২০ অক্টোবর ২০১৮

জিসিসি’র ভোট ঘনিয়ে আসায় বাড়ছে উত্তাপ ও উত্তেজনা

নির্বাচন
গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল বোর্ড বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে ইফতার মাহফিলে যোগ দেন - নয়া দিগন্ত

নবঘোষিত তারিখ অনুযায়ী আরো একমাস পর আগামী ২৬ জুন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের এবারের নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচনের আনুষ্ঠাণিক প্রচারণা আরো ২০ দিন পর ১৮ জুন থেকে শুরু করার কথা থাকলেও কোনো প্রার্থীই বসে নেই তাদের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা থেকে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিদিনই তারা বিভিন্ন কৌশলে নির্বাচনী এলাকায় সভা ও গণসংযোগ করছেন ভোটার এবং কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে। কেন্দ্রীয় নেতারাও এসব নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে তাদের সহযোগিতা করছেন।

নির্বাচনের সকল প্রার্থী ও তাদের কর্মী সমর্থকদের পদচারণায় গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন (জিসিসি) এলাকা ক্রমেই আবারো সরব হয়ে উঠছে। নির্বাচনী প্রচারণা ও ভোট গ্রহণের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকসহ সবার মাঝে বাড়ছে উত্তাপ ও উত্তেজনা। নির্বাচনী আচরণবিধিকে কৌশলে পাশ কাটিয়ে সকল প্রার্থীই নির্ধারিত সময়ের আগে থেকেই গণসংযোগ শুরু করলেও তারা প্রায়শঃ নানা কারণে একে অপরের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ করছেন।

নির্বাচনে মেয়র পদের প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার রোববার তার প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমসহ মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে আচরণভঙের অভিযোগ নির্বাচন কমিশনের কাছে করেছেন।

এবারের নির্বাচনে মেয়র পদে ৭জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও সবার দৃষ্টি হেভিওয়েট দুই প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থী (নৌকা) অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী (ধানের শীষ) হাসান উদ্দিন সরকারের দিকে। হেভিওয়েট এ দুই প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা প্রতিদিনই রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন এবং গণসংযোগ ও বৈঠক করে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। তারা ভোট গ্রহণ পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত ও বিষয়কে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। নিজ দলের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে উভয় দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ এ দু’প্রার্থীকে সহযোগিতা করছেন নানা পরামর্শ দিয়ে ও কৌশল নির্ধারণ করে। তারা নির্বাচনী আচরণবিধিকে কৌশলে পাশ কাটিয়ে স্থানীয় কর্মী-সমর্থক ও ভোটারদের সঙ্গে বৈঠক ও সভা করছেন এবং দলীয় প্রার্থীর জন্য ভোট প্রার্থনা করছেন। অংশ নিচ্ছেন বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে। নির্বাচনে অন্য প্রার্থীরাও বসে নেই। তারাও প্রতিদিন রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ভোটারদের খোঁজে বাড়ি ও অফিস কারখানায় যাচ্ছেন এবং গণসংযোগ ও বৈঠক করে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।

নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর মিডিয়া সেলের মোহাম্মদ আলম জানান, ১৪ দলীয় জোট সমর্থিত আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র পদপ্রার্থী (নৌকা) জাহাঙ্গীর আলম মাহে রমযান উপলক্ষে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের কয়েকটি স্থানে আয়োজিত আলোচনাসভা ও দোয়া ও ইফতার মাহফিলে যোগ দিয়ে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন।

মহানগর আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম. মোজাম্মেল হক এমপি রোববার বিকেলে গাজীপুর মহানগরের ৫ নম্বর ওয়ার্ড বাগবাড়ি মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত আলোচনা সভা, দোয়া ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন।

মন্ত্রী উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে বলেন, গাজীপুরের মানুষের বিপদ-আপদে তাদের পাশে থেকে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম ইতোমধ্যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার সেবামূলক কাজ অব্যহত রাখার লক্ষ্যে নগরপিতা হিসাবে জাহাঙ্গীরকে নির্বাচিত করার জন্য মন্ত্রী সবার কাছে আহ্বান জানান।

এদিকে গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল গাজীপুর সিটির প্রস্তাবিত গাছা থানা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আয়েজিত ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের বোর্ড বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আলোচনা সভা, দোয়া ও ইফতার মাহফিলে যোগ দেন। এসময় তিনি উপস্থিত মুসল্লীদের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় করেন। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জাহিদ আহসান রাসেল এমপি বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে গাজীপুর মহানগরের প্রতিটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক উন্নয়ন করা হয়েছে। তিনি গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের এবারের নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে বিজয়ী করে সরকারের উন্নয়ন ধারাকে অব্যাহত রাখার জন্য সকলের প্রতি তিনি আহবান জানান।

এসময় অন্যান্যের মধ্যে মহানগর আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি মো রেজাউল করিম, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক ডা: মোজাফ্ফর হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী ইলিয়াস আহমেদ, অধ্যক্ষ মহিউদ্দিন মহি, শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক মো: আশরাফুল আলম আসকর, সদস্য মো: গিয়াস উদ্দিন মোল্লা, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ সাধারণ সম্পাদক কাউন্সিলর প্রার্থী মো: মনিরুজ্জামান মনির, বোর্ড বাজার মোহর খান ওয়াকফ এস্টেটের মোতওয়াল্লি মো: গিয়াস উদ্দিন খান, সাবেক চেয়ারম্যান মো: সিরাজুল ইসলাম, হাজী আ: রশীদ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

