২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

পোলিং এজেন্টকে মারধর, অবরুদ্ধ ভোটকেন্দ্র, সাংবাদিক লাঞ্ছিত, কেন্দ্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা

হঠৎ করেই দুপুর একটায় রাজশাহী সিটির ১৬ নং ওয়ার্ড মালদা কলোনী সুজানগর ভোট কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ার পর স্থানীয়দের প্রতিবাদ - নয়া দিগন্ত

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের কয়েকটি কেন্দ্র অবরুদ্ধ করে রাখে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা। ওই কেন্দ্রগুলোতে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি বিএনপি- জামায়াতের প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের। পুলিশের সহযোগিতায় তাদের চড়-থাপ্পড় মেরে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি এলাকার চিহ্নিত জামায়াত ও বিএনপির ভোটারদের। সাধারণ ভোটাররা কেন্দ্রে প্রবেশ করলেও প্রকাশ্য সিল দিতে বাধ্য করেছে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা। সকালে এ প্রতিবেদককে লাঞ্ছিত করে বের করে দেয়ার পর দুপুরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি কয়েকজন সাংবাদিককে। ক্ষমতাসীন দলের একই কর্মীদের সহযোগীর ভূমিকা পালন করে কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার ও পুলিশ সদস্যরা।

সোমবার সকাল থেকেই নগরীর ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের বিনোদপুর ইসলামিয়া কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না এমন অভিযোগ আসে। ওই ওয়ার্ডের ঘুড়ি প্রতীকের প্রার্থীর প্রধান এজেন্ট রবিউল ইসলামের অভিযোগ, তার প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট উজ্জ্বল, মেরাজ, রশীদ, মাসুদ ও ফিরোজ এজেন্ট দায়িত্ব পালন করতে কেন্দ্রে যান। এ সময় স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীরা তাদের চড়-থাপ্পড় মেরে বের করে দেয়। ঘটনাস্থলে বিপুল পুলিশ মোতায়েন থাকলেও তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।

সকাল সাড়ে ৮টায় সরেজমিনে দেখা যায় ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা কেন্দ্র দখল করে নৌকা প্রতীকে সিল মারছে। মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে নৌকা প্রতীকে পড়েছে ৫৬টি ভোট। ব্যালটের কয়েকটি অবশিষ্ট অংশে (মুড়ি) দেখা যায়নি ভোটদাতাদের টিপসই বা স্বাক্ষর। যদিও ওই বুথেই কাউন্সিলর ও মহিলা কাউন্সিলর পদে পড়েছে ২৫ ভোট।

পোলিং অফিসারদের কাছে এর কারণ জানতে চাইলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সাদ্দামের নেতৃত্বে একদল জালিয়াতকারী এই প্রতিবেদককে লাঞ্ছিত করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়।

এরপর আবারো শুরু হয় জাল ভোটের উৎসব। বেলা ১১টায় ওই কেন্দ্রের মেয়র পদের ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যায়। এ খবর পেয়ে গণমাধ্যম কর্মীরা কেন্দ্রে এলেও তাদের বুথে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। তিন তলার যে রুমটিতে জাল ভোট দেয়া হচ্ছিল সেখানেও যেতে পারেননি সাংবাদিকরা। মোবাইলে ছবি তুলতে নিষেধ করা হয় সাংবাদিকদের।

সরেজমিনে দেখা যায়, এ কেন্দ্রে নৌকা সমর্থকদের ১০ থেকে ১৫ জনের একেকটি গ্রুপ ব্যালট পেপার বাইরে নিয়ে সিল মেরে আবার ভিতরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। আর তা করছে পুলিশের সামনেই। এ ব্যাপারে ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার আবদুল্লাহিল শাফি বলেন, বুথের ভেতরে কাউকে ঢুকতে দেয়া যাবে না। ওপর থেকে নিষেধ আছে। কার অনুমতি লাগবে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে এ কর্মকর্তা বলেন, তা আমি বলতে পারব না। তবে আমি আপনাদের ভেতরে যেতে দেবো না।

