২৩ এপ্রিল ২০১৯

যে কারণে ইভিএম-এ আপত্তি মাহবুব তালুকদারের

যে কারণে ইভিএম-এ আপত্তি মাহবুব তালুকদারের - সংগৃহীত

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণের বিধান যুক্ত করতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনীর প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশনার মাহবুব তালুকদার প্রস্তাবটি অনুমোদনের আগেই আপত্তি জানিয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে কমিশন সভা বর্জন করেন। এই কমিশনার সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিধান যুক্ত করার প্রস্তাবে আপত্তির কারণ তুলে ধরেন। এ বিষয়ে তিনি তিনটি কারণ উল্লেখ করেন। কারণগুলো হলো—প্রথমত বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল সংলাপের সময় ইভিএমের বিরোধী করেছিল, দ্বিতীয়ত, জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য দক্ষ জনবল তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় ইসির হাতে নেই ও তৃতীয়ত ভোটাররা এখনও ইভিএমে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি।

আরপিও সংশোধনীর প্রস্তাব অনুমোদন নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদার সংবাদ সম্মেলনের পরপরই মাহবুব তালুকদার তার দফতরে সাংবাদিকদের ডেকে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়ার কারণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমি তিনটি কারণে আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিরুদ্ধে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি। প্রথম বিষয় হচ্ছে অধিকাংশ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ইভিএম ব্যবহারের বিরুদ্ধে, দ্বিতীয়ত, ইভিএম ব্যবহারের জন্য কমিশন যাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে তা অপর্যাপ্ত, জাতীয় নির্বাচনে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে যে সময়ের দরকার হবে তা আমাদের হাতে নেই। আর তৃতীয়ত, ইভিএম ব্যবহারে ভোটারদের মধ্যে অনীহা রয়েছে। তাদের মধ্যে অভ্যাস গড়ে ওঠেনি। এজন্য আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করাটা ঠিক হবে না।’

এ প্রসঙ্গে এই কমিশনার উল্লেখ করেন, ‘কমিশনের অবস্থান ছিল সব রাজনৈতিক দল না চাইলে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে না। এক্ষেত্রে আমাদের আগের কথাও তো রাখতে পারছি না।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমান কমিশন যদি মনে করতো যে, তারা ইভিএম ব্যবহার করবে, তাহলে প্রথম থেকেই ভোটারদের মধ্যে একটি অভ্যাস গড়ে তুলে পারতাম। দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে বৃহৎ একটি অংশকে এতদিনে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হতো।’

ইসির রোডম্যাপে ইভিএমের বিষয়টি নেই উল্লেখ করে মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘আমরা যে কর্মপরিকল্পনা দিয়েছিলাম, তার কোথাও ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে কিছু নেই। এখন হঠাৎ করে নির্বাচনের আগে আগে কেন ইভিএম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে গেল?’ জার্মানিতে ইভিএমকে অসাংবিধানিক বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে বলে তিনি পত্রিকার উদ্বৃতি দিয়ে দাবি করেন। ইভিএম ব্যবহারে সংবিধানে কোনও সংশোধনী আনার প্রয়োজন পড়বে কিনা, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

ভোটারদের অভ্যস্ত না করলে ইভিএম কখনোই সফল হবে না মন্তব্য করে মাহবুব তালকুদার বলেন, ‘যন্ত্রের অগ্রগতির সময়ে আমি মোটেও ইভিএম ব্যহারের বিপক্ষে নই। কিন্তু আমি মনে করি, জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে যে প্রস্তুতি দরকার, তা আমাদের নেই। স্থানীয় সরকারগুলোয় যেভাবে ইভিএম ব্যবহার হচ্ছে, তা বাড়ানো গেলে আশা করি, আগামী ৫/৭ বছরের মধ্যে ইভিএম ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে উঠবে। ফলে আগামী ৫ বা ১০ বছর পরে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম অনিবার্য হয়ে উঠবে।’ তিনি তার বিশ্বাস থেকে এই কথাগুলো বলেছেন বলে জানান।

