১৭ অক্টোবর ২০১৮
ঢাবির ভর্তিতে অধিকাংশ ফেল

কী শিখছে ছাত্ররা?

শিক্ষার মান আবারো প্রশ্নবিদ্ধ - ছবি : নয়া দিগন্ত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় নিম্ন পাসের হার নিয়ে আবারো প্রশ্ন দেখা দিয়েছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মান নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৮-১৯ স্নাতক শিক্ষাবর্ষে ‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা যায়, তিনটি ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় গড় পাসের হার ১২ দশমিক ৬৭। অর্থাৎ এ ভর্তি পরীক্ষায় ৮৭ দশমিক ৩৩ ভাগ শিক্ষার্থী পাস নম্বর তুলতে পারেনি। অপর দিকে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় ‘ক’, ‘খ’ ‘গ’ ও ‘ঘ’ ইউনিটে গড় পাসের হার ছিল মাত্র ১০ ভাগ। অর্থাৎ ওই বছর ৯০ ভাগ পরীক্ষার্থী পাস নম্বর তুলতে ব্যর্থ হয়। অথচ অনুত্তীর্ণ এসব পরীক্ষার্থীর অনেকেরই এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় জিপিএ ৫ ছিল। 

গত ১৯ জুলাই প্রকাশিত হয় এ বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল। তাতে দেখা যায় ১০টি শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসি গড় পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ২০১৭ সালে এর হার ছিল ৬৮ দশমিক ৯১ শতাংশ । 
এ বছর ১০ শিক্ষা বোর্ডে পাস করেছে ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৮০১ জন। এর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছেন ২৯ হাজার ২৬২ জন। গতবার জিপিএ ৫ পান ৩৭ হাজার ৯৬৯ জন। 

২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজি বিভাগে ভর্তির জন্য মাত্র দু’জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়। এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয় সারা দেশে। একইভাবে দেশবাসী হতবাক হয়ে যায় ওই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘খ’ ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় ৯০ ভাগ শিক্ষার্থী পাস নম্বর তুলতে না পারায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের এ ফলাফলে প্রশ্ন দেখা দেয় হাজার হাজার জিপিএ ৫, গোল্ডেন জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর শিক্ষার মান এবং যোগ্যতা নিয়ে। সেই সাথে প্রশ্নের মুখোমুখি হয় দেশের গোটা শিক্ষাব্যবস্থা। এ নিয়ে ঝড় বইতে শুরু হয় দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষার মান নিয়ে। দীর্ঘ দিন ধরে আলোচনা চলে শিক্ষার এ করুণ পরিস্থিতি নিয়ে । 

২০১১ সাল থেকে টানা কয়েক বছর এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ ৫ এর বন্যা বয়ে যায়। পাসের বন্যা, বিপুুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জিপিএ ৫ পাওয়ার পর থেকে শিক্ষার মান নিয়ে কয়েক বছর ধরে আলোচনা চলছিল।

বাড়ছিল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিভিন্ন মহলে। অবশেষে ২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় পাস এবং জিপিএ ৫ প্রাপ্তি বেড়েছে কিন্তু শিক্ষার মান বাড়েনি। বরং অনেকের মতে এর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। জিপিএ ৫, গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়েও দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পাওয়া হাজার হাজার শিক্ষার্থী এবং তাদের মা-বাবার আর্তি গত কয়েক বছর ধরে নিয়মিত খবরের শিরোনাম। গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়েও ভর্তি হতে হয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সাধারণ মানের কোনো কলেজে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে অহরহ। এ নিয়ে শিক্ষার্থী, তাদের মা-বাবা এবং পরিবারের মধ্যে নেমে আসে অস্থিরতা।

জিপিএ ৫ পেয়েও কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায়ই উত্তীর্ণ হতে না পেরে পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং সমাজের কাছে চূড়ান্ত বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে। জিপিএ ৫ পাওয়া নিয়ে গৌরব করার পর ভর্তি পরীক্ষায় পাস করতে না পারায় তারা আর কারো কাছে মুখ দেখাতে পারছেন না। এরই প্রেক্ষিতে ২০১৪ সালের পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার যে চিত্র উন্মোচিত হয়েছে, তা জাতির জন্য অশনিসঙ্কেত বলে মনে করেন অনেকে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষার মানের প্রকৃত চিত্র বারবার ফুটে উঠেছে বলে মনে করেন শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষাবিদ, গবেষকসহ অনেকে। তাদের মতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় অরাজকতা বিরাজ করছে এবং বারবার তার খোলস উন্মুক্ত হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে। 