ব্যালট বই ছেঁড়া কেন জানতে চাইলে তিনি জানান, ওগুলোর ভোট শেষ হয়ে গেছে।

এরপর কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তা আজাদ সাংবাদিকদের শাসিয়ে বলেন, আপনারা এখানে আসছেন ভালো কথা। ভেতরে যেতে পারবেন না।
একইভাবে এর পাশের শাহারা খাতুন নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভেতরেও সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেয়নি প্রিজাইডিং অফিসার রঞ্জিত কুমার শাহ। এ কর্মকর্তা বলেন, আপনাদেরকে অনুমতি নিয়ে আসতে হবে। এ ছাড়া বুথের ভেতরে যেতে পারবেন না।
একই পরিস্থিতি বিরাজ করে ডাশমারী উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে। সেখানেও সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।

সকাল সাড়ে ১০টায় বুধপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় কেন্দ্রের প্রধান গেটে তালা দেয়া। ভেতরে কাউকে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, স্থানীয় আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর প্রার্থী আলাল তার বাহিনী নিয়ে প্রবেশ করে। এর পর পুলিশ কেন্দ্রের প্রধান গেটে তালা দিয়ে রাখে। আধা ঘণ্টা পরে ভোটারদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত পুলিশ ও র‌্যাব এসে আলাল ও তার বাহিনীকে বের করে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। এই আধা ঘণ্টা সময় তিনি কাউন্সিলর ব্যালট নিয়ে নিজের পক্ষে জালভোট দেন। ফলে বেলা ৩টা বাজার আগেই কাউন্সিলর প্রার্থীর ব্যালট শেষ হয়ে যায়।

পোলিং এজেন্টকে জিম্মি করে জালভোট
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের দু’টি বুথে বিএনপির প্রার্থীর পোলিং এজেন্টকে জিম্মি করে ব্যালট পেপার নিয়ে নৌকায় সিল মারতে থাকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় অন্য বুথে থাকা এজেন্টরা এসে এর প্রতিবাদ জানায়। এ সময় ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা তাদের কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে জালভোট দেয়।

বিএনপি প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট চৌধুরী শারমিন রুনা বলেন, কেন্দ্রটিতে সুষ্ঠু ভোট চলছিল। আমি ৪৮টি ভোটগ্রহণ করেছি। তবে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এসে আমার ওখান থেকে ব্যালট পেপার নিয়ে নৌকা ও ঠেলাগাড়ি মার্কায় সিল দিয়েছেন। সেখানে ৩০১ থেকে ৪০০ ভোট ছিল।

কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভোট দিতে পারেননি বলেও জানান শারমিন রুনা। কিন্তু মোস্তাফিজুর রহমান ভোট দিয়েছেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। তবে তার হাতে ভোট দেয়ার কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি।
৫ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ভোট দিতে পারেননি বাদশা

দুপুর পৌনে ১২টায় ডাশমারী উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। কেন্দ্রের গেটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থান। ভোটের মাত্র ১৫ মিনিট বাকি থাকলেও বাইরে সহ¯্রাধিক ভোটারের দীর্ঘ লাইন। এ সময় গণমাধ্যমকর্মীরা কেন্দ্রে প্রবেশ করতে চাইলেও ওপরের নির্দেশে তাদের বাধা দেয়া হয়।

পরে ভোট শেষ হয়ে গেলে ওই কেন্দ্রের ভোটার বাদশা অভিযোগ করেন, আমি পাঁচ ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়েছি। ভোটের গতি ধীর থাকায় পুলিশকে দ্রুত ভোটগ্রহণের অনুরোধ জানাই। কিন্তু তারা বলে যতক্ষণই সময় লাগুক আপনারা ভোট দিতে পারবেন। কিন্তু ৪টা বাজার পর আর ভোটগ্রহণ করা হয়নি। এর প্রতিবাদ করলে পুলিশ তাদের লাঠিপেটা করে।

 


আরো সংবাদ