মঙ্গলবার, ১৯ জুন ২০১৮
বেটা ভার্সন

এবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের হিড়িক

এবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের হিড়িক - ছবি : সংগৃহীত

শিক্ষা মন্ত্রণালয় আরো দু’টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দফতরে প্রস্তাব আকারে সার-সংক্ষেপ পাঠানো হয়েছিল। দু’টিরই অনুমোদন পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা। এর একটি বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকায় ও অন্যটি বরিশাল শহরে স্থাপনের কথা বলেছেন উদ্যোক্তারা। ঢাকায় প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম হচ্ছে ‘ইন্টারন্যাশনাল স্টান্ডার্ড ইউনিভার্সিটি’। এটি স্থাপনের অনুমোদন চেয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম মোশাররফ হুসাইন নামের একজন ব্যবসায়ী। তিনি ক্ষমতাসীন দলের ঘরানা বলে ব্যবসায়ী মহলে অতি পরিচিত। আর অন্যটির নাম হচ্ছে ‘ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি’। এটির অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রী বরাবর চিঠি দিয়েছিলেন বরিশাল-২ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি তালুকদার মো: ইউনুস।

রাজনৈতিক বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়ার ঘটনা এবং স্কুল-কলেজের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনকে নজিরবিহীন এবং একের পর এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি প্রদানকে ‘সম্পূর্ণরূপে কাণ্ডজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সলর অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ। গতকাল তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আর্থ-সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থানগত দিক বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য বেসরকারি পর্যায়ে সর্বোচ্চ ২৫-৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন-অনুমতি দেয়া প্রয়োজন। এর বাইরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তো রয়েছেই। কিন্তু এখন ঢাকায়ই রয়েছে ৪৯টির মতো। নীতি-নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা এবং উচ্চশিক্ষার মান বজায় না রেখে শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় একের পর এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া- ‘অ্যাবসোলিউটলি নন- সেন্স ডিসিশান’- ‘সম্পূর্ণরূপে কাণ্ডজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত ’। এর পেছনে কোনো না কোনো অনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। এর ফলে উচ্চশিক্ষার মান এবং উচ্চশিক্ষাকে মাটির সাথে মিটিয়ে দেয়ার অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে বলেই ধারণা হচ্ছে। 

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষার বর্তমান নৈরাজ্যের চিত্রের দিকে ইঙ্গিত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এ ভিসি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো একটি বিভাগ খোলার জন্য একজন অধ্যাপক থাকার বিধান রয়েছে বর্তমান সরকারের আমলেই সংশোধন করা আইনে। কিন্তু এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব বিভাগ রয়েছে, তার মধ্যে ‘ফার্মাসি’ বিভাগ এবং বিজনেস ও ম্যানেজমেন্ট ফ্যাকাল্টিতে কতজন অধ্যাপক রয়েছেন। খোঁজ নিলেই বোঝা যাবে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান কী? শিক্ষার প্রতি ন্যূনতম দরদ থাকলে অবিলম্বে শিক্ষক বিহীন এ সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া উচিত বলে মন্তব্য করে বলেন, না হয় এ কথাই প্রতীয়মান হবে যে, অসৎ উদ্দেশে এ সবের অনুমোদন-অনুমতি দেয়া হয়েছে এবং হচ্ছে।

সর্বশেষ উক্ত দু’টিসহ দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়াবে ১০৩টিতে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে বলা হয়েছে, সর্বশেষ ওই দু’টিসহ গত ছয় মাসে (জানুয়ারি’১৮ থেকে জুন’১৮ সময়ের মধ্যে) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে মোট সাতটি। জানুয়ারিতে অনুমোদন পায় রাজধানীর গুলশান অ্যাভিনিউয়ে ‘জেডএনআরএফ ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেস’। গত এপ্রিলে দুই দফায় (১৮ ও ২৬ এপ্রিল) মোট চারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হয়। এগুলো হচ্ছেÑ খুলনায় খানবাহাদুর আহছানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহীতে আহছানিয়া মিশন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ১০ দিনের ব্যবধানে (২৬ এপ্রিল) অনুমোদন পায় আরো দু’টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এ দু’টি হচ্ছে বান্দরবানে ‘বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়’ এবং রাজশাহীতে ‘শাহ মাখদুম ম্যানেজমেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়’। গত ৩ মে অনুমোদন পেল আরো দু’টি। অন্য দিকে সরকারি বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা হচ্ছে মাত্র ৩৭টি। 

বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদসহ গত ৯ বছরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে ৪৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম চলছে ৯৫টিতে। আওয়ামী লীগের লাগাতার দুই মেয়াদে ৪৯টির মধ্যে ২০১২ সালে ১৬টি, ২০১৩ সালে ১০টি, ২০১৪ সালে দু’টি, ২০১৫ সালে তিনটি, ২০১৬ সালে ছয়টি, ২০১৭ সালে পাঁচটি এবং ২০১৮ সালে এ পর্যন্ত সাতটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেল। অনুমোদন পাওয়া ৪৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটির উদ্যোক্তা হচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ঘরানা। 

এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তাদের মধ্যে আছেন : সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও এমপি ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এমপি নজরুল ইসলাম বাবু, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এনামুল হক শামীম, এ এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী, সিলেটের গোলাপগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা ইকবাল আহমেদ চৌধুরী, সরকারদলীয় এমপি সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সাবেক সদস্য অধ্যাপক দুর্গাদাস ভট্টাচার্য, ব্যবসায়ী জয়নুল হক সিকদার, সাবেক আইনমন্ত্রী এবং এমপি আবদুল মতিন খসরু, খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সদ্য নির্বাচিত মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উ শৈ সিং, বি এম শামসুল হক, কাজী রফিকুল আলম, ড. এম জুবায়েদুর রহমানসহ আরো কয়েকজন নেতা ও ব্যবসায়ী বিভিন্ন নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পেয়েছেন। এ ছাড়া পুরনো একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদারসহ কয়েকজন যুক্ত হয়েছেন। 

অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম পরিচালিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগই আইনের শর্ত মেনে চলছে না বলে অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনেরই (ইউজিসি)। ইউজিসির দেয়া তথ্য অনুযায়ী ৩০টিতে চ্যান্সলরের নিয়োগ করা ভাইস চ্যান্সেলর নেই, প্রোভাইস চ্যান্সেলর নেই ৭০টিতে। বারবার সময় দিয়েও পুরনো ৫১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ১৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ণাঙ্গভাবে নিজস্ব ক্যাম্পাসে গেছে। সব মিলিয়ে নিয়মের মধ্যে চলছে মাত্র ১৫ থেকে ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়। বাকিগুলোর বিরুদ্ধে রয়েছে শিক্ষা বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ।

শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একের পর এক মূলত রাজনৈতিক বিবেচনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়ায় বেসরকারি পর্যায়ের উচ্চশিক্ষা ঘিরে নৈরাজ্য বিরাজ করছে। অভিযোগ রয়েছে সনদ বাণিজ্যেরও। এ সব অভিযোগের প্রেক্ষিতে যখন কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া উচিত, তখন নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। এসব অনুমোদনের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রাধান্য। এতে করে অবৈধ মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যই মুখ্য। বিশ্লেষকেরা বলছেন, সরকারের মেয়াদের শেষ মুহূর্তে এসে এ সব অনুমোদন ভোটের বাক্সকে বিবেচনায় নিয়েই করা হচ্ছে।


আরো সংবাদ