২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

কালো তালিকাভুক্ত ভারতীয় প্রতিষ্ঠান পেল পাঠ্যবই মুদ্রণ

পাঠ্যবই - ছবি : সংগৃহীত

প্রাথমিকে বিনামূল্যের পাঠ্যবই মুদ্রণের কাজ পেল ‘কালো তালিকাভুক্ত’ ভারতীয় মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। ভারতীয় প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতেই জাতীয় শিক্ষা ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রাথমিকে পাঠ্যবই মুদ্রণের কাজের পুনঃদরপত্র আহ্বান করেছে বলে অভিযোগ দেশীয় মুদ্রণ ব্যবসায়ীদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প মালিক সমিতির। তারা বলছে, পুনঃদরপত্র না করে প্রাথমিকের কার্যাদেশ দেয়া যেত, যদি দরপত্র পুনঃমূল্যায়ন করা হতো। এতে অর্থ ও সময় দুটোই সাশ্রয় হতো এবং নির্ধারিত সময়েই বই পাওয়া যেত।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আগামী ২০১৯ শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যে পাঠ্যবই ছাপার জন্য দাতাদের কোনো সহায়তা না নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় বই মুদ্রণে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক বা অন্য কোনো দাতা সংস্থার চাপও ছিল না। এই অবস্থায় দেশীয় মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়ার জন্যই এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা পুনঃদরপত্র আহ্বানের নাটক সাজিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। 

মুদ্রণ শিল্প মালিক সমিতি বলছে, নাটকের অংশ হিসেবেই দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিতে দু’জন সদস্যকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যাদের এ ব্যাপারে কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তবে এনসিটিবির চেয়ারম্যান এসব অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে নয়া দিগন্তকে বলেছেন, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিই সব করেছে। এ ক্ষেত্রে তার কোনো ভূমিকা নেই। 
এ দিকে প্রাথমিকের সাড়ে ১১ কোটি বই মুদ্রণ জটিলতা আপাতত নিরসন হলেও পুনঃদরপত্রের কার্যাদেশ দেয়ার পর মুদ্রণকারীদের সাথে চুক্তি করতে আরো ২৮ দিন সময় দিতে হবে। ফলে অক্টোবরের মধ্যে বই ছাপিয়ে উপজেলাপর্যায়ে পৌঁছানোর সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব। এখন থেকে ২৮ দিন পর চুক্তি হলে বই সরবরাহ করতে তারা সময় পাবে ৬০ দিনের মতো। ফলে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ভারত থেকে বই ছাপিয়ে দেশের উপজেলাপর্যায়ে পৌঁছে দেয়া অসম্ভব। ফলে আগামী বছরের ১ জানুয়ারি প্রাথমিকের কোনো শিক্ষার্থী পাঠ্যবই পাচ্ছে না এটা প্রায় নিশ্চিত। 

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার পুনঃদরপত্রে কাজ পাওয়া মুদ্রাকরদের নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (এনওএ) দেয়া হয়েছে। এতে কৃষ্ণা প্রিন্টার্স ও স্বপ্না ট্রেডিং নামে দু’টি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ১০টি লটে এক কোটি ৪ লাখ ৫৩ হাজারের বেশি বই ছাপার কাজ পেয়েছে। 

মুদ্রণ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এসব বই ছাপার জন্য এনসিটিবি যখন প্রথম দরপত্র আহ্বান করেছিল; তখন কিছু বিদেশী প্রতিষ্ঠান যোগ্যতা ও টেন্ডারের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়ে বাদ পড়েছিল। বাদ পড়াদের মধ্যে এখন কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠান দু’টিও ছিল। পুনঃদরপত্রে তারা ১০টি লটের কাজ পেয়েছে। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, পুনঃদরপত্র আহ্বান করে শুধু প্রাথমিকের বই ছাপায় সরকারের অতিরিক্ত গচ্চা যাবে ১১১ কোটি টাকা। কৃষ্ণা প্রিন্টার্স এক লটে ৭১ লাখ ৫৭ হাজার ৪১৩ এবং স্বপ্না প্রিন্টার্স অন্য লটে ৩২ লাখ ৯৬ হাজার ১৭২টি বই ছাপার কাজ পেয়েছে। এ দু’টি প্রতিষ্ঠান ২০১৬ সালে বই ছাপার কাজ শেষ করতে তিন মাস দেরি করে। ডিসেম্বরের বই ছাপাতে তারা মার্চ মাস পর্যন্ত সময় নিয়েছিল। এরপর ওই প্রতিষ্ঠান দু’টিকে এনসিটিবি কালো তালিকাভুক্ত করে। অথচ এবার তারাই কাজ পেল। 
মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিকের বইয়ের প্রতি ফর্মা ২ টাকা ২৫ পয়সা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরে প্রথম দরপত্র আহ্বান করে এনসিটিবি। গত বছর ডিসেম্বরের প্রাক্কলনের সাথে জুন মাসের কাগজ, কালিসহ আনুষঙ্গিক অন্যান্য জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ায় মুদ্রণ ব্যবসায়ীরা দাম হাঁকান ২ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে ৯৩ পয়সা পর্যন্ত। গড়ে ২ টাকা ৭৫ পয়সা প্রতি ফর্মার দাম ধরে তারা দরপত্র জমা দেন। এতে প্রাক্কলিত দরের চেয়ে প্রায় ৩৫ শতাংশ দাম বেড়ে যাওয়ায় পুরো টেন্ডার নিয়ে সৃষ্টি হয় জটিলতা। টেন্ডার এনসিটিবি প্রাক্কলিত দরের চেয়ে বেশি হওয়ায় পুনঃদরপত্র করার পক্ষে মত দেয় দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি। এ নিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এনসিটিবি দফায় দফায় বৈঠক করে। অক্টোবরের মধ্যে বই দিতে হলে দরপত্র বহাল রেখে ওয়ার্ক অর্ডার দিতে মত দেন এনসিটিবির এক সদস্য।

