২৪ জুন ২০১৮

এনসিটিবির ব্যর্থতায় শিক্ষার্থীদের ঘাড়ে দামের বোঝা

আর মাত্র ৩৩ দিন পর (১ জুলাই) শুরু হবে উচ্চ মাধ্যমিকের প্রথম বর্ষের ক্লাস। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) নির্ধারিত বাংলা, বাংলা সহজ পাঠ, ইংরেজি- এ তিনটি বই উচ্চ মাধ্যমিকের বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা(বাণিজ্য) ও মানবিক শাখার সব শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক। ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য উপরিউক্ত তিনটি বইয়ের দাম বিগত বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশ বাড়নোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনসিটিবি। ওই তিনটি বইয়ের দাম ১৫ শতাংশ বাড়ানোর ফলে নতুন শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের পকেট হাতিয়ে নেয়া হবে ৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। অথচ এনসিটিবি ওই বই ছাপার টেন্ডারে কাগজের মূল্য সঠিক প্রাক্কলনের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার দায় নিতে হচ্ছে এখন শিক্ষার্থীদের। এ দিকে এনসিটিবি বই তিনটি মুদ্রণকারীদের কাছে মুদ্রণের স্বত্ব দিয়ে কোটি কোটি টাকার রয়্যালিটি আদায় করে। এ বছর রয়্যালিটি আদায় না করলে, বইয়ের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতো না বলে মনে করে মুদ্রণ শিল্প মালিক সমিতি। সমিতি এনসিটিবিকে এ রয়্যালিটি আদায় না করার জন্য অনুরোধ করেছিল বলে জানা গেছে। জানা যায়, রয়্যালিটির টাকা এনসিটিবি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দিয়ে নিজেরাই (কর্মকর্তা-কর্মচারীরা) ভাগবাঁটোয়ারা করে নেন বছরান্তে।

২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য উপরিউক্ত তিনটি বই ছাপা ও বাজারজাতকরণের আদেশ দেয়ার জন্য গত ১৭ এপ্রিল টেন্ডার আহ্বান করা হয়। তিনটি বই মুদ্্রণ ও বাজারজাতের জন্য ৯৩টি প্রতিষ্ঠান টেন্ডার শিডিউল ক্রয় করে; কিন্তু ৩ মে টেন্ডার বাক্স খুলে দেখা যায়, কোনো প্রতিষ্ঠান শিডিউল জমা দেয়নি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ ক্ষেত্রেও কাগজসহ মুদ্রণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বইয়ের দাম বাড়ানোর দাবি ছিল মুদ্রণকারী ও প্রকাশকদের। সে অনুযায়ী বাংলা ও সহপাঠের দাম বাড়ানো হয়। ইংরেজি বইয়ের দাম গত বছরের মতোই রাখা হয়; কিন্তু বর্ধিত দাম প্রত্যাশিত পর্যায়ের না হওয়ায় কেউ টেন্ডার জমা দেননি। এরপর এনসিটিবি মুদ্রণকারীদের সাথে সমঝোতায় আসার চেষ্টা করে। দুই দফায় বৈঠক করার মৌখিক আমন্ত্রণ মুদ্রণকারীরা প্রত্যাখ্যান করায়, সর্বশেষ গত ২৭ মে আরেক দফায় তিনটি বইয়েরই দাম বাড়িয়ে সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ছাপার আদেশ দেয়া হবে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই।

এনসিসিটিবর সাথে অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে মুদ্রণ শিল্প মালিক ও বই বাজারজাতকারী ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল, বইয়ের দাম ২০ শতাংশ বাড়ানো। মুদ্রণ শিল্প মালিক সমিতি বলেছিল, এনসিটিবি রয়্যালিটি এ বছর না নিতে। শেষে এনসিটিবি বইয়ের দাম ১৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