ইভিএম ক্রয় বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো প্রকল্পে এই কমিশনারের সম্মতি ছিল না বলে দাবি করেন। এ বিষয়ে সিইসির বক্তব্য তুলে ধরনে এই কমিশনার বলেন, ‘সিইসির বক্তব্যের বিপরীতে তিনি কোনও মন্তব্য করতে চান না।’ কমিশনের ভাবমূর্তি নষ্ট হোক তা চান না। তবে, কমিশনের কোনও সভার কার্যবিবরণীতে এই প্রকল্পের বিষয়টি রয়েছে বলে তার নজরে পড়েনি।

বৈঠক শেষ না করে বেরিয়ে আসার কারণ ব্যাখ্যা করে এই কমিশনার বলেন,  ‘আমি আরপিও সংশোধনের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছি। আমি মোটেও চাই না, আগামী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য আরপিও সংশোধন হোক। এখন তারা বসে বসে আরপিও সংশোধন করতে থাকবেন আর আমি নো অব ডিসেন্ট দিয়ে মূর্তির মতো সেখানে বসে থাকবো। তা আমার কাছে যথোপযুক্ত মনে হয়নি।’

নোট অব ডিসেন্ট প্রসঙ্গে  মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘আমি কারও বিরুদ্ধে এই নোট অব ডিসেন্ট দেইনি। একটা মতের বিরুদ্ধে আমার ভিন্নমত। আমি দ্বিমত বা ভিন্নমত পোষণ করতে পারি। তবে, কোনও সহকর্মী কারও সঙ্গে আমার মতবিরোধ নেই। কোনও নির্দিষ্ট বিষয়ে আমাদের দ্বিমত হতেই পারে। কিন্তু তা মতবিরোধ হিসাবে গণ্য করা ঠিক হবে না।’

একাদশ সংসদ নির্বাচন আয়োজনের পথে এগিয়ে চলার ইসির অন্যতম সদস্য মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের দ্বন্দ্বের সংবাদ গণমাধমে প্রকাশ হয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন জন বিভিন্ন রকম ছবক দিচ্ছে কমিশনকে। পত্রপত্রিকায় এমন সংবাদও বেরিয়ে যে, সিইসি ও আমার মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।’

একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হলে কী সিদ্ধান্ত হবে, তা ওই সময় নির্ধারণ করবেন বলে জানান এই কমিশনার। তখনকার অবস্থা কী হবে তা এই মুহূর্তে বলা যাবে না।’

এ সময়ে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে কমিশনের অবস্থানও তুলে ধরে মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘পাঁচ নির্বাচন কমিশনার মিলে একক সত্তা। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমরা সব কমিশনার দেশবাসীকে একটি ভালো নির্বাচন উপহার দিতে বদ্ধপরিকর। সাংবিধানিকভাবে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে সচেতন রয়েছি।’

কী আছে নোট অব ডিসেন্টে

মাহবুব তালুকদার প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদাসহ চার কমিশনারের উদ্দেশে নোট অব ডিসেন্টটি লিখেছেন। তিনি এটি কমিশনের পত্রবিতরণ ও গ্রহণ শাখা থেকেও এন্ট্রি করিয়ে নিয়েছেন। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সকাল ১১টায় বৈঠক শুরুর পরপরই তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য কমিশনারের কাছে তার নোট অব ডিসেন্টের কপি সরবরাহ করেন। তিনি পুরোটাই পড়ে শোনান। এরপর কমিশনার কবিতা খানম আরপিও সংশোধনীর বিষয়ে কমিটির প্রস্তাবনাগুলো ‍উত্থাপন করার পরপরই মাহবুব তালুকদার বৈঠক থেকে বেরিয়ে যান। সকাল ১১টায় বৈঠক শুরু করে একঘণ্টার বিরতিসহ বিকাল ৫টায় বৈঠক শেষ হলেও এর মধ্যে তিনি আর বৈঠকে ঢোকেননি।