একপর্যায়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে কমিটি থেকে বের হয়ে যান তিনি। এরপর পুনঃদরপত্র করে আগের দামেই এনওএ দিয়েছে এনসিটিবি। অর্থাৎ মুদ্রণকারীরা প্রথম দরপত্রে যে দর দিয়েছিলেন প্রায় ওই দরে পুনঃদরপত্রে কাজ দেয়া হয়েছে। তাহলে কেন পুনঃদরপত্র এমন প্রশ্ন রেখে মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম বলেন, বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতেই এনসিটিবি এমনটা করেছে। তিনি বলেন, পুনঃদরপত্র প্রাক্কলনে বলে দেয়া থেকে শুরু করে সব কারসাজি হয়েছে। এটা দেশীয় শিল্পকে ধ্বংসের একটি মহাষড়যন্ত্র বলে অভিযোগ করেন তিনি। 

এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, গত বছর প্রতি ফর্মা এক টাকা ৯৫ পয়সায় ছাপান মুদ্রণকারীরা। এবার প্রাক্কলিত বাজার দর নির্ধারণ করা হয় ২ টাকা ২৫ পয়সা। মুদ্রণকারীরা দর দেন ২ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ২ টাকা ৮২ পয়সা পর্যন্ত। গত ১২ এপ্রিল দরপত্র খোলা হয়। পরবর্তী ২৮ দিনের মধ্যে বই ছাপাতে ঠিকাদারদের সাথে এনসিটিবির চুক্তি করার কথা থাকলেও প্রাক্কলিতের চেয়ে প্রায় ৩৫% বেশি দর দেয়ায় বই ছাপা নিয়ে সঙ্কট সৃষ্টি হয়। সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে হলে এনসিটিবির কাছে তিনটি পথ ছিল। এক. পিপিপির ৯৮ ধারার ২৫ উপধারা অনুযায়ী বর্তমান বাজার দরের সাথে সামঞ্জস্য রেখে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি দর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া; দুই, পুনঃদরপত্র আহ্বান এবং নতুন দরপত্র আহ্বান করা। এনসিটিবির কর্মকর্তারা প্রথমটির পক্ষে থাকলেও চেয়ারম্যান তাতে বাধা দেন। তিনি পুনঃদরপত্র করতে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিকে প্রভাবিত করেন। এতেই ভারতীয় প্রতিষ্ঠান দু’টি কাজ পাওয়ার সুযোগ পায়। 

ব্যবসায়ীরা জানান, বই ছাপার কাজে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলেও শুধু বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে এনসিটিবির চেয়ারম্যানের একক সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতেই সরকারের অতিরিক্ত ১১১ কোটি টাকা গচ্চাসহ সময় মতো বই দেয়া নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। 

এ ব্যাপারে এনসিটিবির চেয়ারম্যান নয়া দিগন্তকে বলেন, উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বিদেশী প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে। তাই মুদ্রণ ব্যবসায়ীরা যেসব অভিযোগ করেছেন; তা সত্য নয়। অতীতে বিদেশী প্রতিষ্ঠানের দেরিতে বই দেয়ার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, আশা করি অক্টোবরের মধ্যে ৯০ ভাগ বই উপজেলায় পৌঁছে যাবে। তারপরও যদি কেউ বই দিতে দেরি করে তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে।

তিনি আশা করেন, চলতি বছর নির্ধারিত সময়ের আগেই ভারতীয় প্রতিষ্ঠান বই দিয়ে দেবে। কারণ এর আগে সমুদ্র পথে বই আসত। এবার কলকাতার প্রতিষ্ঠান কাজ পাওয়ায় সড়ক পথে বই আসবে। তাই দেরি হওয়ার আশঙ্কা কম। 
মুদ্রণ সমিতির সভাপতি শহীদ সেরনিয়াবাত নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশীয় শিল্পকে ধ্বংস করতে এনসিটিবি এবারো ষড়যন্ত্র করে বিদেশী প্রতিষ্ঠানের হাতে বই তুলে দিলো। প্রথম দরপত্রে একটি বিদেশী প্রতিষ্ঠানও কাজ পেল না, অথচ পুনঃদরপত্রে ১০টি লটে কাজ পেয়ে গেল। তাই এনসিটিবির ব্যাপারে সন্দেহের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, এনসিটিবির এক কর্মকর্তা বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে সহায়তা করেছে। তাই এই নিয়ে প্রয়োজন হলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছেও যাবেন।


আরো সংবাদ