১৮ নভেম্বর ২০১৮
রাশেদসহ সবার মুক্তি দাবি

চার ধরনের অন্যায়ের শিকার হয়েছেন শিক্ষার্থীরা : ঢাবি শিক্ষক

কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের হাতুড়ি পেটা - ফাইল ছবি - সংগৃহীত

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদখানসহ গ্রেফতারকৃত সবার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচীতে সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ কর্তক নৃশংস হামলার বিচার দাবি করেছেন তারা।
রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কর্মসূচী থেকে এসব দাবি তোলা হয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচী পালন করতে গিয়ে চারধরনের অন্যায়ের শিকার হয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। অপর দিকে আন্দোলনকারীদের জঙ্গিদের সাথে তুলনা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পূর্বঘোষিত কর্মসূচীর অংশ হিসেবে মধ্যে সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যয়সায় শিক্ষা অনুষদে মানববন্ধন করেছেন ব্যাংকিং এন্ড ইন্সুরেন্স বিভাগের শিক্ষার্থীরা। উল্লেখ্য রাশেদ এই বিভাগেরই শিক্ষার্থী। কোটা আন্দোলনে সন্ত্রাসী হামলা ও আন্দোলনকারীদের আটকের প্রতিবাদে এতে অনুষদের অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন। এ সময় তারা কোটা সংস্কার আন্দোলননের প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম-আহবায়ক রাশেদ খাঁনসহ আটককৃত অন্যান্যদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান। মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা ‘চাইতে গিয়ে অধিকার সইব কত অত্যাচার?’, ‘আর নয় অনাচার এবার চাই অধিকার’, ‘প্রশাসন নীরব কেন, ভিসি স্যার জবাব চাই’, ‘নিরাপদ ক্যাম্পাস চাই’ ইত্যাদি লেখা সংবলিত ফেস্টুন প্রদর্শন করে।
মানববন্ধনে অংশ নেয়া ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের শিক্ষার্থী মাসুদ রানা বলেন, কোটা সংস্কারের যৌক্তিক দাবি নিয়ে আন্দোলন করে আসছিলো রাশেদ খাঁন। কিন্তু পরবর্তীতে এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে তাকে পেটানো হয়, রিমান্ডে নিয়ে অত্যাচার করা হয়। সে তো কোন অপরাধ করেনি। তারপরও এ আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা রাশেদ খাঁনসহ অন্যান্যদের গ্রেফতার করে পুলিশ। আমরা রাশেদসহ গ্রেফতারকৃতদের দ্রুত মুক্তির দাবি জানাই। একই সঙ্গে সরকারের কাছে আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করার দাবি জানাই। আমরা এখানে দাঁড়িয়েছি, কিন্তু আমাদের কোন নিরাপত্তা নেই। তাই আমরা নিজেদের মত প্রকাশ করার জন্য নিরাপদ ক্যাম্পাস চাই।
একই বিভাগের শিক্ষার্থী রাজিব বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর ওপর হামলা করা হয়েছে, তাদের মধ্যে অনেককে আবার গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া রাশেদ খানকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। আমরা আটককৃতদের নিঃশর্ত মুক্তি এবং আন্দোলনরতদের ওপর নৃশংস হামলাকারীদের বিচার চাই। আর বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী তাসরিনা জেরিন বলেন, রাশেদ খানকে অন্যায়ভাবে রিমান্ডের নামে অত্যাচার করা হয়েছে। এটা যুক্তিযুক্ত নয়। আমরা আটককৃতদের মুক্তির দাবি জানাই। একই সঙ্গে দ্রুত প্রজ্ঞাপন দিয়ে কোটা সমস্যার সমাধান চাই।
এদিকে, দুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষকবৃন্দ’র ব্যানারে এক বিক্ষোভ সমাবেশে আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, এই ন্যায় সংগত আন্দোলন করতে গিয়ে আমাদের সন্তানরা চারধরনের অন্যায়ের শিকার হয়েছেন। তাদেরকে হাতুড়িপেটা করা হয়েছে।
