২১ নভেম্বর ২০১৮

ধরপাকড় ভয়ভীতি আতঙ্ক তিন সিটিতে

নির্বাচন
বরিশালে প্রচারণা চালাতে গিয়ে পুলিশী বাধার শিকার হন বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার - ছবি : নয়া দিগন্ত

টানা ১৬ দিন প্রচার-প্রচারণা শেষে আগামীকাল ৩০ জুলাই সোমবার অনুষ্ঠিত হবে রাজশাহী বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন। ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচনী প্রচারণা চালালেও পুলিশের লাগাতার অভিযানে নির্বাচনী মাঠে ছত্রভঙ্গ বিএনপি ও জামায়াত কর্মীরা। প্রচারণা শুরুর পর থেকে গতকাল শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পুলিশি অভিযানে কয়েক হাজার বিএনপি নেতাকর্মী গ্রেফতার হওয়ায় এ দলের নির্বাচনী এজেন্টরা আতঙ্কিত। এজেন্টদের গ্রেফতার ছাড়াও কর্মী-সমর্থকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটকেন্দ্রে আসতে নিষেধ করা হচ্ছে। বিরোধী মতের প্রার্থীর এজেন্ট বা কর্মীকে না পেয়ে তার স্ত্রী ও ছেলেকে আটকের ঘটনাও ঘটেছে।

২০ দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ- নির্বাচনী মাঠে আওয়ামী লীগের দুইটি গ্রুপ একসাথে কাজ করছে। দলীয় নেতাকর্মী আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাল হিসেবে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আর আঘাতকারী হিসেবে রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। তারা মরিয়া হয়ে উঠেছে বিজয় ছিনিয়ে নিতে। একই কায়দায় খুলনা ও গাজীপুরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নীরব রেফারির ভূমিকায় রয়েছে নির্বাচন কমিশন।

তিন সিটি এলাকার স্থানীয় লোকজন এবং নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিজস্ব পর্যবেক্ষকদের সাথে আলাপে জানা গেছে, মানুষের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা কাজ করছে ভোটের দিন সুষ্ঠু ভোট হবে কি না তা নিয়ে। ফলে তারা কেউ আগাম মুখ খুলতে নারাজ। তবে ভোটারেরা নীরব থাকায় চূড়ান্ত কোনো কথা এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এ নির্বাচনে সরকার বিরোধী প্রার্থীদের ভরসা ভোটার আর আওয়ামী লীগ প্রার্থীর আস্থা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ইসির আনুকূল্য। বিএনপি প্রার্থী দলীয় নেতাকর্মীদের পুলিশ হয়রানি করছে বলে অভিযোগ করছেন। তবে ইসি এসব অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করে আসছে।

আপাত দৃষ্টিতে তিন সিটিতেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করলেও ভেতরে রয়েছে চাপা উত্তেজনা। শহরজুড়ে চলছে বিজিবি ও পুলিশি টহল। বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চলছে পুলিশি অভিযান। হোটেল-রেস্তোরাঁয় পুলিশি নজরদারি।

ভোটের দিন পুলিশের ভূমিকা কী হবে এ নিয়ে নীরব উত্তাপ রয়েছে তিনি সিটিতে। খুলনা ও গাজীপুর সিটির আদলে নির্বাচন নাকি শান্তিপূর্ণ ভোট হবে এ নিয়ে ভোটার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে শঙ্কা কাজ করছে। এত কিছুর পরও শঙ্কামুক্ত নির্বাচন দেখতে ভোটের দিন পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকবে ভোটারেরা।

ভোটের এক দিন আগে গতকাল প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা বিজয়ী হবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন। তবে অভিযোগও করেছেন তারা। ভোট ডাকাতি হবে এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট প্রার্থীরা। অপর দিকে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা সুষ্ঠু ভোট হবে এমন প্রত্যাশা জানিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনও বলেছে, ভোট সুষ্ঠু হবে। তবে যে পক্ষ যা-ই বলুক না কেন, ভোটারদের সাথে আলাপকালে তারা ভোট দিতে পারবেন কি না সেই শঙ্কার কথা প্রকাশ করেছেন।

তিন সিটিতে ১৮ জন মেয়রপ্রার্থী লড়ছেন। রাজশাহীতে পাঁচজন, বরিশালে ছয়জন এবং সিলেট সিটিতে সাতজন। তবে সবখানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে এটা প্রায় নিশ্চিত। তিন সিটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী লড়ছেন পাঁচজন।
শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচনের জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ভোট কেন্দ্রগুলোতে আজ নির্বাচনসামগ্রী পাঠানো হবে। সিটির অস্থায়ী রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে এ সামগ্রী বুঝে নেবেন ভোট কর্মকর্তারা। ভোটগ্রহণ উপলক্ষে সিটি এলাকাগুলোতে থাকবে সরকারি ছুটি। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ।

