১৯ নভেম্বর ২০১৯

মৃত্যুর আগে বারবার পানি চেয়েছিল আবরার, এক ফোঁটাও মেলেনি

মৃত্যুর আগে বারবার পানি চেয়েছিল আবরার, এক ফোঁটাও মেলেনি - ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে কয়েক দফা বেধড়ক মারধরে সে যখন টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহৃত ২০১১ নম্বর কক্ষের মেঝেতে লুটে পড়ছিল, তখন বারবার পানি খেতে চেয়েছিল কিন্তু তাকে এক ফোঁটা পানিও দেয়া হয়নি। এমনকি অচেতন হয়ে পড়ায় ঘটনাস্থলে থাকা জুনিয়ররা আবরারকে হাসপাতালে নিতে চাইলেও সিনিয়ররা নিতে দেয়নি। আবরার হত্যাকাণ্ডের এমন নির্মম দৃশ্য উঠে এসেছে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র এ এস এম নাজমুস সাদাতের বর্ণনায়। গতকাল বুধবার ঢাকা মহানগর হাকিমের আদালতে সাদাত সাংবাদিকদের বলেন, আবরারকে অনিক সরকার, সকাল, মোজাহিদ ও মনির ভাইসহ ১৫ ও ১৬ ব্যাচের ভাইরা বেশি মেরেছে। আবরার পানি খাইতে চাইলে পানি দেয়া হয়নি। আমরা ভাইদের বলেছিলাম হাসপাতালে নিয়ে যাইতে, ভাইরা নিতে দেয় নাই।

তিনি আরো বলেন, মনির ভাই আমাদের বলে, আবরারকে রুম থেকে ডেকে নিয়ে আসতে। তখন আমরা আবরারকে ডেকে নিয়ে আসি। আমি রাত সাড়ে ১২টায় রুমে চলে আসি।

জানা গেছে, আবরার মৃত্যুর পরপরই গা ঢাকা দেয় সাদাত। ঘটনার সাত দিন পর ভারতে পালানোর সময় গত সোমবার দিবাগত রাতে দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল তাকে গ্রেফতার করে। তাকে নিয়ে হত্যার ঘটনায় এ পর্যন্ত ২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার এড়াতে দিনাজপুরের হিলি সীমান্ত দিয়ে সাদাত ভারতে পালানোর চেষ্টায় ছিলেন বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিসি (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান জানান, হত্যাকাণ্ডের পর থেকে সাদাত পলাতক ছিলেন। পরবর্তীতে সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টায় গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ডিবির একটি দল দিনাজপুরের বিরামপুর থানাধীন কাটলা বাজার এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে। তিনি জয়পুরহাটের কালাই থানার কালাই উত্তরপাড়ার হাফিজুর রহমানের ছেলে।

এ দিকে আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র এ এস এম নাজমুস সাদাতের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর ডিবির লালবাগ জোনাল টিমের পুলিশ পরিদর্শক মো: ওয়াহিদুজ্জামান এ আসামিকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম মোর্শেদ আল মামুন ভূঁইয়া এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তা রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করেনÑ সাদাত মামলার এজাহারনামীয় ১৫ নম্বর আসামি। মামলার তদন্ত, সাক্ষ্য প্রমাণ ও ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা এবং পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণে এ আসামি মামলার ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকা সম্পর্কে যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। ইতঃপূর্বে এ মামলায় আদালতে স্বীকারোক্তিকারীদের মধ্যে কয়েকজন এ আসামি জড়িত মর্মে নাম প্রকাশ করেছেন। তাই মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের জন্য এ আসামিকে ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। শুনানিকালে আসামি নাজমুস সাদাতের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। রিমান্ড শুনানিকালে রাষ্ট্রপক্ষে পুলিশের জিআরো এসআই মাজহারুল ইসলাম ও সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর হেমায়েত উদ্দিন খান হিরণ রিমান্ড আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন। এরপর আসামি নাজমুস সাদাতের পক্ষে কোনো আইনজীবী না থাকায় বিচারক তাকে জিজ্ঞাসা করেন কিছু বলার আছে কি না? জবাবে তিনি বলেন, আমি বড় ভাইদের কথায় আবরারকে রুম থেকে ডেকে এনে দিই। আমি আবরারকে মারিনি। এরপর বড়ভাই কারা বিচারকের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, অনিক, সকাল, মুজাহিদ, রবিন ও মনির। এরপর বলেন, ওরাই আবরারকে মারে। আমি রাত সাড়ে ১২টায় চলে আসি। এরপর কী হয়েছে জানি না।

আবরার হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত ছয়জন আসামি হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দী দিয়েছেন। তারা হলেন- বুয়েট ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মো: অনিক সরকার, উপসমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল, ক্রীড়া সম্পাদক মো: মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন, মো: মনিরুজ্জামান মনির ও শিক্ষার্থী মো: মুজাহিদুর রহমান। এ ছাড়া রিমান্ড শেষে কারাগারে রয়েছেন, বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুহতামিম ফুয়াদ, কর্মী মুনতাসির আল জেমি, গ্রন্থ ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক ইসতিয়াক আহম্মেদ মুন্না, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভির, আকাশ হোসেন ও মিজানুর রহমান। তারা সবাই ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত।

এ দিকে রিমান্ডে রয়েছেন, বুয়েট ছাত্রলীগের আইন বিষয়ক উপসম্পাদক অমিত সাহা, বুয়েটের শিক্ষার্থী শামীম বিল্লাহ, মুয়াজ ওরফে আবু হুরায়রা, সামছুল আরেফিন রাফাত ও হোসেন মোহাম্মাদ তোহা।

প্রসঙ্গত, গত ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েট শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় বুয়েটের ১৭তম ব্যাচের ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র আবরার ফাহাদ রাব্বীকে। এ ঘটনায় তার বাবা বরকত উল্লাহ বাদি হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।


আরো সংবাদ