১৭ নভেম্বর ২০১৮

‘২০১৪’র মতো নির্বাচন হয়তো হবে’

নির্বাচন
বরিশাল সিটি নির্বাচনের একটি চিত্র - ছবি : বিবিসি

বিরোধী দল বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে কোনো ধরনের আপস মীমাংসার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রোববার বিকেলে তার সংবাদ সম্মেলনে তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, বিএনপির কাছে কোনো আলোচনার প্রস্তাব নিয়ে তিনি যাবেন না এবং কারাবন্দী খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারেও সরকারের কিছু করণীয় নেই - সেখানে যা হবার তা আইনি প্রক্রিয়াতেই হবে।

এর আগে বিএনপি দাবি জানিয়েছিল, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগেই খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে এবং সেই সঙ্গে সরকার ও সংসদ ভেঙে দিতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলছেন, বাংলাদেশের জন্য দুঃখজনক হলো এটা যে, প্রতি পাঁচ বছর পরপর জাতীয় নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগি ও নানা রকম সমস্যা দেখা যায়।

তার মতে, যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিলো তখন পরপর কয়েকটা মোটামুটি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছিলো।

‘কিন্তু এরপর থেকে অবাধ মুক্ত নির্বাচন করতে ব্যর্থ হচ্ছি। এখন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির বক্তব্যও পরস্পরবিরোধী।’

তিনি বলেন, দেশে একটি অস্বচ্ছ রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করছে।

‘২০১৪ সালের মতো আরেকটি নির্বাচন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হয়তো করতে পারবেন। কিন্তু তাতে রাজনৈতিক সংকট আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।’

কিন্তু বিএনপির সামনে আর কি কি পথ খোলা রয়েছে, এমন প্রশ্নে তিনি জানান, ‘আমাদের রাজনীতিই দুটি দলের ভেতরে পরস্পরের বিপরীতমুখী দাবি-দাওয়ার মধ্যে আটকে পড়েছে।’

‘কিন্তু আমরা জনসাধারণ চাইবো লেভেলে প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে মানে সংসদ ভেঙে দিতে হবে। এটা যৌক্তিক দাবি।’

তার মতে, ‘প্রধানমন্ত্রীর কথাই শেষ কথা নয় বরং পর্দার আড়ালে আলোচনা হতেই পারে। সরকার পক্ষের দায়িত্ব বেশি সেহেতু তারাও একটি প্রস্তাব দিতে পারেন।’

দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘সত্যিকারের বাধা হলো বর্তমান সংবিধানে নির্বাচনী সরকার ও নির্বাচনী কমিশনই বড় বাধা। এগুলো সরিয়ে দিলে হয়তো বিএনপি সমঝোতা করতে পারে।’

আরো পড়ুন :
ইভিএম নিয়ে ইসির হঠাৎ তোড়জোড় কার স্বার্থে
জি. মুনীর
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সম্প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে কোনো আলোচনা ছাড়াই হঠাৎ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এ নির্বাচনে ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) ব্যবহারে অতি উৎসাহী হয়ে উঠেছে। আর তা করায় বাধা দূর করতে আরপিও (রিপ্রেজেন্টেশন অব পিপল অর্ডার) সংশোধনের কথা বলছে ইসি। যদিও এর আগে নির্বাচন কমিশন বলেছিল সব দল একমত না হলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে না। ফলে ইভিএম নিয়ে বিতর্ক প্রায় থেমেই গিয়েছিল। কিন্তু এখন গত কয়েক দিন ধরে দেশে এ নিয়ে আবার ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

প্রশ্ন উঠেছে- হঠাৎ করে নির্বাচন কমিশন কার স্বার্থে এ ধরনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। এই ক’দিন গণমাধ্যমে ইভিএম ব্যবহারের বিরুদ্ধে যেভাবে সমালোচনা এসেছে তাতে মনে হয়েছিল নির্বাচন কমিশন শিগগিরই ইভিএম ব্যবহার থেকে সরে আসার ঘোষণা দেবে। কিন্তু কার্যত ঘটেছে এর ঠিক উল্টো। গত ৩০ আগস্ট নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে সর্বশেষ বৈঠক করে। বৈঠকে খোদ নির্বাচন কমিশনাররা ইভিএম ব্যবহারে একমত হতে না পারলেও শেষ পর্যন্ত মতানৈক্যের মধ্যেই কমিশন আগামী নির্বাচনে যাতে ইভিএম ব্যবহার করা যায়, সে জন্য আরপিও সংশোধনের পক্ষেই সিদ্ধান্ত নেয়। এখন সে প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশন আরপিও সংশোধনের উদ্যোগ নেবে বলে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়।