অপরদিকে ধানের শীষ প্রতীকের মিডিয়া সেলের প্রধান সমন্বয়ক ডা. মাজহারুল আলম জানান, ২০ দলীয় জোট সমর্থিত বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী (ধানের শীষ) হাসান উদ্দিন সরকার রোববার গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের গাছা অঞ্চলের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির এক ইফতার মাহফিলে শরিক হন। ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আজিজুর রহমানের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক হাজী মোখলেছুর রহমানের সঞ্চালনায় ইফতারপূর্ব মাহে রমজানের তাৎপর্য শীর্ষক আলোচনা সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন, বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও গাজীপুর জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক এমপি ফজলুল হক মিলন ও সাধারণ সম্পাদক কাজী সাইয়েদুল আলম বাবুল, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ডা. মাজহারুল আলম, জেলা বিএনপির সহসভাপতি মীর হালিমুজ্জামান ননী, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব উদ্দিন, গাছা সাংগঠনিক থানা বিএনপির সভাপতি মো. মোশারফ হোসেন খান ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হামিদ, জামায়াত নেতা নিয়াজ উদ্দিন মাস্টার, সদর থানা জাসাস সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার ইদ্রিস খানসহ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।

সভায় বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার বলেন, ধানের শীষের পক্ষে গণজোয়ার দেখে আওয়ামী লীগ পবিত্র রমজান মাসেও নির্বাচনী প্রচারণায় উঠেপড়ে লেগেছে। তারা মাহে রমজানের পবিত্রতা ও তাৎপর্য ভুলে গিয়ে দোয়া ও ইফতার মাহফিলের নামে নির্বাচনী সভার বক্তৃতায় মিথ্যাচার ও বিষোদগার করছে, যা কোন মুমিন-মুসলমানের কাম্য হতে পারে না।

তিনি আরো বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়রপ্রার্থী ও তার পক্ষে মন্ত্রী-এমপিরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করে যেভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছেন তাতে আমাদের নেতাকর্মীদের চাপে আমাকেও নির্বাচনী পচারণার জন্য ঘর থেকে বের হতে হচ্ছে।

আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ বিএনপি’র মেয়র প্রার্থীর
এদিকে আচরণবিধি লঙ্ঘন করে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়রপ্রার্থীর পক্ষে মন্ত্রী-এমপিরা নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন বলে রোববার রিটার্নিং অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী (ধানের শীষ) হাসান উদ্দিন সরকার।

অভিযোগে তিনি বলেন, আমি এ যাবত নির্বাচনী আচরণবিধি যথাযথভাবে প্রতিপালন করে আসছি। অপরদিকে গাজীপুর সিটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই আওয়ামীলীগ মনোনীত মেয়র পদপ্রার্থী ও তার সমর্থকেরা একের পর এক আচরণবিধি লঙ্ঘন করে সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ বানচাল করছেন। আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়র পদপ্রার্থী নিজে ও তাঁর পক্ষে প্রতিদিনই নগরির বিভিন্ন এলাকায় প্রচারণা চালাচ্ছেন। এমনকি মন্ত্রী-এমপিগণ আচরণবিধি লঙ্ঘন করে তাদের দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে ভোট চাচ্ছেন। যা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আচরণ বিধিমালার ২২ নং বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

তিনি দরখাস্তে গত ২১ মে রিটার্নিং কর্মকর্তার জারিকৃত গণবিজ্ঞপ্তির উদ্ধৃতি দিয়ে আরো বলেন, ‘১৮ জুৃন ২০১৮ গণবিজ্ঞপ্তি জারির পূর্বে কোন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তার পক্ষে কোন রাজনৈতিক দল, অন্য কোন ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান নির্বাচনী প্রচার শুরু করতে পারবেন না। কিন্তু আওয়ামীলীগ মনোনীত মেয়রপদপ্রার্থী ও তার পক্ষে মন্ত্রী-এমপিগণ এবং তাদের দলীয় নেতাকর্মীরা নির্বাচনী আচরণবিধি ও জারিকৃত এ গণবিজ্ঞপ্তির কোন তোয়াক্কা করছেন না। এব্যাপারে ধানের শীষ প্রতীকের মেয়র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা প্রতীকের মেয়র পদপ্রার্থী ও তার পক্ষে মন্ত্রী-এমপি ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরকে নির্বাচনী আচরণবিধি যথাযথভাবে মেনে চলার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশনের কাছে অনুরোধ জানান।

গাজীপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো: তারিফুজ্জামান জানান, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের এবারের নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থীসহ সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন। এদের মধ্যে ছয়জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনীত এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। এছাড়াও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ৫৭টি সাধারণ ওয়ার্ডের সাধারণ আসনের কাউন্সিলর পদে ২৫৪ জন এবং ১৯টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর পদে ৮৪ জন প্রার্থী এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এবারের নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডে সাধারণ আসনের কাউন্সিলর পদে একজন প্রার্থী বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

তিনি আরো জানান, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের মোট আয়তন ৩২৯ দশমিক ৫৩ বর্গকিলোমিটার। এবার গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ৫৭টি সাধারণ ও ১৯টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে মোট ভোটার সংখ্যা ১১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫লাখ ৬৯ হাজার ৯৩৫ এবং নারী ভোটার ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮০১।


আরো সংবাদ