বন্ড, স্থাবর সম্পত্তি কিংবা অন্য কোনো ধরনের আর্থিক বিনিয়োগের মাধ্যমে এটা করা সম্ভব। এর সাথে হয়তো আরো কিছু শর্ত থাকতে পারে- যেমন ওই দেশে বসবাসের আইনি অধিকার।

এসব দেশের মধ্যে মাল্টা, সাইপ্রাস ও বুলগেরিয়াতে এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে নাগরিকত্ব দেয়া হয়ে থাকে।

মাল্টায় নাগরিকত্ব প্রার্থনা করে কেউ যদি আবেদন করে থাকেন, দেশটির জাতীয় উন্নয়ন তহবিলে তাকে সাড়ে ছয় লাখ ইউরো জমা দিতে হবে। এছাড়াও আরো দেড় লাখ ইউরো দিয়ে কিনতে হবে মাল্টার সরকারি বন্ড কিংবা স্টক। এবং আরো সাড়ে তিন লাখ ইউরোর সমপরিমাণ অর্থের স্থাবর সম্পত্তি অর্থাৎ বাড়িঘর কিংবা জমিজমা কিনতে হবে। অর্থাৎ মাল্টার নাগরিকত্ব কেনা যাবে মোট সাড়ে ১১ লাখ ইউরো খরচ করে।

পাশাপাশি আছে আরো কিছু শর্ত। আপনাকে অন্তত ১২ মাসের জন্যে ওই দেশের বাসিন্দা হতে হবে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ২০১৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৩৮৬ জন ব্যক্তি এই কর্মসূচির আওতায় মাল্টার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন।

মাল্টার সরকার বলছে, এই সময়কালে তারা নাগরিকত্ব কর্মসূচির মাধ্যমে ৪০ কোটি ইউরো সংগ্রহ করতে পেরেছে। এটা মাল্টার মোট জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশের সমান।

তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশিরভাগ দেশেই এ রকম বিনিয়োগের মাধ্যমে সরাসরি নাগরিকত্ব গ্রহণের কর্মসূচি নেই।

তবে বহু দেশের সরকার তাদের দেশে অর্থ বিনিয়োগের জবাবে বসবাসের সুযোগ দিয়ে থাকে।

যেমন ধরা যাক ব্রিটেনের কথা। সেখানে কেউ যদি অন্তত ২০ লাখ পাউন্ড বিনিয়োগ করেন তাহলে তাকে ইনভেস্টর ভিসা দেওয়া হয়।

কয়েক বছর বসবাস করার পর তিনি এ দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের অধিকার চেয়ে আবেদন করতে পারেন। যুক্তরাজ্যে ২০১৭ সালে এরকম ৩৫৫ জন বিনিয়োগকারীকে ইনভেস্টর ভিসা দেয়া হয়েছে।

সেবছর যুক্তরাজ্য কাজের জন্যে যতো ভিসা দিয়েছিল এই ইনভেস্টর ভিসা ছিল তার শূন্য দশমিক তিন শতাংশ।

সুতরাং যেটা পরিষ্কার সেটা হলো: বড় ধরনের অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশের নাগরিকত্ব পাওয়া সম্ভব। তবে এর সাথে হয়তো আরো কিছু শর্ত থাকতে পারে।

তবে পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, খুবই অল্প কিছু সংখ্যক মানুষ এধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে।

আরো পড়ুন :

জার্মানিতে বিদেশি বিদ্বেষ, দাঙ্গার পরিস্থিতি সৃষ্টি
সিএনএন

কয়েকদিন ধরেই অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভ চলছেই জার্মানিতে। কয়েকশত অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভকারী বৃহস্পতিবার বিকালে কেমনিৎস এ জাতীয়তাবাদী র‌্যালিতে অংশ নেন। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাথে স্থানীয় কর্মকর্তাদের আলোচনাস্থলের কাছাকাছি রাস্তাতেই সমবেত হয়েছিলেন তারা। চলতি সপ্তাহের শুরুতে পূর্ব জার্মান সিটিতে সংঘটিত হিংসাত্মক হামলার পরই অভিবাসনবিরোধী চেতনা ছড়িয়ে পড়েছে। বামপন্থি রাজনৈতিক দল ‘ডি লিংকে' কেমনিৎস শহরে বিদেশি বিদ্বেষের বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠেছে৷ তবে চরম ডানপন্থি এএফডি দল জনতার এমন তাণ্ডবের প্রতি প্রচ্ছন্ন সমর্থন জানিয়ে বলেছে, রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হলে মানুষই এভাবে পথে নেমে আত্মরক্ষা করবে৷ 

জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কেমনিৎসে উগ্র ডানপন্থী বিক্ষোভকারীদের সাথে বামদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ছুরিকাঘাতে এক জার্মানি নিহত হওয়ার ঘটনায় এক ইরাকি ও সিরিয়ান নাগরিককে আটক করার পর সোমবার অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভে এ সংঘর্ষ হয়েছে।পুলিশ বলছে, দুপক্ষ থেকেই পটকা ছুড়ে মারার পর কয়েকজন আহত হন। পরে তাদের থামাতে পুলিশ জলকামান নিয়ে আসে। অভিবাসীদের পক্ষে ও বিপক্ষে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসার পর সবাইকে শান্ত থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় কর্মকর্তারা।


রবিবার ভোরে জার্মানির কেমনিৎস শহরে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে এক সিরীয় ও এক ইরানীর ছুরিকাঘাতে ৩৫ বছরের জার্মান-কিউবান নাগরিক ডানিয়েল এইচ. প্রাণ হারান। পুলিশ বলছে, বিভিন্ন দেশের প্রায় ১০ জন মানুষ এই বিবাদে জড়িত ছিলেন৷ এই হামলার প্রতিবাদে বাল্টিক তীরবর্তী শহরটিতে বিদেশিদের বিরুদ্ধে ডানপন্থীরা বিক্ষোভ করে আসছে। যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ ছাড়াই ডানিয়েলকে কয়েকবার ছুরিকাঘাত করে হত্যা করার অভিযোগে ২২ বছর বয়সি এক ইরাকি ও ২৩ বছর বয়সি এক সিরীয় নাগরিককে আটক করা হয়েছে।

ডানিয়েল এইচ. স্থানীয় কয়েকটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সাথে জড়িত ছিলেন৷ ফলে তাঁর মৃত্যুর প্রতিবাদে রবিবার বিকালে প্রায় ৮০০ মানুষ জড়ো হয়েছিলেন৷ এদের মধ্যে চরম ডানপন্থিরাও ছিলেন৷ বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে বোতল ছোড়েন এবং তাঁরা পুলিশের কাজে সহযোগিতা করেননি বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে৷ পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত পুলিশ ডেকে আনা হয়৷ এই সময় বিক্ষোভকারীরা পথেঘাটে বিদেশিদের উপর নির্বিচারে হামলাও চালায়৷

সোমবারও বিক্ষোভ ও প্রতিবাদে কেমনিৎস শহর উত্তপ্ত ছিল৷ সন্ধ্যার সময় প্রায় ২,০০০ চরম দক্ষিণপন্থি বিক্ষোভে নামেন৷ আর বিদেশিদের ওপর হামলার প্রতিবাদে কাল মার্কসের বিশাল মূর্তির কাছে মাঠে নামেন প্রায় ১,০০০ মানুষ, যাদের মধ্যে বামপন্থিরাও ছিলেন৷ চরম ডানপন্থি ও বামপন্থিদের মধ্যে সংঘর্ষে কমপক্ষে ৬ জন আহত হন৷ দুই পক্ষ একে অপরের উপর আতসবাজিসহ নানা বস্তু নিক্ষেপ করে৷ ৪ জন চরম ডানপন্থি বিক্ষোভকারীর উপর হামলার ঘটনাও ঘটে৷ কেমনিৎসের কট্টর বামপন্থী পার্টির প্রধান টিম ডেটসনার বলেন, যাদেরই বিদেশি মনে হচ্ছে, লোকজন তাদের পেছনেই ছুটছে, এ দৃশ্যে আমরা শঙ্কিত। জার্মান ও বাভারিয়ান পতাকা দোলাতে দোলাতে জমায়েত হওয়াদের অনেকে স্লোগান তোলেন- আমরাই অধিবাসী, এ স্লোগানটি কট্টর ডানপন্থীরা ব্যবহার করে থাকেন।

এর জের ধরে বুধবার সন্ধ্যায় ২০ বছর বয়সী সিরিয়ান ১ ব্যক্তি একাকি বাড়ি ফেরার পথে ৩ জার্মানভাষী তার ওপর অকারণে হামলে পড়ে। তারা তার গতি রোধ করে, তাকে গালিগালাজ করে, অপমান করে, লাথি মারে ও গলা ধাক্কা দেয়। তাদের দুইজন তার মুখে এবং অপর একজন তার ঘাড় ও পাঁজরে লোহার চেইন দিয়ে আঘাত করে। মেরে মাটিতে ফেলে দেয়া দেয়া পর্যন্ত তারা তাকে পেটাতে থাকে। এরপর হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। আঘাতে তার নাকের হাড় ভেঙে গেছে এবং মুখমন্ড ও শরীরের উপরের অংশ ফুলে গেছে। ঘৃণাজনিত এ আক্রমণের ব্যাপারে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।

