১৪ ডিসেম্বর ২০১৮

তুরস্ক-জার্মান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার, এরদোগানকে মার্কেলের আমন্ত্রণ

তুরস্ক-জার্মান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার, এরদোগানকে মার্কেলের আমন্ত্রণ - সংগৃহীত

তুরস্কের নির্বাচনের পর জার্মানের বার্লিনে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে দেশটির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২৪ জুন তুরস্কের নির্বাচনের পর জার্মানের বার্লিনে এরদোগানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

উত্তর জার্মানির ডসেলডর্ফের সলিংগেন শহরে বর্ণবাদী অগ্নিসংযোগের ২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে ডাসেলডর্ফ সফরকালে সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতিতে তার ভাষণে তুর্কি প্রেসিডেন্টকে আমন্ত্রণ জানান।
২০১৭ সালে তুরস্ক জার্মান নাগরিকদের গ্রেফতার করেছে, বার্লিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থার হুমকি দিয়েছে, আঙ্কারার রাজনীতিকরা কথায় কথায় নাৎসিদের তুলনা দিয়েছেন৷ জার্মানি ও তুরস্কের সম্পর্ক নীচে নামে৷ ২০১৬ সালে তুরস্কে সামরিক অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবার পর পারস্পরিক সন্দেহ ও সংঘাত নিত্যনতুন সংঘাতের উর্বর ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়৷

ফেব্রুয়ারি মাসে তুর্কি-জার্মান সাংবাদিক ডেনিজ ইউচেল তুরস্কে গ্রেফতার হন৷ এরদোগান ডি ভেল্ট পত্রিকার সংবাদদাতা ইউচেলকে সন্ত্রাসবাদী ও গুপ্তচর বলে অভিহিত করেন৷ ইউচেলের বিরুদ্ধে কোনো ধরণের অভিযোগ দায়ের করা হয়নি, তা সত্ত্বেও তিনি গত ১০ মাস ধরে কারারুদ্ধ৷ বার্লিন ইউচেলের গ্রেপ্তারি ও আটককে রাজনৈতিক পণবন্দি গ্রহণের সাথে তুলনা করেছে৷

পরবর্তী সঙ্কট দেখা দেয় এপ্রিলে তুরস্কের সাংবিধানিক গণভোটের ঠিক আগে, যে গণভোটের লক্ষ্য ছিল, প্রেসিডেন্টকে নতুন ও ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান৷ একাধিক জার্মান পৌর প্রশাসন ঐ গণভোটের ব্যাপারে জার্মানিতে তুর্কি রাজনীতিকদের প্রচারণা নিষিদ্ধ করে৷ জরিপে তখন বলছে যে, গণভোটের ফলাফল যে কী হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই৷

এরপর কুর্দি ওয়াইপিজি গেরিলাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তুরস্ক জার্মানির বানানো লিওপার্ড ট্যাঙ্ক ব্যবহার করছে এমন খবর প্রকাশিত হওয়ার পর আঙ্কারায় অস্ত্র রফতানি বন্ধে চাপের মুখে পড়েছে জার্মান সরকার। জার্মান রাজনীতিকরা তুরস্কের কাছে থাকা ট্যাঙ্কগুলো আপগ্রেড করার চুক্তি অনুমোদন বন্ধ রাখারও অনুরোধ জানায়। জার্মানির অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রাইনমেটালকে আঙ্কারা তাদের লিওপার্ড টু ট্যাঙ্কগুলোর আপগ্রেডের জন্য অনুরোধ করেছে বলে সেসময় প্রতিবেদনে জানানো হয়। ওই আপগ্রেডের মাধ্যমে বিস্ফোরক দ্রব্যের বিরুদ্ধে ট্যাঙ্কগুলোর ঝুঁকি কমিয়ে আনার কথা বলা হয়।

জার্মান পার্লামেন্টের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান নরবার্ট রটজেন তখন বলেছিলেন, জার্মানির যে এই আপগ্রেড সুবিধা দেওয়া উচিত নয় তা পুরোপুরি পরিস্কার। সিরিয়ায় তুর্কি বাহিনীর হস্তক্ষেপ অবৈধ, আন্তর্জাতিক আইনের লংঘন; এটি আইএসবিরোধী যুদ্ধের ক্ষেত্রেও বিপরীতমুখী কাজ করবে। আফরিনে অভিযানের ক্ষেত্রে তুরস্ক আত্মরক্ষার অজুহাত দিতে পারবে না। কেননা সিরিয়ার কুর্দি বাহিনী তুরস্কে কোনো ধরণের হামলা চালায়নি। ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে একমাত্র আমেরিকানরাই সেখানে কি হচ্ছে সে ব্যাপারে স্পষ্ট। আমরা প্রায়ই ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা করি, কিন্তু এই ক্ষেত্রে তারা অন্যদের তুলনায় অনেকখানি স্পষ্ট এবং সাহসী, আমাদের উচিত তাদের অনুসরণ করা।

