২৩ জুন ২০১৮

তাতারস্তান : আবার জেগে উঠছে চেঙ্গিস খানের উত্তরসূরিরা

তাতারস্তানের রাজধানী কাজানের বিখ্যাত কুল শরিফ মসজিদ  - ছবি : সংগৃহীত

রাশিয়ান ফেডারেশনের একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশের নাম তাতারস্তান প্রজাতন্ত্র। তাতারস্তানের রাজধানীর নাম কাজান। বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাশিয়ান ফেডারেশনের এই অঞ্চলটি যেন প্রতিদিনই সফলতার উজ্জ্বল ছাপ রেখে চলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান সফলভাবে আয়োজনের ক্ষেত্রে স্বাগতিক হিসেবে তাতারস্তান অত্যন্ত সফলতার পরিচয় দিয়েছে এবং পাশাপাশি নিজেদের আর্থসামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে।

গত মাসেই রাশিয়া ও মুসলিম দেশগুলোর অংশগ্রহণে তাতারস্তানের রাজধানী কাজানে অনুষ্ঠিত হয় ‘কাজান শীর্ষ সম্মেলন ২০১৮’। রাশিয়া ও মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বৃদ্ধির উপায় খুঁজে বের করা ছিল এই সম্মেলনের প্রধান লক্ষ্য। সম্মেলনে তাতারস্তানের প্রেসিডেন্ট রুস্তম মিনিখানোভের পাশাপাশি ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)’র মহাসচিব ইউসুফ বিন আহমাদ আল-ওছাইমিন এবং ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি)’র ভাইস প্রেসিডেন্ট জমির ইকবালের মতো ব্যক্তিত্বরাও উপস্থিত ছিলেন। রাশিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপের কয়েকটি ম্যাচ এখানে অনুষ্ঠিত হবে এবং এই মহা-আয়োজনে ফুটবলপ্রেমীদের স্বাগত জানাতে কাজান পুরোপুরি প্রস্তুত। এই ধরনের বৃহৎ অনুষ্ঠানের আয়োজন করার পাশাপাশি বিশাল সংখ্যক পর্যটকের আগমন কাজান শহরের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে।
বর্তমান রাশিয়ান ফেডারেশনের ২১টি প্রজাতন্ত্রের মধ্যে তাতারস্তান একটি। এর আয়তন প্রায় ৬৮ হাজার বর্গকিলোমিটার। রাশিয়ান ফেডারেশনগুলোর মধ্যে জনসংখ্যায় অষ্টম বৃহত্তম তাতারস্তানে প্রায় ৩৮ লাখ লোক বাস করে। যার মধ্যে ৫৩ ভাগেরও বেশি তাতার জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া ৩৯.৭ ভাগ রাশিয়ান, তুর্কি বংশোদ্ভূত চুবাস জনগোষ্ঠী ৩.১ ভাগ ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪ ভাগ লোক রয়েছে। প্রতি বছর ৩২ লাখ টন তেল উৎপাদন করা তাতারস্তানের রয়েছে সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক সম্পদ।

বিগত এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে ভলগা নদীর অববাহিকায় বসবাস করা তাতার জনগোষ্ঠী একসময় সমগ্র এশিয়ার মধ্যাঞ্চল শাসন করত। বলা হয়ে থাকে, মধ্য, পূর্ব, উত্তর ও পশ্চিম এশিয়ার তুর্কি ভাষাভাষী জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ৯২২ সালে তাতার জনগোষ্ঠীই প্রথম ইসলামের ছায়াতলে আসে। বর্তমান তাতার জনগোষ্ঠী ‘কিপচাক টার্ক’ নামক তুর্কি যাযাবর বংশের উত্তরসূরি এবং তারা ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মধ্য এশিয়া থেকে এই অঞ্চলে এসেছিল। সময়ের বিবর্তনে অতীত অবস্থান কিছুটা পরিবর্তন হলেও রাশিয়ান ফেডারেশনে বর্তমানে তাতারস্তানের অবস্থান প্রথম সারিতেই রয়েছে।
কাজানের আকাশের দিকে তাকিয়ে যে কেউ কল্পনার স্বপ্নিল রাজ্যে পৌঁছে যেতে পারেন। এখানকার নদী, শীতল ঝর্ণাপ্রবাহ, নয়নাভিরাম সবুজ দৃশ্য এবং ঐতিহাসিক বিভিন্ন স্থাপনা যেন মনে দুর্দমনীয় ভালো লাগার ছবি এঁকে দেয়। কাজান শহর ও শহরের বাইরের পরিচ্ছন্ন সোজা রাস্তা, ভোরের আলো ফোটার আগেই পার্কগুলোতে ক্রীড়া উদ্যমী মানুষের ভিড় ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। হেঁটে ভ্রমণ করার জন্য আদর্শ শহর কাজান। রাস্তায় কোনো যানবাহন না থাকলেও শহরের কেন্দ্র থেকে শহরের শেষ প্রান্তে হেঁটে মাত্র আধা ঘণ্টায়ই পৌঁছে যাওয়া যায়। দিনের শুরুতে বিভিন্ন পার্ক ও মাঠে ক্রীড়াদ্যোমী, সাইক্লিস্ট ও প্রাতঃভ্রমণকারী মানুষের পদচারণা থাকে লক্ষ্য করার মতো। রাতে বড় বড় পার্কে আয়োজন করা হয় ‘পানি নৃত্য প্রদর্শনী’র।