উচ্চ মাধ্যমিকের তিনটি বই বাংলা, বাংলা সহজ পাঠ এবং ইংরেজি শিক্ষার্থীদের মূল্য দিয়ে কিনতে হয়। প্রথম দফার টেন্ডারে বাংলা বইয়ের দাম ধরা হয়েছে ১২১ টাকা। বাংলা সহজ পাঠের দাম ধরা হয়েছে ৫৯ টাকা এবং ইংরেজি বইয়ের দাম ধরা হয়েছে ৮১ টাকা। সর্বশেষ গত সপ্তাহে বাংলা বইয়ের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১২১ টাকার স্থলে ১৩০ টাকা, বাংলা সহজ পাঠের দাম ৫৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৩ টাকা ও ইংরেজি বইয়ের দাম ৮১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯৩ টাকা করা হয়েছে। ২৪টি লটে ২৪ লাখ বই ছাপানো হবে। প্রথম দফায় ১৭টি লটে ১৯ লাখ ৮৯ হাজার বই ছাপানোর কার্যাদেশ দেয়া হবে আগামী সপ্তাহে। পরে চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে কার্যাদেশ দেয়া হবে।

অপর দিকে, বাংলা বইয়ের নতুন কিছু বিষয় ও গল্প-প্রবন্ধ সংযোজনের ফলে এবার সময় মতো বই পাওয়া নিয়েও সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। বইয়ের কনটেন্ট এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে শোনা যাচ্ছে। তবে এনসিটিবির চেয়ারম্যান এটি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, নতুন বই ছাপার আদেশ দেয়ার সময়ই নতুন কনটেন্ট মুদ্রণকারীদের হাতে দেয়া হবে। 
বইয়ের মূল্যবৃদ্ধির ব্যাপারে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা বইয়ের মূল্যবৃদ্ধির কথা স্বীকার করে গতকাল বিকেলে নয়া দিগন্তকে বলেন, আগামী সপ্তাহে কার্যাদেশ দেয়া হবে। গত বছর যেসব প্রতিষ্ঠান উচ্চ মাধ্যমিকের বইয়ের কাজ করেছিল, এ বছর তাদেরই কাজ দেয়া হবে। বাজারে কাগজসহ অন্যান্য মুদ্রণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে বইয়ের দাম সহনীয় পর্যায়ে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। 

নতুন (২০১৮-১৯) শিক্ষাবর্ষ (১ জুলাই ’১৮) শুরুর আগে বই পাওয়া নিয়ে সংশয় ও নকল বই বাজারে পাওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে কি না জানতে চাইলে এনসিটিবির চেয়ারম্যান বলেন, বই ছাপাতে লাগবে মাত্র পাঁচ দিন। কারণ গত বছরের মুদ্রণকারীরাই এবার কাজ পাবে। নকল বই শিক্ষার্থীরা কিনবে কেন? পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে তিনি বলেন, এর দায় এনসিটিবি নেবে না। এবারের বইয়ে নতুন কিছু গল্প-প্রবন্ধ যুক্ত হবে। নতুন বই ছাড়া শিক্ষার্থীরা এগুলো কোথায় পাবে? 


এ দিকে মুদ্রণ শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি তোফায়েল খান গতকাল দুপুরে নয়া দিগন্তকে বলেন, এনসিটিবির দ্বৈত আচরণ আমাদের হতাশ করেছে, এ কারণেই কোনো মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান টেন্ডারে অংশ নেয়নি। এনসিটিবির মুখের কথায় আস্থা রাখা যায় না। সমঝোতা বৈঠকেও একই কারণে আমরা অংশ নিইনি। একাদশ শ্রেণীর বইয়ের দাম বাড়ানোর কথা শুনেছি। ১৫ শতাংশ দাম বাড়ানোর খবর আমি জানি না, শুনেছি। এই দাম বাড়ানো হলে আমরা কাজ করতে পারব। 

বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সাবেক সহসভাপতি শ্যামল পাল নয়া দিগন্তকে বলেন, বইয়ের বাজারে এনসিটিবির কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। নকল প্রতিরোধে এনসিটিবির কোনো মাথাব্যথাও নেই। তাই লাখ লাখ টাকা অগ্রিম রয়্যালটি দিয়ে এ বই বাজারজাতের কাজ নেয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। সে কারণে ব্যক্তিগতভাবে আমি টেন্ডারে অংশ নিইনি।


আরো সংবাদ