অনেকের মত, এসএসসি ও এইচসসির মতো পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল নয় বরং বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলই হয়ে ওঠে মেধাবী ও অমেধাবীদের মানদণ্ড। 

২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় গণহারে ফেল করা নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয় দেশজুড়ে। এমনকি সরকারের উচ্চপর্যায়ের কোনো কোনো কর্মকর্তাও জড়িয়ে পড়েন এ বাদানুবাদে। অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে চায়ের দোকান টিভি টকশো সর্বত্র শিক্ষাব্যবস্থা এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা। অবজেকটিভের পর সৃজনশীল পদ্ধতি, পরীক্ষাপদ্ধতি, পাস এবং জিপিএ ৫ এর বন্যা, প্রশ্নফাঁস এসব নিয়ে চলে নানা শ্লেষাত্মক মন্তব্য, ব্যঙ্গবিদ্রƒপ। এবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের নিম্ন পাসের হার নিয়ে সমালোচনা চলছে। 

এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পাওয়া ৭০ ভাগ শিক্ষার্থী পাস নম্বরই তুলতে পারেনি ২০১৪ সালের ঢাবি ভর্তি পরীক্ষায়। ২০১৩ সালে ৫৬, ২০১২ সালে ৫৫ এবং ২০১১ সালে ৫৩ ভাগ শিক্ষার্থী যারা উভয় পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছিল তারা পাস নম্বর তুলতে পারেনি ঢাবি ভর্তি পরীক্ষায়। 

২০১৪ সালে ১৩ আগস্ট প্রকাশিত এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১০টি শিক্ষা বোডের্র গড় পাসের হার ছিল ৭৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। জিপিএ ৫ পায় ৭০ হাজার ৬০২ জন। অথচ ২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় চারটি ইউনিটে গড় পাসের হার মাত্র ১৬ শতাংশ। 

২০১৩ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় গড় পাসের হার ছিল ৭৪ দশমিক ৩০ শতাংশ। জিপিএ ৫ পায় ৫৮ হাজার ১৯৭ জন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচটি ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় গড় পাসের হার ছিল ১৯ ভাগ। 
২০১২ সালে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় দশটি বোর্ডের গড় পাসের হার ৭৮ দশমিক ৬৭। মোট জিপিএ ৫ পায় ৬১ হাজার ১৬২ জন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচটি ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় পাস করে শতকরা ১৭ ভাগ শিক্ষার্থী। 
২০১১ সালে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের গড় হার ছিল ৭৫ দশমিক ০৮ শতাংশ। জিপিএ ৫ পায় ৩৯ হাজার ৭৬৯ জন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় পাসের শতকরা হার ছিল ১৯। 
২০১৭ সালে ঢাবি চারটি ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় গড় পাসের হার ১৭ দশমিক ২৫ । 
এ বছর ‘ক’ ইউনিটে ১৩ দশমিক ০৪, ‘খ’ ইউনিটে ১৪ এবং ‘গ’ ইউনিটে ১০ দশমিক ৯৮ ভাগ শিক্ষার্থী পাস নম্বর তুলতে সমর্থ হন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রফেসর ড. মো: আবুল এহসান নয়া দিগন্তকে বলেন, পাবলিক পরীক্ষায় সঠিকভাবে মেধার মূল্যায়ন হচ্ছে না। সে কারণে পাবলিক পরীক্ষায় উচ্চপাসের হার, বিপুলসংখ্যক জিপিএ ৫ পাওয়ার পরও তারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হচ্ছে। তিনি বলেন, শিক্ষার মান নিম্নমুখী হচ্ছে তাতে সন্দেহ নেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমেই যে পুরোপুরি মেধা যাচাই হচ্ছে তা-ও বলা ঠিক হবে না। কারণ শুধু মেধা যাচাই করার উদ্দেশ্যে এখানে প্রশ্ন করা হয় না। সব প্রশ্নের ধরনও সে রকম নয়। তবে তারপরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে তার মধ্যে এটাই এখন পর্যন্ত মেধা যাচাইয়ের একটি উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।


আরো সংবাদ