এক জার্মান-কিউবান নাগরিকের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে জার্মানির কেমনিৎস শহরে বিদেশিদের উপর হামলার ঘটনায় জার্মান প্রেসিডেন্ট ও চ্যান্সেলরসহ অনেক নেতা নিন্দা জানিয়েছেন৷ জার্মান চ্যান্সেলর বলেন, দেশে আইন-শৃঙ্খলার ভিত্তিতে যে শাসনব্যবস্থা রয়েছে, তার সাথে এমন আচরণ খাপ খায় না৷ প্রেসিডেন্ট ফ্রাংক ভাল্টার স্টাইনমায়ার বলেন, ছুরিকাঘাতের ঘটনার ফায়দা তুলে বিদেশি বিদ্বেষ ও হিংসা ছড়ানো হয়েছে৷ সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, জনতা ভিন্ন চেহারার মানুষকে বাছাই করে হামলা চালাবে, এমন আচরণ বরদাস্ত করা হবে না৷

জার্মানীর উত্তরাঞ্চলীয় উইসমার শহরে অভিবাসন প্রত্যাশীর ওপর এমন বর্ণবাদী ও বিদ্বেষমূলক হামলা নিয়ে বেশ আলোড়ন তৈরি হয়েছে। বিদেশিদের বিরুদ্ধে দেশটির কট্টর ডানপন্থীদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। অভিবাসী প্রত্যাশীর ওপর হামলায় উত্তাল হয়ে উঠেছে জার্মানি।

কেমনিৎস এর মেয়র বারবারা লুডউইগ কেমনিৎস স্টেডিয়ামে বক্তব্য রাখেন। প্রায় ৬০০ জনের মতো উপস্থিতি ছিল। লুডউইগ বলেন, হিংসাত্মক ও আক্রমণাত্মক হামলার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়াটা কর্তৃপক্ষের জন্য খুবই কঠিন ছিল। একজন স্থানীয়কে হত্যার প্রতিবাদে ক্ষোভ! ভালো! এটিই তোমাদের কাজ! একজন নীরবে ছুরিকাঘাতে মারা হয়েছে! তবে খুনিরা শহর ছাড়তে পারেনি।

স্যাক্সনি রাজ্যে গত সেপ্টেমরে অনুষ্ঠিত ফেডারেল নির্বাচনে ২৫ ভাগের বেশি ভোট পেয়েছে অভিবাসন বিরোধী ও ইসলাম বিরোধীদের প্লাটফর্ম ফার-রাইট অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি পার্টি (এএফডি), যা জাতীয় গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। এই এএফডি পোস্টার ও ব্যানার নিয়ে র‌্যালি করেছে। শরণার্থী ও অভিবাসীদের বিরোধী জনমত গঠনে কাজ করছে।

এদিকে জার্মানির ফেডারেল সরকার কেমনিৎস শহরে অভিবাসীদের উপর হামলার তীব্র নিন্দা করেছে৷ এক সরকারি মুখপাত্র বলেন, কেমনিৎস শহরের কিছু অংশে রবিবার যা ঘটেছে এবং ভিডিওতে যা রেকর্ড করা হয়েছে, সংবিধানভিত্তিক রাষ্ট্রে তার কোনো স্থান নেই৷ জনতা ভিন্ন চেহারা বা ভিন্ন ঐতিহ্যের মানুষকে বাছাই করে তাদের উপর হামলা চালাবে এবং রাজপথে ঘৃণা ছড়াবে, এমন আচরণ বরদাস্ত করা হবে না৷ জার্মানির শহরগুলিতে এমন আচরণের কোনো স্থান নেই৷

ভুয়া খবর ছড়িয়ে কেমনিৎসে দাঙ্গার পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে স্যাক্সোনি রাজ্য প্রশাসন৷ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, শুধু স্থানীয়রা নয়, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া খবর ছড়িয়ে অনেক রাজ্য থেকে সমমনস্ক মানুষকে কেমনিৎসে আকর্ষণ করা হয়েছে৷ নিহত ডানিয়েল এইচ. এক নারীর সম্মানরক্ষার জন্য হস্তক্ষেপ করেছিলেন বলে ভুয়া খবর ছড়ানো হয়েছে বলে পুলিশ দাবি করছে৷


আরো সংবাদ