১৩ নভেম্বর ২০১৮

ভোট কারচুপির অভিনব প্রতিবাদ জানালেন বুলবুল

ভোট কারচুপির অভিনব প্রতিবাদ জানালেন বুলবুল - সংগৃহীত

আগের দিন থেকেই অভিযোগ ছিল, সোমবার ভোটের দিনও সেই অভিযোগ আমলে না নেওয়ায় অভিনব ভাবে ভোট কারচুপির ও অনিয়মের প্রতিবাদ জানিয়েছেন রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল।

তিনি অনিয়মের  মাঝে নিজের ভোট দিতেও বিরত ছিলেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যেখানে ভোটের মূল্য নাই; যেখানে রাষ্ট্রের কর্মচারীরা ভোট চুরির সাথে সম্পৃক্ত, সেখানে আমার ভোটের কোনো দাম নেই,’। ভোটে জিতে গত পাঁচ বছর মেয়রের দায়িত্ব সামলানোর পর এবারও ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রার্থী হয়েছিলেন বুলবুল। তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন আওয়ামী লীগের এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন।

এবার  ভোটের শুরু থেকে কারচুপির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করে আসছিলেন বুলবুল।

সোমবার সকালে রাজশাহীর ১৩৮টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শুরু হওয়া কয়েক ঘণ্টা পর ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের ইসলামিয়া কলেজ কেন্দ্রে মেয়রের ব্যালট পেপার দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ আসে বুলবুলের কাছে। দুপুরের আগে ওই কেন্দ্রে ছুটে যান বুলবুল। কেন্দ্রের ভেতর ঘুরে এসে প্রতিবাদ জানাতে নিজের ভোট না দিয়ে প্রায় সোয়া তিন ঘণ্টা কলেজের মাঠে বসে পড়েন রাজশাহীর বিদায়ী মেয়র।

বিকাল ৪টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও রাজশাহীর সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু এসে বুলবুলকে তুলে আনেন। বুলবুল তখন সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে গণতন্ত্র বিপন্ন’ বলে তার এই প্রতিবাদ।

তিনি বলেন, ‘পুলিশ প্রশাসন, প্রিজাইডিং অফিসার, নির্বাচন কমিশনার, রিটার্নিং অফিসারসহ প্রধান নির্বাচন কমিশনার, সচিব, তাদের নীল নকশার বাস্তবায়ন রাজশাহীর এই নির্বাচন।’  

‘২৭ থেকে ৩১টা সেন্টারে গিয়ে ঘুরে দেখেছি, পুলিশের সহায়তায় অনেক কেন্দ্রে ভোট কাটা হইছে। অনিয়ম আমার চোখে ধরা পড়েছে।’

নিজের ভোট না দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে বিএনপি প্রার্থী বলেন, ‘বাংলাদেশের সাংবাদিক, সাধারণ মানুষ সবাই আজকে নিরূপায়।’

‘আমার প্রতিক্রিয়া হচ্ছে যে বিপন্ন গণতন্ত্র। আমি আমার ভোট পর্যন্ত দেইনি। যেখানে ভোটের মূল্য নাই। যেখানে রাষ্ট্রের কর্মচারীরা, ভোট চুরির সাথে সম্পৃক্ত। সেখানে আমার ভোটের কোনো দাম নেই।’

‘আমি মাননীয় অনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে শুধু এটুকু বলতে চাই- তার নিজের দিকে তাকাতে। তার আশপাশে যে কর্মচারী লোকজন রয়েছে-তাদের কাছে জিজ্ঞেস করতে যে, আমরা সঠিক কাজটি করছি কি না?’

এদিকে বুলবুলের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন ইসলামিয়া কলেজ কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল শাফি। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘উনি (বুলবুল) ১টার দিকে এখানে এসেছেন। আমাদের সঙ্গে কথা বলছেন, আমরাও বলেছি।’ ভোটগ্রহণে কোনো সমস্যা ছিল না বলে দাবি করেন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা।

পোলিং এজেন্ট বের করে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে আল শাফি বলেন, ‘পোলিং এজেন্ট যদি চলে যায়, নিয়োগপত্র যদি ঠিকমত না দেন, তাহলে তো আমরা কাউকে ঢুকতে দিতে পারি না। সাতজনের লিস্ট দিয়েছেন, একজনের স্বাক্ষর ছিল না। বাকিদের ঢুকতে দেওয়া হয়েছে।’

আরো পড়ুন : তিন সিটিতে প্রহসনের নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় ভোট দিন

নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজশাহী বরিশাল সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন তামাশায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বাম গণতান্ত্রিক জোটের নেতৃবৃন্দ। তারা একে প্রহসনের নির্বাচন বলে অভিযোগ করে তিন সিটি কর্পোরেশনে পুনরায় নির্বাচন দেয়ার দাবি জানান। এর পাশাপাশি তারা বাম গণতান্ত্রিক জোটের পক্ষ থেকে একটি তিন সিটির নির্বাচন নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিবেদনও তুলে ধরেন।