২০১৭ সালেই তুরস্কের ইনচিরলিক বিমান ঘাঁটি থেকে সব সেনা প্রত্যাহার করে নিয়েছিল জার্মানি৷ তুরস্ক জার্মান এমপিদের সেখানে অবস্থানরত জার্মান সেনাদের সাথে নিয়মিত সাক্ষাতের অনুমতি না দেয়ায় এই ব্যবস্থা নিয়েছিল দেশটি৷ জার্মান সেনাদের কোথায় মোতায়েন করা হবে তা নির্ধারণ করে দেশটির সংসদ৷ জুনে পার্লামেন্টে তুরস্ক থেকে সেনাবাহিনী সরিয়ে নেয়ার বিষয়টি অনুমোদন পায়, কেননা, গতবছর তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়িপ এরদোগানকে সরিয়ে দেয়ার এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে সেদেশে বিদেশিদের উপর বাড়তি কড়াকড়ি আরোপ করা হয়৷ জার্মানির এমপিরা ইনচিরলিকে অবস্থানরত সেনা সদস্যদের সঙ্গে একাধিকবার দেখা করতে চাইলেও সরাসরি অনুমতি দেয়নি তুরস্ক সরকার৷ এই নিয়ে পানিঘোলা হয়েছে অনেক৷ গত সেপ্টেম্বরে বিশেষ ব্যবস্থায় সাত এমপি সেখানে যেতে পারলেও জার্মানির কাছে তা ইতিবাচক মনে হয়নি৷ ফলে দেশটি থেকে সেনাদের পুরোপুরি সরিয়ে নেয়া হয়৷

মূলত সিরিয়ায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক বাহিনীর বিমান হামলা পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে ছিল জার্মানির সেনারা৷ এখন সেই দায়িত্ব জর্ডান থেকে পালন করা হবে৷ সেখানে ২৬০ জন জার্মান সেনার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই তুরস্ক থেকে নেয়া হয়৷ জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী উরসুলা ফন ডেয়ার লায়েন এই বিষয়ে বলেছিলেন, জার্মান সেনা ইউনিটটিকে তুরস্কের এমন এক ঘাঁটিতে নেয়া হয়েছে, যেটি বেশ কয়েকটি ন্যাটোভুক্ত দেশ ব্যবহার করছে৷

তুরস্ক ও জার্মানির মধ্যে বিরোধ চরমে পৌঁছেছিল। জার্মানিতে তুর্কি প্রেসিডেন্টের সমর্থনে জনসভা করতে না দেয়ায় আঙ্কারায় নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছিল তুরস্ক সরকার। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে এক জার্মান সাংবাদিককে আটক করার প্রতিবাদে বার্লিনে নিযুক্ত তুর্কি রাষ্ট্রদূত তলব করা হয়েছিল। এ ঘটনার জেরে জার্মান সফর বাতিল করেছিল তুরস্কের এক মন্ত্রী।

জার্মানিতে তুরস্কের প্রায় ৩০ লাখ লোক বসবাস করে। এদের বেশির ভাগই ৬০ থেকে ৭০ এর দশকে অতিথি শ্রমিক কর্মসূচির আওতায় জার্মানিতে আসে।

 

তুরস্ক প্রতিরক্ষা শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে, প্রতিরক্ষা সামগ্রী রফতানিকারক হবে : এরদোগান

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেব তায়্যেপ এরদোগান বলেছেন, তুরস্ক শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণই হবে না, বরং দুনিয়ার শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা সামগ্রী রফতানিকারক দেশে পরিণত করা হবে।

২৪ জানুয়ারির প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন উপলক্ষ্যে আঙ্কারায় ক্ষমতাসীন দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (একে) পার্টির ‘স্ট্রং পার্লামেন্ট, স্ট্রং গভর্নমেন্ট, স্ট্রং তুর্কি’শীর্ষক নির্বাচনি ইশতিহারে এ প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

এরদোগান অঙ্গীকার করেন, ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ ৪০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে তুরস্কের অংশীদারিত্ব আরো বাড়ানো হবে।

এরদোগান বলেছিলেন, সিরিয়া ও ইরাক পরিস্থিতি যত দ্রুত সম্ভব অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় তুরস্ককে বাধ্য করেছে। এসব কারণে দেভলেট বাহসেলি’র সঙ্গে আলোচনার পর আমরা ২০১৮ সালের ২৪ জুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