কিন্তু আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার পক্ষে সাতটি বিষয় তুলে ধরে আপত্তি (নোট অব ডিসেন্ট) লিখিত আকারে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালকদার। গত বৃহস্পতিবারের সভা শুরু হওয়ার আধঘণ্টার মধ্যে তিনি এই আপত্তির কথা জানিয়ে সভা বর্জন করে চলে যান। আরপিও সংশোধনী প্রস্তাব চূড়ান্ত করা সংক্রান্ত এই বৈঠকে ইভিএম ব্যবহার প্রশ্নে তিনি এই দ্বিমত পোষণ করেন। বৈঠকে ইভিএম প্রশ্নে কমিশনের অন্য কমিশনারদের সাথে দ্বিমত পোষণ করে মাহবুব তালুকদার লিখিত বক্তব্যে তার আপত্তির বিভিন্ন কারণ তুলে ধরেন। লিখিত বক্তব্যে তিনি যেসব মূল বিষয় উল্লেখ করেন এর মধ্যে রয়েছে : রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার ভিত্তিতে ইভিএম ব্যবহারের সম্ভাবনা না থাকা, বিনা দরপত্রে কেনা ইভিএমে কারিগরি পরীক্ষার ঘাটতি, ইভিএম ব্যবহারে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা, ইভিএম ব্যবহার হলে আদালতে মামলার সম্ভাবনা, ইভিএম ব্যবহারে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, ইভিএম নিয়ে ভোটারদের সন্দেহ ও জনভ্যস্ততা, জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে আরো সময়ের প্রয়োজনীয়তা।

মাহবুব তালুকদার মনে করেন, একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে অধিকতর আলোচনা ও সমঝোতার দরকার ছিল। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেছেন, স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে ইতোমধ্যেই ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের কাছ থকে তীব্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে ইভিএমকে স্বাগত জানানো হলেও প্রধান বিরোধী দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল এর বিরোধিতা করে আসছে। এ অবস্থায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিকগুলোর সমঝোতার ভিত্তিতে ইভিএম ব্যবহারের কোনো সম্ভাবনা নেই। মাহবুব তালুকদার আরো বলেন, সরকারি সংস্থার সুবাদে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি থেকে বিনা নোটিশে যে ইভিএম কেনা হয়েছে এর উৎস (অরিজিন) কী, কে উদ্ভাবন করেছেন কিংবা কোথা থেকে আমদানি করা হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কারিগরি দিক থেকে এটি পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত কি না, তা আরো পরীক্ষা করার প্রয়োজন ছিল। প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর পর এখন পর্যন্ত এর সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি বলেও জানা যায়।

লিখিত বক্তব্যে মাহবুব তালুকদার আরো দাবি করেন, সর্বসম্মত রাজনৈতিক মতের বিরুদ্ধে ইভিএমের ব্যবহার করা হলে তা নিয়ে আদালতে মামলার সূত্রপাত হবে। অন্যান্য কারণ বাদ দিলেও শুধু ইভিএম ব্যবহারের কারণে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা আছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের এই অনাবশ্যক ঝুঁকি নেয়া সঙ্গত হবে না। ইভিএম ব্যবহারের জন্য নির্বাচন কমিশন যাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, তা অপর্যাপ্ত। অনেক ভোটার ইভিএম সম্পর্কে অনীহা প্রকাশ করেছেন। তারা ইভিএম নিয়ে যে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, তা নিরসনের জন্য ব্যাপক প্রচার ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ছিল।