বিগত ২৬ আগস্টের বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে মাহবুব তালুকদার নোট অব ডিসেন্টে লিখেছেন, ওই বৈঠকে আরপিও সংশোধনের বিষয়ে তিন ধরনের প্রস্তাব পেশ করা হয়। কিন্তু কমিশন দুটি প্রস্তাবকে বাদ দিয়ে কেবল সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে। তিনি লিখেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যে ইভিএম ব্যবহার হচ্ছে তা নিয়ে ভোটার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার শুরু থেকেই বলে এসেছেন রাজনৈতিক দলগুলো সম্মত হলেই কেবল আগামী সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে ইভিএম ব্যবহারে স্বাগত জানানো হলেও প্রধান বিরোধী দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল এর বিরোধিতা করে আসছে।  নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দলগতভাবে সংলাপে ইভিএম সম্পর্কে সরকারি দল ও প্রধান বিরোধী দলের অবস্থান ছিল পরস্পরবিরোধী। এ অবস্থায় একাদশ সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার মাধ্যমে ইভিএম ব্যবহারের কোনও সম্ভাবনা নেই। একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পূর্বে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অধিকতর আলোচনা ও সমঝোতার প্রয়োজন ছিল।

ইভিএম ইস্যুতে কমিশনের আগেরকার অবস্থানের প্রসঙ্গ তুলে মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘বর্তমান কমিশন ইভিএম ব্যবহারের শুরুতে বলা হয়েছিল পরীক্ষামূলকভাবে ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে। ওই পরীক্ষামূলক ব্যবহারে ২ হাজার ৫৩৫টি কেনার জন্য প্রায় ৫০ কোটি টাকার ইভিএম কেনায় আমি ভিন্নমত পোষণ করেছিলাম। সম্প্রতি ৩৮২১ কোটি টাকার প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। কোনও কোনও রাজনৈতিক দলের বিরোধিতার মুখে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার যেখানে অনিশ্চিত, সেখানে এ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে ইভিএম কেনা কতটা যৌক্তিক, সে প্রশ্ন মনে জাগে।’

তালুকদার বলছেন, ‘পরিকল্পনা কমিশন এখনপর্যন্ত প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই করেনি। যে ইভিএম বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি থেকে বিনা টেন্ডারে কেনা হচ্ছে, তার কারিগরি বিষয় বুয়েট বা অনুরূপ কোনও সংস্থা থেকে যাচাই করা হয়নি। কারিগরি দিক থেকে এ যন্ত্র সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত কিনা, তা পরীক্ষা করা হয়নি।’

আরপিওতে শুধু ইভিএম ব্যবহারের যে সংশোধনী প্রস্তাব আনা হয়েছে, তা ইতোমধ্যে কমিশন সভায় নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে মন্তব্য করে তিনি লিখেছেন, ‘আমি ধারণা করি, জনমত বা সর্বসম্মত রাজনৈতিক মতের বিরুদ্ধে ইভিএম ব্যবহৃত হলে তা নিয়ে আদালতে অসংখ্য মামলার সূত্রপাত হবে। অন্য কারণ ছাড়া কেবল ইভিএম ব্যবহারের কারণেই সংসদ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। বর্তমান ইসির পক্ষে এ ঝুঁকি নেওয়া সঙ্গত হবে না।’

যন্ত্রের অগ্রগতির এ যুগে ইভিএম ব্যবহারের বিরোধী নন উল্লেখ করে এই কমিশনার বলেন, ‘স্বল্প সময়ে এত বিশাল জনবলের প্রশিক্ষণের অপর্যাপ্ততা এবং ভোটারদের অজ্ঞতাপ্রসূত কারণে ইভিএম নিয়ে অনীহাও থাকবে।’

সাম্প্রিতিক সিটি নির্বাচনে কিছু বিশঙ্খলা এবং ইভিএম কেন্দ্র দখলের অভিযোগের কথাও নোট অব ডিসেন্টে তুলে ধরেছেন এই কমিশনার। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, স্থানীয় নির্বাচনে ধীরে ধীরে ইভিএমের ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে আরপিও সংশোধনের উদ্যোগ সমর্থন করি না। ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে কমিশনের সিদ্ধান্তে ভিন্নমত পোষণ করে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি।’


আরো সংবাদ




iptv al Epoksi boya epoksi zemin kaplama Daftar Situs Agen Judi Bola Net Online Terpercaya Resmi

Hacklink

Bursa evden eve nakliyat
arsa fiyatları tesettür giyim
Canlı Radyo Dinle hd film izle instagram takipçi satın al ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme

instagram takipçi satın al
hd film izle
gebze evden eve nakliyat