রাজধানী কাজানের একটি বিখ্যাত রাস্তার নাম ‘বাউমান স্ট্রিট’। ক্যাফে, রেস্টুরেন্ট ও বিভিন্ন দোকানে ভরপুর এই বাউমান স্ট্রিটকে কাজানের হৃৎপিণ্ড বলা হয়ে থাকে। হরেকরকম গায়ক, চিত্রশিল্পী ও বিভিন্ন কসরত প্রদর্শনকারীরা এই রাস্তাকে সবসময় উৎসবমুখর স্থানে পরিণত করে রাখে। কাজান ক্রেমলিন প্রাসাদ থেকে সূর্যাস্ত দেখা পর্যটকদের জন্য অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। বিশাল উঁচু পাহাড়ের ওপর নির্মিত কাজান ক্রেমলিন প্রাসাদ অতীতে দুর্গ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। উঁচু পাহাড়ের ওপর নির্মিত হওয়ায় এখান থেকে শহরের প্রায় সব দিকেই ভালোভাবে দেখা যায়। পাহাড়ের পাদদেশে নদী ও ওপরে ভাসমান মেঘের নৃত্য অত্যন্ত মনোরম দৃশ্যের সৃষ্টি করে।

শহরের কেন্দ্রের মতো নদীর তীর ঘেঁষে যুগে যুগে নির্মিত হওয়া বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনাও পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এসব স্থাপনার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ক্রেমলিন প্রাসাদের ভেতরে নির্মিত ‘কুল শরিফ মসজিদ’। কাজান খানেট’র ইমাম কুল শরিফের নামানুসারে এই মসজিদের নামকরণ করা হয়েছে। খ্রিষ্টানদের আক্রমণের মুখে একজন মহান নেতা হিসেবে নিজের দেশ ও জনগণকে রক্ষার সময় তিনি শহীদ হন। এই মসজিদ ইসলামি পুনর্জাগরণ ও প্রজাতন্ত্র হিসেবে তাতারস্তানের জন্মের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত। মসজিদটি ষোড়শ শতাব্দীতে প্রথম নির্মিত হলেও এর বর্তমান কাঠামো ২০০৫ সালে নির্মাণ করা হয়। মসজিদের দুটি অংশ; উপরের অংশ নামাজ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের কাজে ব্যবহার করা হয় এবং নিচের অংশ ব্যবহার করা হয় জাদুঘর হিসেবে।

২০১৮ সালে রাশিয়া ফুটবল বিশ্বকাপে যে শহরগুলোতে খেলা অনুষ্ঠিত হবে তার মধ্যে কাজান অন্যতম। পদ্মফুলের অবয়বে নির্মিত কাজানের ‘রুবিন জাতীয় ফুটবল স্টেডিয়াম’এ বসে একসাথে ৪৫ হাজার ১০৫ জন দর্শক খেলা উপভোগ করতে পারবেন। ফ্রান্স বনাম অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ ছাড়াও এখানে বেশ কয়েকটি খেলা অনুষ্ঠিত হবে, যার মধ্যে একটি কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচও রয়েছে। তা ছাড়া ২০১৩ সালের সামার ইউনিভার্সায়েড এবং ২০১৭ সালের ফিফা কনফেডারেশন্স কাপেরও স্বাগতিক শহর ছিল কাজান। 
সূত্র : আনাদোলু


আরো সংবাদ