উল্লিখিত সভা বর্জনের পর বিকেলে তিনি নির্বাচন কমিশনের নিজের কার্যালয়ের সামনে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেন। কমিশনের বৈঠক থেকে বেরিয়ে আসার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘বৈঠকের কার্যপত্রে আরপিও সংশোধনের বিষয়টি ছিল। আমি মোটেই চাই না আগামী সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হোক। এখন তারা বসে বসে আরপিও সংশোধন করতে থাকবেন, আর আমি মূর্তির মতো বসে থাকব, তা আমার কাছে যথাযথ মনে হয়নি। আমার কাছে মনে হয়েছে, তারা তাদের কাজ করুক, আমি আমার কাজ করি।’

যেকোনো বিবেকবান মানুষ স্বীকার করবেন- মাহবুব তালুকদার তার লিখিত নোট অব ডিসেন্টে যেসব যুক্তি তুলে ধরেছেন, তার একটিও অযৌক্তিক কিংবা ফেলনা নয়। অথচ চারজন নির্বাচন কমিশনার এর বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়ে আরপিও সংশোধন করে আগামী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে তাদের অবস্থান ঘোষণা করলেন। সে জন্যই দলকানা কিছু মানুষ ছাড়া দেশের সাধারণ মানুষ একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান প্রশ্নে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ওপর তাদের আস্থা রাখতে পারছে না। তা ছাড়া এ নির্বাচন কমিশনের অধীনে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত কোনো উপনির্বাচন, স্থানীয় নির্বাচন, বিশেষ করে সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারেনি। তবে এরই মধ্যে যে ক’টি নির্বাচনে সরকারবিরোধী প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন, তা শুধু সম্ভব হয়েছে জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের কারণেই।

সে যা-ই হোক, ইভিএম ব্যবহার নিয়ে যেমন নির্বাচন কমিশনের ভেতরেই মতানৈক্য রয়েছে, তেমনি মতানৈক্য রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। আমরা দেখেছি, এ সত্যের উচ্চারণটি রয়েছে মাহবুব তালুকদারের আপত্তিতে। তা ছাড়া আমাদের অনেকেরই মনে আছে- গত বছর অনুষ্ঠিত অংশীজনের সাথে ইসির সংলাপের একটি বিষয় ছিল ইভিএম। জানা গেছে, ২০১৭ সালে যে ৪০টি রাজনৈতিক দল ইসির সাথে নির্বাচনী সংলাপে অংশ নেয়, এর মধ্যে বিএনপিসহ ৩৫টি দলই ইভিএম ব্যবহারের বিপক্ষে তাদের মত দেয়। বাকি যে পাঁচটি দল ইভিএমের পক্ষে মত দেয় সেগুলো হচ্ছে : আওয়ামী লীগ ও এর নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দল বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি, হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ, বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল (এম-এল) এবং জাকের পার্টি। এমনকি সরকারের শরিক জাতীয় পার্টিও ইভিএমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের বিরোধিতার প্রেক্ষাপটেই নির্বাচন কমিশন একসময় বলেছিল, সব দল একমত না হলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে না। এখন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা না করেই হঠাৎ করে ইভিএম ব্যবহারে ইসির এই তোড়জোড়কে দেশের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল-মহল ও সাধারণ মানুষ সন্দেহের চোখে দেখছেন এবং দেখাটাই স্বাভাবিক।

হঠাৎ করে ইসির ইভিএম ব্যবহারের এই তোড়জোড়ের বিষয়টিকে আসলে সরকারি বলয়ের বাইরের রাজনৈতিক দলগুলো ‘ডিজিটাল রিগিংয়ের’ আশঙ্কা হিসেবে দেখছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আশঙ্কা, একদম শেষ পর্যায়ে এসে হঠাৎ করে ইসির এই উদ্যোগ আওয়ামী লীগকে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী করার সরকারি ষড়যন্ত্রেরই একটি অংশ মাত্র। তারা বলছে, ইভিএম ত্রুটিপূর্ণ ও এর ওপর আস্থা রাখা যায় না। আর এটি হ্যাকিং করা যায়, এবং ম্যানিপুলেট করা যায়। অনেকের প্রশ্ন : আর নির্বাচন কমিশনই বা হঠাৎ করে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের মতামত উপেক্ষা করে ইভিএম ব্যবহারে এতটা উৎসাহীই বা কেন হলো- সেটাও সন্দেহজনক।

