১৭ আগস্ট ২০১৮

জাতীয়করণের দাবি ক্ষুব্ধ শিক্ষকদের

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ননএমপিও শিক্ষকদের বিক্ষোভ - ছবি : নয়া দিগন্

চলতি বছরের শুরুতে নন-এমপিও শিক্ষক, এমপিওভুক্ত শিক্ষকসহ আরো অনেক ধারার শিক্ষকেরা বিভিন্ন দাবিতে রাজধানী ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আমরণ অনশনের মতো কঠোর কর্মসূচি পালন করেন। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে আন্দোলনরত সব ধারার শিক্ষকদেরই দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দিয়ে বাড়ি ফেরানো হয় রাজপথ থেকে। কিন্তু নতুন বছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওকরণ এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ বা তাদের আর্থিক বৈষম্য হ্রাস বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখ করা হয়নি। এ নিয়ে সারা দেশের বেসরকারি পর্যায়ের লাখ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র হতাশা আর ক্ষোভ বিরাজ করছে। অনেক শিক্ষক ক্ষোভের সাথে বলেছেন, সবাই বলছে এটা না কি নির্বাচনী বাজেট। তো ভোটের আগে দেশের লাখ লাখ শিক্ষক আর তাদের পরিবারের ভোট কি সরকারের দরকার নেই? 

বছরের পর বছর ধরে বিনা বেতনে চাকরিরত নন- এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার শিক্ষক তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার দাবিতে গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া না আসায় ৩১ ডিসেম্বর থেকে তারা আমরণ অনশন শুরু করেন। দুই ডিসেম্বর শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ অনশনস্থলে এসে শিক্ষকদের দাবি মানার আশ্বাস দেন। কিন্তু শিক্ষকরা তার এ আশ্বাস প্রত্যাখ্যান করে জানান, গত ১০ বছরে অসংখ্যবার তিনি এ ধরনের আশ্বাস দিয়েছেন প্রতিবার আন্দোলনের সময়। তাই শিক্ষামন্ত্রীর ওপর আস্থা হারানোর কথা জানিয়ে শিক্ষক নেতৃবৃন্দ দাবি জানান প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে দাবি মানার ঘোষণা না আসা পর্যন্ত তারা অনশন ভাঙবেন না। 

এরপর ৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-১ সাজ্জাদুল হাসান জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনশনরত শিক্ষকদের মধ্যে এসে দাবি মেনে নেয়ার কথা জানান শিক্ষকদের। এরপর নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা অনশন ভাঙার ঘোষণা দেন। সাজ্জাদুল হাসান প্রধানমন্ত্রীর বার্তা জানিয়ে শিক্ষকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাকে জানাতে বলেছেন তিনি আপনাদের দাবি মেনে নিয়েছেন। স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সব নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে। তিনি আপনাদের অনশন ভেঙে যার যার বাড়ি ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করেছেন। 

নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমিপওভুক্তির দাবিতে ২০০৬ সাল থেকে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষকেরা। বারবার আমরণ অনশন, লাগাতার অবস্থান, বিক্ষোভ মিছিলসহ ২৬ বার বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করেছেন তারা রাজধানীসহ সারা দেশজুড়ে। রাজধানীতে ২০১৩ সালে আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে পুলিশের বিষাক্ত পিপার ¯েপ্রর ঘটনায় আহত হয়ে ১৪ জানুয়ারি মারা যান শিক্ষক মোহাম্মদ সেকেন্দার আলী (৪৫)। তিনি পটুয়াখালী জেলার দুমকি উপজেলার চরবয়রা মডেল বালিকা দাখিল মাদরাসার শিক্ষক ছিলেন। 

অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পর সব শেষ একটানা ছয় দিন অনশনের পর গত ৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে দাবি মানার ঘোষণার সাথে সাথে অনশরত কয়েক হাজার শিক্ষকের মধ্যে আনন্দের উল্লাস বয়ে যায়। কিন্তু দীর্ঘ পাঁচ মাস শেষ হয়ে যাওয়ার পরও জাতীয় সংসদের পেশ হওয়া বাজেট বক্তৃতায় তাদের বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখ না থাকায় হতাশায় ভেঙে পড়েছেন নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা। 

নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের দেয়া তথ্যানুযায়ী ৫ হাজার ২৪২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে যা সম্পূর্ণ নন-এমপিও। 
২০০৫ সাল থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওকরণ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর সারা দেশের সংসদ সদস্যদের দাবিতে ২০১০ সালে এমপিওকরণের জন্য তালিকা সংগ্রহ করা হয়। প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দরখাস্ত জমা হলেও এক হাজার ৬১০টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি বছর চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে এমপিওভুক্ত করা হবে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। কিন্তু ২০১০ সালের পর আর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়নি
এ দিকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবিতে শিক্ষকেরা গত ১০ জানুয়ারি থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। এরপর ১৫ তারিখ থেকে আমরণ অনশন কর্মসূচিতে যান তারা। 
ছয়টি শিক্ষক-কর্মচারী সংগঠনের জোট বেসরকারি শিক্ষা জাতীয়করণ লিয়াজোঁ ফোরামের নেতৃত্বে শিক্ষকরা আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেন। হাজার হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা সারা দেশ থেকে যোগ দেন অনশনে। 

অবশেষে ২৯ জানুয়ারি বিকেল ৫টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের সচিব মো: আলমগীর ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মহিউদ্দিন আহমেদ অনশনস্থলে এসে জুস পান করিয়ে শিক্ষকদের অনশন ভাঙান। 
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ দু’জন পদস্থ কর্মকর্তা শিক্ষকদের বলেন, শিক্ষকদের দাবির অংশ হিসেবে বার্ষিক ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট এবং বৈশাখী ভাতা প্রদানের প্রস্তাব ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া বাড়িভাড়া, বোনাস, টাইম স্কেলসহ আরো যেসব বিষয়ে শিক্ষকদের দাবি রয়েছে তা আগামী বাজেটেই অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তার আগে এ নিয়ে শিক্ষকদের সাথে আলোচনা করা হবে এবং একটি নীতিমালা তৈরি করা হবে। 

বেসরকারি শিক্ষা জাতীয়করণ লিয়াজোঁ ফোরামের উপদেষ্টা আবুল বাশার হাওলাদার অনশন কর্মসূচি ভাঙার পর নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ওই দিন বিকেলে ফোরামের নেতৃবৃন্দের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। তারা আমাদের বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের জাতীয়করণের দাবিকে যৌক্তিক বলে মনে করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি জাতীয়করণ নিয়ে আমাদের সাথে বৈঠকে বসবেন। তিনি জানিয়েছেন, সামনে এসএসসি পরীক্ষা। পরীক্ষার্থীদের যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সে জন্য শিক্ষকদের অনুরোধ করেছেন এবং কর্মসূচি প্রত্যাহার করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যেতে বলেছেন। 
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে স্কুল কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি মিলিয়ে সর্বমোট ৩৮ হাজার ৪৭৮টি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। শিক্ষকের সংখ্যা পাঁচ লাখ ২২ হাজার। শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক কোটি ৬২ লাখ। বাংলাদেশে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার মোট ৯৭ ভাগ পরিচালিত হয় বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়। বেসরকারি খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যা এমপিওভুক্ত নয় এবং বছরের পর বছর বিনা বেতনে শিক্ষকতা করে যাচ্ছেন হাজার হাজার শিক্ষক। অপর দিকে মূল স্কেলের শতভাগ বেতন পেলেও নানা ধরনের বৈষম্য, বঞ্চনা আর অবহেলার শিকার এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা। 
প্রস্তাবিত বাজেটে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখ না থাকা বিষয়ে বাংলাদেশ শিক্ষক ইউনিয়নের সভাপতি আবুল বাশার হাওলাদার নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকার আমাদের সাথে যা করেছে তাকে আমরা চালাকি এবং ধোঁকাবাজি বলব। এটা আমরা আশা করি নাই। আমাদের আবার রাজপথে নামতে হবে দাবি আদায়ের জন্য। 

নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের সিনিয়র সহসভাপতি ও সমন্বয়ক শফিকুল ইসলাম বলেন, যখনই এমপিওকরণের দাবি তোলা হয়েছে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, বাজেট নেই। এবারো বাজেটে আমাদের বিষয়ে কিছু বলা হলো না। তাহলে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত বাজেট দিয়ে কিভাবে আমাদের দাবি পূরণ হবে তা আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না। 
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের বিপরীতে মোট ৫৩ হাজার ৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে নতুন বছরের বাজেটে।


আরো সংবাদ