সোমবার জোটের এক সভায় এসব দাবি জানান হয়। সভায় বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোট জালিয়াতি, গুলিবর্ষন, নিপীড়ন, মেয়র প্রার্থীর ওপর বর্বরোচিত হামলা, পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়া, হুমকি প্রদানসহ যাবতীয় অপতৎপরতার মধ্য দিয়ে জনগণের ভোট দেয়ার অধিকার কেড়ে নেয়ার ঘটনার অভিযোগ করেন নেতৃবৃন্দ। তারা এ ধরণের ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, সরকারি প্রার্থী, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসন যৌথ তৎপরতার মধ্য দিয়ে সর্বশেষ এই তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকেও তামাশায় পরিণত করেছে। নেতৃবৃন্দ ¬প্রহসনের নির্বাচন বাতিল করে রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনে পুনরায় নির্বাচন দাবি করেন।


বাম গণতান্ত্রিক জোট তাৎক্ষনিক প্রতিবেদন
এদিকে সভায় বাম গণতান্ত্রিক জোটের পক্ষ থেকে তিন সিটি কর্পোরেশনের পরিস্থিতি নিয়ে তাৎক্ষনিক প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। এতে নেতৃবৃন্দ বলেন, এই তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সরকারের তৎপরতা ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ২০১৪ সাল থেকে আওয়ামী লীগ যেভাবে একতরফা দেশ শাসনের বন্দোবস্ত কায়েম করেছে, তারই ধারাবাহিকতা। এবং এই নির্বাচন বুঝিয়ে দিচ্ছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনও আদৌ কোনো ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য বা গণতান্ত্রিক কায়দায় করার বিন্দুমাত্র কোন ইচ্ছা এই আওয়ামী লীগ সরকারের নেই।

নেতৃবৃন্দ বলেন, বরিশালে হাতেনাতে জাল ভোট ধরার সময় বাসদের মেয়রপ্রার্থী মনীষা চক্রবর্তীর ওপর প্রকাশ্য দিবালোকে হামলা চালানো হয়। বরিশালে সিপিবি’র মেয়র প্রার্থী অ্যাড. আবুল কালাম আজাদের পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়, কাস্তে মার্কায় ভোট দেওয়া ব্যালেট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে নৌকার পোলিং এজেন্টরা ছিঁড়ে ফেলে এবং কেন্দ্রের সামনে উপস্থিত কর্মী সমর্থকদের নিগৃহীত করে। রাজশাহীতে গণসংহতির প্রার্থী মুরাদ মোর্শেদের প্রধান পোলিং এজেন্টের ওপর হামলা ও দুর্ব্যবহার, তাকে ভোট কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়। সিলেটে সিপিবি-বাসদ মেয়র প্রার্থী আবু জাফর একই ধরনের আচরণের সম্মুখীন হন।

সব জায়গায় প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে না দেয়া বা কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ার মত ঘটনা যেমন ঘটেছে, তেমনি ঘটেছে কেন্দ্র দখল করে অবাধে সিল মারা, ভোটারদের ভীতি প্রদর্শন এবং অপেক্ষমান ভোটারদের কেন্দ্রে ঢুকতে না দেয়ার মতো ঘটনাও। এসব নিয়ে অভিযোগ করা হলেও রিটানিং অফিসার ও নির্বাচন কমিশন ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থা নেয়ার আগ্রহ প্রদর্শন করেনি। অর্থ, অস্ত্র ও প্রশাসনের ক্ষমতার সাথে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও ছিল ন্যক্কারজনক. তারা বাংলাদেশে নির্বাচনকে, ভোটের অধিকার হরনকে প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা দেয়ার কাজটিতে বৈধতা প্রদান করেছে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, এই পুরো ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রমানিত হয়েছে যে, বর্তমান সরকারের জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের ন্যূনতম কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত হিসেবে জাতীয় নির্বাচনের আগে অবশ্যই বর্তমান সরকারকে পদ্যতাগ করতে হবে, আলোচনার ভিত্তিতে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হবে। বর্তমান অথর্ব নির্বচন কমিশনকেও পদত্যাগ করে জাতীয় সমঝোতার ভিত্তিতে অনুসন্ধানের মাধ্যমে গঠিত নতুন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন ছাড়া ভোটের অধিকার পুনপ্রতিষ্ঠার আর কোন উপায় নেই বলে নেতৃবৃন্দ মত প্রকাশ করেন।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক সাইফুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় উপস্থিত ছিলেন সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম, বাংলাদেশের সমাজাতান্ত্রিক দল বাসদ (মার্কসবাদী)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, বাসদেদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বজলুর রশীদ ফিরোজ, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার, গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য ফিরোজ আহমেদ, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের আহ্বায়ক হামিদুল হক, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা মোমিনুর রহমান বিশাল, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির বহ্নিশিখা জামালী, সিপিবি’র আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, বাসদ (মার্কসবাদী) ফখ্রুদ্দীন কবীর আতিক।


আরো সংবাদ