সম্প্রতি জাতীয় প্রেস ক্লাবে স্বাধীনতা ফোরাম আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন অভিযোগ করেন, ইভিএম ব্যবহারে ইসির এই তাড়াহুড়া রাজনৈতিক অসৎ-উদ্দেশ্যতাড়িত।

এর লক্ষ্য নির্বাচনে কারচুপি করা। বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, এই উদ্যোগ ডিজিটাল রিগিংয়ের পথকেই খুলে দেবে। এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নীলনকশা বাস্তবায়ন করতে চায়। তিনি আরো বলেন, কিছু লোক প্রচুর টাকা তসরুপ করবে ইভিএম কেনার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশ সমাজবাদী দলের সভাপতি খালেকুজ্জামান বলেছেন, ইভিএম ব্যবহার আওয়ামী লীগের জন্য নিরাপদে ভোট জালিয়াতির সুযোগ করে দেবে। তিনি ইসির প্রতি ইভিএম ব্যবহারের উদ্যোগ অবিলম্বে বন্ধে আহ্বান জানান। তিনি সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো ইভিএম ব্যবহার প্রত্যাখ্যান করবে। বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, এই উদ্যোগ সন্দেহজনক এবং ইসি আওয়ামী লীগের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করে চলেছে। তিনি বলেন, তার দল এই উদ্যোগ মেনে নেবে না। খেলাফত মজলিসের সভাপতি মুহাম্মদ ইসহাক বলেছেন, ইসি ইভিএম ব্যবহারের পদক্ষেপ নিয়ে জনগণের সাথে প্রতারণা করছে। তিনি বলেন, তার দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সব দলের সাথে মিলে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবে।

এদিকে ইভিএম কেনার পরিণতি সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক করেছে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘ইভিএম-টিভিএম কেনার উদ্যোগ ত্যাগ করুন। আমরা ইসিকে দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, ডিজিটাল জালিয়াতির পথ থেকে সরে আসুন। অন্যথায় ষড়যন্ত্রকারী প্রত্যেকেই এর মূল্য দিতে হবে।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার হঠাৎ কী কারণে, কাকে জয়ী করতে এবং কার নির্দেশে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন?’ তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগ এখন জনগণের ওপর আস্থা হারিয়ে যন্ত্রের ওপর ভর করেছে। জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা সরকার ও নির্বাচন কমিশনের একটি ‘অশুভ পার্টনারশিপ’। এর পুরো দায় নির্বাচন কমিশনকে বহন করতে হবে। তিনি আরো বলেন, ২০১০ সালে প্রতিটি ইভিএম কেনা হয় ১০ হাজার টাকায়। এখন এটি কেনা হচ্ছে ২০ গুণ বেশি দাম দিয়ে, প্রতিটি দুই লাখ পাঁচ হাজার টাকারও বেশি দাম দিয়ে। মূলত এটিও জনগণের অর্থ লোপাটের একটি প্রক্রিয়া।

অপর দিকে ইভিএম সংক্রান্ত আরপিও সংশোধনে ইসির সিদ্ধান্তের পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন- ‘ইভিএম ব্যবহারের দাবি নতুন নয়। ইসির সাথে সংলাপে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে ইভিএমে ভোট গ্রহণের যুক্তি তুলে ধরেছিলাম। সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে কিছু কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার হয়েছে। সিলেটে যে দুই কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার হয়েছে, সেসব কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পরাজিত হয়েছে। এর পরও বিএনপির আপত্তি কেন?’

এদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ইভিএম সংক্রান্ত আরপিও সংশোধনের পরও নিশ্চিত করে জাতিকে জানাতে পারেননি, আগামী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হবে কি না। তার কথায় মনে হয়েছে- ইভিএম ব্যবহার হতেও পারে, আবার না-ও হতে পারে। প্রয়োজনে যাতে ব্যবহার করা যায় সে জন্যই আরপিও সংশোধনের উদ্যোগ। এদিকে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার আগেই নির্বাচন কমিশন এরই মধ্যে দেড় লাখ ইভিএম কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। এগুলোর অনুমিত ব্যয় তিন হজার ৮২১ কোটি টাকা। ইসি কর্মকর্তারা এরই মধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন এসব ইভিএম কেনার বিষয়ে। ইসি বলেছেন, নির্বাচনী ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে এসব ইভিএম কেনা হবে। কিন্তু প্ল্যানিং কমিশনে এখন পর্যন্ত ইভিএম ব্যবহারসংক্রান্ত কোনো প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। এই প্রকল্প নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা হওয়ার কথা ছিল ১৯ আগস্ট।