 জেরুসালেম প্রসঙ্গে এরদোগান বলেছিলেন, জেরুসালেমে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস স্থানান্তরের কোনো মূল্য নেই। এই পদক্ষেপের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল যৌথভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ট্রাম্পের জেরুজালেম প্রদক্ষেপ নিয়ে জাতিসঙ্ঘের ভোট আমাদের দেখিয়ে দেয় যে, এই সমস্ত পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী অনুমোদিত নয়। যদি আপনি বলেন, আমার কাছে টাকা আছে, আমার ক্ষমতা রয়েছে এবং এগুলো ব্যবহার করে আমি সবাইকে ভয় দেখাতে পারি, আপনি এটা করতে পারবেন না এবং কেউ আপনাকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করবে না। এখন আপনি সেখানে আপনার দূতাবাস স্থানান্তরিত করেছেন। তাতে কি হয়েছে? ফিলিস্তিন রাজধানী শহর জেরুসালেম এবং এটা পৃথিবীর সবাই জানে। এ সম্পর্কে কারো কোনো দ্বিধা নেই। তা আপনি স্বীকার করেন বা না করেন, এতে আামদের কিছু আসে যায় না।

এরদোগান বলেছিলেন, ইসরাইলি দস্যুতার বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে পদক্ষেপ গ্রহণ পুরো বিশ্বকে এটা দেখাচ্ছে যে মানবতা এখনো মরে যায়নি।ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বর্বরতা ও হত্যাযজ্ঞ দস্যুতাবৃত্তি, পাশবিক এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস।

১৫ হাজার পারমাণবিক বোমা বিশ্বকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে : এরদোগান

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যেপ এরদোগান বলেছেন, তুরস্ক মনে করে পারমাণবিক শক্তি অবশ্যই শান্তির উদ্দেশ্যে ব্যবহারিত হওয়া উচিৎ। আমাদের দেশ ও ধর্মের জন্য প্রধান হুমকি হচ্ছে- পরমাণু অস্ত্র। সারা বিশ্বকেই পরমাণু অস্ত্র মুক্ত করতে হবে। কমপক্ষে ১৫ হাজার পারমাণবিক বোমা বিশ্বকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় কূটনীতিবিদদের সম্মানে আয়োজিত ইফতার মাহফিলে এসব কথা বলেন।

এরদোগান বলেন- আমরা জেরুসালেমে আমাদের অধিকার ছেড়ে না দিতে প্রতিশ্রুতবদ্ধ। আমরা কখনো আমাদের প্রথম কিবলা ত্যাগ করতে পারি না। যাদের রক্ত ঝরেছে, অশ্রু ঝরেছে, জীবন ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের জন্য প্রার্থনা করছি। তিনটি ধর্মের পবিত্র স্থানের দখলদারদেরকে আমরা ক্ষমা করতে পারি না।

যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস তেলআবিব থেকে জেরুসালেমে স্থানান্তর প্রসঙ্গে এরদোগান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী হাতগুলো ফিলিস্তিনি শিশুদের রক্তে রঞ্জিত। আমেরিকান প্রশাসনের মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং শান্তি নিয়ে কোনো ধরণের কথাবার্তা-আলাপ-আলোচনার অধিকার নেই।

পারমাণবিক শক্তির ব্যাপারে এরদোগান বলেন- আমরা জেরুসালেমের জন্য লড়াই চালিয়ে যাব; যতক্ষণ না জেরুসালেম হবে শান্তিময় আবাস, বিরাজ করবে প্রশান্তি এবং সম্মান। জেরুসালেমের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না তুরস্ক।

ইতোপূর্বে এরদোগান বলেছিলেন, মুসলিম বিশ্বের নেতাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসরাইলকে মোকাবিলা করতে হবে। ফিলিস্তিনিদের হত্যার জন্য ইসরাইলকে দোষী সাব্যস্ত করতে হবে। গাজার গণহত্যার দায় ইসরাইলকে নিতে হবে। ইসরাইলি ডাকাতরা ফিলিস্তিনিদের ওপর যে নৃশংসতা চালিয়েছে, তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়ে সারাবিশ্বকে দেখিয়ে দিতে হবে মানবতা এখনো জীবিত। ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের ওপর যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে তা নৃশংস ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। এসব দস্যুতার বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে পদক্ষেপ গ্রহণ পুরো বিশ্বকে এটা দেখাচ্ছে যে মানবতা এখনো মরে যায়নি। ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বর্বরতা ও হত্যাযজ্ঞ দস্যুতাবৃত্তি ও পাশবিক সন্ত্রাস। জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে মার্কিন স্বীকৃতি অনিবার্যভাবে তাদেরকে গ্রাস করবে।


আরো সংবাদ