নির্বাচন কমিশন সচিব মো: হেলালুদ্দীন আহমদ এ প্রসঙ্গে বলেন, তিন সিটিতে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে। মাঠে নেমেছে র্যাব-বিজিবি। সকাল থেকেই সিটিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টহল দেয়া শুরু করেছে। ভোটের দিন পর্যন্ত এ পরিবেশ বজায় থাকবে বলে জানান সচিব।

ইসির পর্যবেক্ষক :
ভোটের দিন প্রতিটি কেন্দ্রে ভোট কার্যক্রমের গতি-প্রকৃতি, ভোটার, প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকদের গতিবিধি সর্বোপরি নির্বাচনী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন সব কিছু ঘুরে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করবেন ইসির নীরব পর্যবেক্ষকেরা। ভোটে কোনো অনিয়ম দেখলে তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ, রিটার্নিং কর্মকর্তাকে অবহিত করা এবং প্রয়োজনে কমিশনকে ঘটনার তথ্য জানাবেন তারা। এ ধরনের পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে ৩৫ জন, যার মধ্যে রাজশাহী ও বরিশালে ১২ জন করে এবং সিলেটে ১১ জন।

স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক :
নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন ৬০৯ জন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক। এদের ৫৯২ জন দেশের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ সংস্থার সদস্য এবং ১৭ জন যুক্তরাজ্যসহ তিনটি দেশের সংস্থা। রাজশাহীতে ১৯২ জন স্থানীয় ও সাতজন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, বরিশালে ২০৩ জন স্থানীয় ও তিনজন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, সিলেটে ১৯৭ জন স্থানীয় ও সাতজন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দায়িত্ব পালন করবেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী :
শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণের জন্য ২৪৮ প্লাটুন বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। প্রতিটি ভোট কেন্দ্রের জন্য পুলিশসহ ২২ জন আনসার ভিডিপি সদস্য এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ২৪ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন থাকবেন। ৮৭ প্লাটুন র্যাব সদস্য মোতায়েন থাকবে। এর মধ্যে রাজশাহী ও বরিশালে ৩০ প্লাটুন এবং সিলেটে ২৭ প্লাটুন। এ ছাড়া রাজশাহী ও বরিশালে ১৫ প্লাটুন এবং সিলেটে ১৪ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

রাজশাহী সিটি নির্বাচন :
রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে পাঁচজন, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১৬০ জন এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৫২ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এখানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ সিটিতে আওয়ামী লীগের এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন এবং বিএনপির মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল মেয়র পদে। ৩০টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ সিটিতে ভোটার তিন লাখ ১৮ হাজার ১৩৮ জন। পুরুষ ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৫ জন এবং নারী ১ লাখ ৬২ হাজার ৫৩ জন। নির্বাচনে ১৩৮টি ভোটকেন্দ্র ও ১ হাজার ২৬টি ভোটকক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে ১১৪টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ।

বরিশাল সিটি নির্বাচন :
বরিশাল সিটিতে ১২৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১১২টিই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। ৫৫টি ভোটকেন্দ্র অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বরিশালে সাতজন মেয়রপ্রার্থী রয়েছেন। এদের মধ্যে বশিরুল হক ঝুনু নামে এক স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে গেছেন। বাকি ছয়জন মেয়রপ্রার্থী মাঠে রয়েছেন। সাধারণ ৩০টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩টিতে এবং একটি সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। বাকি ২৭টি সাধারণ ওয়ার্ডে ৯১ জন এবং ৯টি সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৩৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ সিটিতে ভোটা ২ লাখ ৪২ হাজার ১৬৬ জন, যার মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ২১ হাজার ৪৩৬ ও নারী ভোটার ১ লাখ ২০ হাজার ৭৩০ জন। এ সিটিতে বিএনপির মো: মজিবর রহমান সরোয়ার এবং আওয়ামী লীগের সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ্ মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

সিলেট সিটি নির্বাচন :
সিলেট সিটি নির্বাচনে সাতজন মেয়রপ্রার্থী হলেও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মো: বদরুজ্জামান সেলিম নির্বাচন থেকে সরে গেছেন। বাকি ছয়জন মেয়রপ্রার্থী মাঠে রয়েছেন। আওয়ামী লীগের বদর উদ্দীন আহমদ কামরান এবং রয়েছেন বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরী। এ ছাড়া জামায়াতের প্রার্থী এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। এ সিটিতে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ জন ভোটার। পুরুষ ১ লাখ ৭১ হাজার ৪৪৪ এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৫০ হাজার ২৮৮ জন। ২৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত সিলেট সিটিতে সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১২৭ জন এবং সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৬২ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ সিটিতে ১৩৪টি ভোটকেন্দ্র ও ৯২৬টি ভোটকক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে ৮০টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।


আরো সংবাদ