কিন্তু পরে এই সভা বাতিল করা হয়। তা সত্ত্বেও এরই মধ্যে তিন হাজার ৫১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে দেড় লাখ ইভিএম ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনার জন্য। এমনি বিশৃঙ্খল অবস্থায়েই গত জুলাই থেকে ইভিএম আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ জন্য ঋণপত্র খুলতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ অনুমোদন নিয়েছে ট্রাস্ট ব্যাংক। চীন, হংকংসহ আরো কয়েকটি দেশ থেকে ইভিএম ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি এনে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি তা নির্বাচন কমিশনকে সরবরাহ করবে বলে নথিপত্রে উল্লেখ আছে। ইতোমধ্যেই ৭৯৩ কোটি টাকার ঋণপত্র খোলা হয়েছে। যন্ত্রপাতি আমদানিতে ব্যয় হবে দুই হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা।

বাস্তবতা হচ্ছে, ইভিএম এখন পর্যন্ত একটি নির্ভরযোগ্য যন্ত্র হিসেবে নিশ্চিত প্রমাণিত বলে স্বীকৃত নয়। আজ পর্যন্ত বিশ্বে ৩১টি দেশ ইভিএম ব্যবহার করেছে কিংবা এ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে। এর মধ্যে চারটি দেশ জাতীয়ভাবে এটি ব্যবহার করেছে। ১১টি দেশে এটি ব্যবহার হয়েছে আংশিকভাবে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে এর ব্যবহার চলছে পাঁচটি দেশে। তিনটি দেশ এর ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে ব্যবহার করে ১১টি দেশে তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ২০০৬ সালে নেদারল্যান্ডসে পার্র্লামেন্ট নির্বাচনে ইভিএম অনিরাপদের অভিযোগ উঠলে তদন্ত কমিটির রিপোর্টের পর ২০০৭ সালে ইভিএম ব্যবহারসংক্রান্ত বিধান প্রত্যাহার করা হয়। ২০০৯ সালে জার্মান আদালত ইভিএম ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। আদালত বলে কমপিউটারভিত্তিক এই ভোটব্যবস্থায় যে প্রোগ্রামিংয়ের প্রয়োজন হয় জনগণ সে ব্যাপারে অবহিত নয়। তা ছাড়া এই ভোটব্যবস্থা অস্বচ্ছ। এমনি আরো অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে, যা ইভিএম ব্যবহারের বিপক্ষে যায়। যেখানে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থাহীনতা প্রবল ও অসহিষ্ণুতা চরম মাত্রার সেখানে ইভিএম ব্যবহার নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি নিয়ামক হয়ে দাঁড়াবে। এমন আশঙ্কা খুবই প্রবল।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বৈধ-অবৈধ লীলাখেলা ও হঠাৎ তোড়জোড় তৎপরতা থেকে এটুকু স্পষ্ট, বিষয়টি নিয়ে নানা অশঙ্কা প্রকাশের সমূহ কারণ রয়েছে। এমনিতে আগামী নির্বাচনের নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে এখন পর্যন্ত জাতি একটি সর্বসম্মত উপায় উদ্ভাবন করতে পারেনি। সে কারণে গোটা জাতি আগামী নির্বাচন সবার অংশগ্রহণমূলক করা নিয়ে রয়েছে নানা শঙ্কায়। অপর দিকে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে নির্বাচন কমিশন আরেকটি বিতর্ক বা সমস্যার জন্ম দিতে যাচ্ছে কোন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে?- এমন প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক। এমনি পরিস্থিতিতে ইভিএম ব্যবহারের চিন্তা থেকে সরে এসে দেশবাসীর চাওয়া-পাওয়ার একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের চিন্তায় মনোনিবেশ করবে, এমনটিই প্রত্যাশা।


আরো সংবাদ