মেয়েদের শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করা হয়েছে, গুরুতর আহত করা হয়। এটা প্রথম অন্যায়। দ্বিতীয় অন্যায় হচ্ছে আহতদের চিকিৎসা ব্যাহত করা হয়েছে। এই দেশের হাসসপাতাল কোনো সরকার, ব্যাক্তির নয়, রাজনৈতিক দলের হাসপাতাল নয়। এটা জনগণের অর্থে পরিচালিত হাসপাতাল। অথচ তাকে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তৃতীয় অন্যায় মিথ্যা হয়রানীমূলক মামলা দেওয়া হয়েছে, চতুর্থ অন্যায় নানারকম অপবাদ দেওয়া হয়েছে। ঢাবির এ অধ্যাপক বলেন, ধারালো অস্ত্র দিয়ে গুরুতর আঘাত করা যাবজ্জীবন সাজাযোগ্য অপরাধ। যাবজ্জীবন সাজাযোগ্য অপরাধ যারা করেছে তাদের গ্রেফতার দাবি করছি। যারা আহত তাদের চিকিৎসা সেবা দাবি করছি। সকল ষড়যন্ত্রমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবি করছি।
তিনি আরো বলেন, প্রতিবাদ করার অধিকার যারা অস্বীকার করে, তারা মুক্তিযুদ্ধ চেতনাবিরোধী, সংবিধান বিরোধী। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আকাঙ্খা বিরোধী।
এ সময় ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন একটি যৌক্তিক দাবী। এই জন্য এর প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন। এই ৫৬ শতাংশ কোটা অযৌক্তিক ও অন্যায়। সরকার সেটা স্বিকার করেছে। সরকার সেটা স্বিকার করে কমিটি গঠন করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো। সেই কমিটি গঠনে বিলম্ব করেছে, তার কারনে ছাত্ররা আবার আন্দোলন করেছে। এই আন্দোলন যদি কন্টিনিউ না করতো তাহলে এই কমিটি গঠন হতোনা।
এতে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. তাসনিম সিরাজ, আন্তর্জাতিক বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক ড. আকমল হোসাইন, একই বিভাগের সহোযোগী অধ্যাপক তানজিমউদ্দিন খান, ইউল্যাবের ভিজিটিং প্রফেসর অধ্যাপক আসফার হোসেন প্রমূখ।
এ সময় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন চার দফা দাবি তুলে ধরেন। সেগুলো হলো- কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের উপর হামলাকারীদের বিচার করা, আন্দোলনকারীদের নামে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, হামলায় আহতদের চিকিৎসা সেবা প্রদান, নারী আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নকারীদের বিচার ও দ্রুত কোটা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে দেয়া।
এর আগে একই ব্যানারে বিশ^বিদ্যালয়ের প্রায় অধ্বশতাধিক শিক্ষক কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার থেকে নিপীড়ন ও হয়রানি বন্ধ, হামলাকারীদের গ্রেফতার ও মিথ্যা মামলায় গ্রেফতারকৃতদের মুক্তির দাবিতে এক পদযাত্রায় অংশগ্রহণ করে। পদযাত্রাটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়।
এদিকে, দুপুরে নিজ কার্যালয়ে কোটা আন্দোলন বিষয়ে সাংবাদিকদের সাথে বিফ্রিংয়ে আন্দোলনকারীদের জঙ্গিদের সাথে তুলনা করেছেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আখতারুজ্জামন। তিনি বলেন, তালেবান নেতা মোল্লা ওমর ও ওসামা বিন লাদেনের মতো ভিডিও বার্তা পাঠানো হচ্ছে। জঙ্গিরা যেভাবে শেষ অস্ত্র হিসেবে নারীদের ব্যবহার করে, সেভাবে কোটা আন্দোলনেও ছাত্রীদের ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় এসব মেনে নেবে না।
ফৌজদারি অপরাধ করলে আইনের শাসন কার্যকর হতে হবে। কোটা আন্দোলনের সঙ্গে কোনো জঙ্গি সংগঠনের যোগাযোগ আছে কি না, সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে ভিসি বলেন, কোন সংগঠন জানি না। কিন্তু ফেসবুকে যে ভিডিও দেখেছি, সে ভিডিও জঙ্গিদের ধরনের।
এর আগে প্রগতিশীল ছাত্র জোটের পক্ষে ভিসিকে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। স্মারকলিপিতে তারা প্রশাসনের কাছে কয়েকটি দাবি পেশ করেন। দাবিগুলো হলো- সকল হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনা, আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের নামে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, আক্রান্তদের চিকিৎসার ব্যাবস্থা করা, নারী আন্দোলনকারীদের উপর যৌন নিপীড়নকারীদের বিচার, দ্রুত কোটা সংস্কারের প্রজ্ঞাপন জারী।


আরো সংবাদ