২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হেলসিংকিতে ট্রাম্প-পুতিনের প্রথম শীর্ষ বৈঠক

৩ সেকেন্ডের করমর্দনের পর ১ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠকে যা হলো

করমর্দনরত ট্রাম্প ও পুতিন। - এএফপি

ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকিতে গতকাল সোমবার প্রথমবারের মতো মুখোমুখি বৈঠক করেছেন বিশ্বের প্রভাবশালী দুই নেতা যুক্তরাষ্ট্র্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। পূর্বনির্ধারিত সময়ের কিছুক্ষণ পরে বৈঠক শুরু হয়। দুই নেতা প্রথমে অন্তত এক ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। শুরুতে করমর্দন করেন তারা; তবে তাদের এই করমর্দন স্থায়ী ছিল মাত্র তিন সেকেন্ড। বিবিসি, সিএনএন, গার্ডিয়ান।

পুতিনের সাথে প্রথম সাক্ষাতেই সফলভাবে বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের জন্য তাকে অভিনন্দন জানান ট্রাম্প। এটি সেরা আয়োজনগুলোর অন্যতম ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। এরপর বৈঠকের শুরুতে রাশিয়ার সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলার আশা প্রকাশ করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে (যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া) সম্পর্ক খুব বেশি ভালো নয়। যদিও গত দুই বছর ধরে সম্পর্কের দূরত্ব কমছে। রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের উন্নতি হলে সেটি ভালো হবে, এটি খারাপ কিছু না।’

মার্কিন এই প্রেসিডেন্ট বলেন, আমাদের একসাথে কাজ করার বড় সুযোগ রয়েছে, আমরা অনেক বছর ধরে একসাথে হতে পারিনি। আমরা একসাথে পথ চলি সেটি দেখতে চায় বিশ্ব। আমাদের কাছে বিশ্বের ৯০ শতাংশ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, এটি ভালো নয়।

বৈঠক শুরুর এক ঘণ্টা আগে স্থানীয় সময় বেলা ১টা ৫৭ মিনিটে হেলসিংকির প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে পৌঁছান পুতিন।
বৈঠকে বসার আগে রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের খারাপ সম্পর্কের জন্য ওয়াশিংটনের ওপর দায় চাপিয়ে দেন ট্রাম্প।
টুইটারে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বোকামি এবং নির্বুদ্ধিতার কারণে বর্তমানে রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে।

ট্রাম্প আগেই জানিয়েছিলেন বৈঠকে তারা বাণিজ্য, সেনাবাহিনী এমনকি চীনের আধিপত্য বিস্তার নিয়েও আলোচনা করবেন। নিজেদের পরমাণু অস্ত্রের বিষয়েও তারা একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

অন্য দিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, ‘ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিতে আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে পেরে আমি আনন্দিত। যদিও আমাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ আছে... আমরা ফোনে কথা বলেছি এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে আমাদের বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে। তবে অবশ্যই নিজেদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত কথা বলার এবং বিশ্বের সমস্যাপূর্ণ অনেকগুলো এলাকা নিয়ে আলোচনার এটিই সময়।’

সোমবার স্থানীয় সময় দুপুরে হেলসিংকিতে দুই রাষ্ট্রনেতা বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠকে বসেন। শুরুতে করমর্দন করেন তারা; তবে তাদের এই করমর্দন স্থায়ী ছিল মাত্র তিন সেকেন্ড। তিন সেকেন্ডের করমর্দনে দুই প্রেসিডেন্টকে চিন্তিত দেখায়। এমনকি তাদের মুখে হাসিও দেখা যায়নি।

পূর্বনির্ধারিত সময়ের কিছুক্ষণ পরে ট্রাম্প-পুতিন বৈঠক শুরু হয়। পরিকল্পিত সূচি অনুযায়ী, দুই নেতা প্রথমে অন্তত এক ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এই সময়ে দুইজন দোভাষী ছাড়া অন্য কেউ তাদের সাথে ছিলেন না। তারপর দুই নেতা একসাথে দুপুরের খাবার খান। অন্য কূটনীতিকেরা তাদের সাথে ভোজে যোগ দেন। তাদের এই রুদ্ধদ্বার বৈঠক নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। হোয়াইট হাউজ বলছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি প্রত্যক্ষ বৈঠক চান; যেখানে অন্য কারো হস্তক্ষেপ অথবা কোনো তথ্য ফাঁস হবে না। এমনকি ওই বৈঠকের আলোচনাও রেকর্ড থাকবে না।

ট্রাম্প-পুতিনের বৈঠক নিয়ে আলোচনা শুরুর পর কয়েক মাস আগেই হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা রুশ প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের কাছে দুই প্রেসিডেন্টের রুদ্ধদ্বার বৈঠক আয়োজনের আহ্বান জানান। কিন্তু কেন এই রুদ্ধদ্বার বৈঠক? এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন মার্কিন এক কর্মকর্তা। এ জন্য তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
১. পুতিনকে ব্যক্তিগতভাবে মূল্যায়নের জন্য একক সময় চেয়েছেন ট্রাম্প। নেতা থেকে নেতার মাঝে সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যেই তিনি এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসার আগ্রহ দেখিয়েছেন।
২. অতীতে বিশ্ব নেতাদের সাথে বৈঠকে আলোচিত বিষয়বস্তু ফাঁস হয়ে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু এবার তিনি তার সহযোগীদের বলেছেন, পুতিনের সাথে বৈঠকের স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁস হয়ে যাক সেটি চান না তিনি।
৩. রাশিয়াকে কঠোর দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হোক ট্রাম্প এমন সহযোগীদের চান না। এমনকি পুতিনের সাথে আলোচনায় হস্তক্ষেপ অথবা বাধার সৃষ্টি করা হোক সেটিও চান না। যে কারণে তিনি রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেছেন।

২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগে ট্রাম্প-পুতিনের এই বৈঠককে বিতর্কিত হিসেবে দেখছেন অনেক মার্কিন। নির্বাচনে ট্রাম্পকে জেতাতে রাশিয়া কাজ করেছে বলে অভিযোগ আছে। তবে এই অভিযোগের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র তদন্ত করছে।
ওই বছরের নভেম্বরে নির্বাচনের আগে দেশটির বর্তমান বিরোধীদল ডেমোক্র্যাটের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার ইমেইল হ্যাকিংয়ের সাথে ১২ রুশ নাগরিক জড়িত বলে শুক্রবার মার্কিন তদন্ত কর্মকর্তারা ঘোষণা দিয়েছেন। রুশ নাগিরকদের হ্যাকিংয়ে জড়িত থাকার তথ্য প্রকাশের পরও কেন পুতিনের সাথে বৈঠকে বসছেন ট্রাম্প সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বৈঠক শুরুর আড়াই ঘণ্টা পর সংবাদ সম্মেলন হয় এবং সেখান থেকে ট্রাম্প হেলসিংকি বিমানবন্দরে চলে যান।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ শীর্ষ বৈঠক নিয়ে নিজ দেশে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, অন্য দিকে এ বৈঠক রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের জন্য একটি রাজনৈতিক বিজয়।


আরো সংবাদ